এনবি সংবাদ,আর্ন্তজাতিক ডেস্ক : মানুষের নেশার ইতিহাস যে হাজার হাজার বছরের পুরনো, তা নিয়ে বিজ্ঞানীদের আগ্রহ দীর্ঘদিনের। তবে এত দিন ধারণা ছিল, কৃষিকাজ শুরু হওয়ার পর থেকেই মানুষের মধ্যে মাদক বা নেশাজাতীয় উপাদান ব্যবহারের প্রবণতা তৈরি হয়েছিল। এবার সেই ধারণাকেই অনেকটা বদলে দিল নতুন গবেষণা। প্রাচীন মানুষের দাঁত বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা এমন প্রমাণ পেয়েছেন, যা ইঙ্গিত করছে—প্রায় ২৫ হাজার বছর আগেও মানুষ নেশাজাতীয় উপাদান ব্যবহার করত।
আর সবচেয়ে চমকপ্রদ বিষয় হল, সেই নেশার উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে সুপারি।
অস্ট্রেলিয়ার গ্রিফিথ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের সাম্প্রতিক গবেষণায় উঠে এসেছে এই তথ্য। ইন্দোনেশিয়ার সুলাওয়েশি দ্বীপ থেকে পাওয়া প্রাচীন মানুষের কঙ্কাল এবং দাঁতের বিশেষ ক্ষয় বিশ্লেষণ করে তাঁরা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন। গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান বিষয়ক পত্রিকা Science Advances-এ।
মানুষের নেশার ইতিহাস কত পুরনো?
সন্ধ্যায় পানীয় বা অন্য কোনও নেশাজাতীয় উপাদান ব্যবহারের অভ্যাস আধুনিক সমাজে নতুন কিছু নয়। কিন্তু মানুষ ঠিক কবে থেকে নেশাজাতীয় পদার্থ ব্যবহার করতে শুরু করেছিল, তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই গবেষণা চলছে।
আগের গবেষণাগুলোতে নেশার প্রাচীন ইতিহাসের যে প্রমাণ পাওয়া গিয়েছিল, তার অন্যতম ছিল গাঁজানো পানীয়। বর্তমান ইজরায়েল অঞ্চলে প্রায় ১৩ হাজার বছর আগের গাঁজানো অ্যালকোহলযুক্ত পানীয় ব্যবহারের নিদর্শন পাওয়া গিয়েছিল। সেই পানীয়কে অনেক গবেষক প্রাচীন বার্লি বিয়ার হিসেবেও উল্লেখ করেছেন।
ফলে এত দিন বিজ্ঞানীদের একটি ধারণা ছিল, কৃষিকাজ শুরু হওয়ার পর মানুষ যখন শিকার ও খাদ্য সংগ্রহের পাশাপাশি খাদ্য উৎপাদনের দিকে এগোতে শুরু করেছিল, তখনই নেশাজাতীয় উপাদান ব্যবহারের প্রবণতা ছড়িয়ে পড়ে।
কিন্তু নতুন গবেষণা বলছে, মানুষের নেশার ইতিহাস তার থেকেও বহু পুরনো।
প্রাচীন দাঁতে রহস্যময় গোলাকার খাঁজ
গ্রিফিথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘অস্ট্রেলিয়ান রিসার্চ সেন্টার ফর হিউম্যান ইভলিউশন’-এর গবেষকেরা ইন্দোনেশিয়ার সুলাওয়েশি থেকে পাওয়া দুটি প্রাচীন কঙ্কাল পরীক্ষা করেন।
এই দুই ব্যক্তি ছিলেন শিকারি-সংগ্রাহক সমাজের সদস্য। অর্থাৎ তাঁদের সময়ে কৃষিকাজ এখনও শুরু হয়নি। গবেষণায় দেখা যায়, একটি কঙ্কালের বয়স আনুমানিক ২৫ হাজার থেকে ১৬ হাজার বছরের মধ্যে। অন্যটির বয়স প্রায় ৭৬০০ থেকে ৬৩০০ বছর।
দুটি কঙ্কালের দাঁতেই গবেষকেরা একটি অস্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য দেখতে পান। দাঁতের গায়ে তৈরি হয়েছিল গভীর এবং প্রায় গোলাকার খাঁজ। প্রাচীন মানুষের দাঁতের নমুনায় এমন ধরনের ক্ষয় আগে খুব একটা দেখা যায়নি।
এই অস্বাভাবিক ক্ষয়ের ধরনই গবেষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
তাঁদের ধারণা, দীর্ঘ সময় ধরে মুখের ভিতরে গোটা সুপারি রেখে চোষার ফলে দাঁতে এমন গভীর খাঁজ তৈরি হতে পারে। অর্থাৎ দাঁতের এই বিশেষ ক্ষয় আসলে একটি আচরণগত প্রমাণ হিসেবেও কাজ করতে পারে।
সুপারি থেকেই কি নেশা করত প্রাচীন মানুষ?
সুপারির মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন জৈব-সক্রিয় উপাদান। এর মধ্যে আরেকলিন নামের একটি নিউরোঅ্যাক্টিভ অ্যালকালয়েড গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে পান, সুপারি ও চুন একসঙ্গে ব্যবহারের ক্ষেত্রে সুপারির এই উপাদান শরীরে প্রভাব ফেলতে পারে বলে জানা যায়।
তবে প্রাচীন মানুষ যদি শুধু গোটা সুপারি চুষে থাকে, তাহলেও যথেষ্ট পরিমাণে আরেকলিন শরীরে পৌঁছতে পারে কি না, সেটি ছিল গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই গবেষকেরা পরীক্ষাগারে বিশেষ পরীক্ষা চালান।
তাঁরা কৃত্রিম লালার মধ্যে সুপারি রেখে পরীক্ষা করেন। গবেষণায় দেখা যায়, গোটা সুপারি দীর্ঘ সময় চোষার ফলে এমন পরিমাণে আরেকলিন বেরিয়ে আসতে পারে, যা মানুষের শরীরে শারীরবৃত্তীয় প্রভাব ফেলতে সক্ষম।
এই ফলাফল প্রাচীন দাঁতের ক্ষয়ের সঙ্গে পাওয়া তথ্যকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে।
দাঁতের টিস্যুতেও মিলল আরেকলিনের চিহ্ন
গবেষণার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল দাঁতের টিস্যু পরীক্ষা। গবেষক কার্নি ম্যাথেসনের পৃথক জৈব-রাসায়নিক বিশ্লেষণেও প্রাচীন দাঁতের টিস্যুর মধ্যে আরেকলিনের উপস্থিতির প্রমাণ পাওয়া যায়।
এর ফলে গবেষকদের ধারণা আরও শক্তিশালী হয় যে ওই প্রাচীন মানুষরা সুপারি ব্যবহার করতেন।
শুধু দাঁতের আকৃতি বা ক্ষয়ের ওপর নির্ভর না করে রাসায়নিক প্রমাণও একই দিকে ইঙ্গিত করায় গবেষণাটি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
অর্থাৎ প্রায় ২৫ হাজার বছর আগে সুলাওয়েশি অঞ্চলের শিকারি-সংগ্রাহক মানুষেরা সুপারি চুষতেন—এমন সম্ভাবনার পক্ষে একাধিক প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে।
পান চিবানোর মতো অনুভূতি কি হত?
বর্তমানে পান-সুপারি খাওয়ার সঙ্গে যে অভিজ্ঞতা জড়িত, প্রাচীন মানুষের অভিজ্ঞতা সম্ভবত একেবারে একই ছিল না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু গোটা সুপারি চুষলে পান, চুন এবং সুপারি একসঙ্গে চিবানোর মতো অনুভূতি পাওয়া সম্ভব নয়। তবে সুপারির মধ্যে থাকা সক্রিয় রাসায়নিক উপাদান শরীরে নির্দিষ্ট ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
সেই প্রভাবই হয়তো প্রাচীন মানুষকে দীর্ঘ সময় সুপারি চোষার দিকে আকৃষ্ট করেছিল।
তবে সুপারি ব্যবহারের সঙ্গে একটি বড় স্বাস্থ্যঝুঁকিও জড়িয়ে ছিল। দীর্ঘদিন ধরে এই অভ্যাস চালিয়ে গেলে দাঁতের গঠন ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
নেশা নাকি দাঁতের ব্যথার ওষুধ?
গবেষকদের সামনে আরও একটি সম্ভাবনা রয়েছে। প্রাচীন মানুষ হয়তো শুধুমাত্র নেশার জন্য সুপারি ব্যবহার করত না। দাঁতের ব্যথা বা অন্য কোনও শারীরিক অস্বস্তি কমাতেও সুপারি চোষার প্রচলন থাকতে পারে।
কোনও উপাদান সাময়িকভাবে আরাম দিলেও দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহারে সেটিই আবার সমস্যা বাড়াতে পারে। সুপারির ক্ষেত্রেও এমনটা হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
প্রাচীন কঙ্কালের দাঁতে যে ক্ষয় পাওয়া গেছে, তা এই সম্ভাবনাকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে। অর্থাৎ মানুষ হয়তো কোনও ব্যথা বা অস্বস্তি কমানোর উদ্দেশ্যে সুপারি ব্যবহার শুরু করেছিল, পরে সেটি নেশা বা অভ্যাসে পরিণত হয়েছিল।
তবে ঠিক কোন উদ্দেশ্যে তাঁরা সুপারি ব্যবহার করতেন, তা নিশ্চিতভাবে বলার মতো পর্যাপ্ত প্রমাণ এখনও নেই।
দাঁতের ক্ষয়েই ধরা পড়ল প্রাচীন অভ্যাস
গবেষণাটির সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হল, মানুষের আচরণের একটি প্রাচীন ইতিহাস দাঁতের মতো ছোট একটি শারীরিক নিদর্শন থেকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে।
দাঁত সাধারণত কঙ্কালের অন্যান্য অংশের তুলনায় দীর্ঘ সময় টিকে থাকে। ফলে প্রাচীন মানুষের খাদ্যাভ্যাস, জীবনযাপন এবং কখনও কখনও তাঁদের অভ্যাস সম্পর্কেও দাঁত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিতে পারে।
সুলাওয়েশির এই দুই কঙ্কালের দাঁতের অস্বাভাবিক খাঁজ তাই শুধু দাঁতের রোগের চিহ্ন নয়। গবেষকদের কাছে এটি একটি সম্ভাব্য আচরণগত ‘সিগনেচার’।
এমন প্রমাণ ভবিষ্যতে অন্য প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনেও খুঁজে দেখা যেতে পারে।
কৃষির আগেই ছিল নেশার অভ্যাস?
নতুন গবেষণার সবচেয়ে বড় বার্তা সম্ভবত এখানেই। মানুষের নেশার ইতিহাসকে শুধুমাত্র কৃষির বিকাশের সঙ্গে যুক্ত করা সম্ভব নয়।
প্রায় ২৫ হাজার বছর আগে মানুষ তখনও মূলত শিকার ও খাদ্য সংগ্রহের ওপর নির্ভরশীল ছিল। সেই সময়েও তারা এমন উদ্ভিদ ব্যবহার করত, যার মধ্যে শরীর ও মস্তিষ্কে প্রভাব ফেলতে পারে এমন রাসায়নিক উপাদান রয়েছে।
অর্থাৎ নেশাজাতীয় উদ্ভিদ ব্যবহারের প্রবণতা হয়তো মানবসভ্যতার ইতিহাসে আরও গভীরে প্রোথিত।
তবে বিজ্ঞানীরা সতর্কভাবে বিষয়টি দেখছেন। দাঁতের ক্ষয়, রাসায়নিক প্রমাণ এবং পরীক্ষাগারের ফলাফল সুপারি ব্যবহারের পক্ষে শক্তিশালী ইঙ্গিত দিলেও প্রাচীন মানুষের উদ্দেশ্য সম্পর্কে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
তবু একটি বিষয় পরিষ্কার—মানুষের নেশার ইতিহাস আমাদের ধারণার চেয়েও অনেক পুরনো হতে পারে। আর সেই ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র লুকিয়ে থাকতে পারে হাজার হাজার বছর আগের মানুষের দাঁতের মধ্যেই।
—সংবাদ সংস্থার সাহায্য নিয়ে লেখা



