সর্বাধিক পঠিত

spot_img

সর্বশেষ আপডেট...

Homeজাতীয়বাক্‌স্বাধীনতা যেন বাক্‌শালীনতার সীমা লঙ্ঘন না করে: প্রধানমন্ত্রী

বাক্‌স্বাধীনতা যেন বাক্‌শালীনতার সীমা লঙ্ঘন না করে: প্রধানমন্ত্রী

মতবিরোধ যেন ব্যক্তিগত শত্রুতা বা সংঘাতে পরিণত না হয়, সে বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তিনি। রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা থাকবে, ভিন্নমতও থাকবে; কিন্তু রাষ্ট্র ও জনগণের স্বার্থকে সামনে রেখে সেই প্রতিযোগিতা পরিচালনা করতে হবে।

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা, ১০ সেপ্টম্বর : দেশে গণতান্ত্রিক পরিবেশ ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বজায় রাখার পাশাপাশি রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিসরে শালীনতা রক্ষার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, মানুষের কথা বলার অধিকার অবারিত হওয়া প্রয়োজন, তবে সেই স্বাধীনতা যেন কোনোভাবেই বাক্‌শালীনতার সীমা অতিক্রম না করে।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনের সমাপনী বক্তব্যে বৃহস্পতিবার প্রধানমন্ত্রী এ আহ্বান জানান। তাঁর বক্তব্যের সময় সংসদ সদস্যরা টেবিল চাপড়িয়ে সমর্থন জানান।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে দেশে গণতান্ত্রিক পরিবেশ বিরাজ করছে এবং মানুষের বাক্‌স্বাধীনতা রয়েছে। তবে মতপ্রকাশের অধিকার ব্যবহারের সময় দায়িত্বশীল আচরণ জরুরি। স্বাধীনভাবে কথা বলার সুযোগ থাকলেও এমন ভাষা ব্যবহার করা উচিত নয়, যা সামাজিক ও রাজনৈতিক শালীনতার সীমা অতিক্রম করে।

তিনি গালাগালির সংস্কৃতির বিরুদ্ধে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান। তাঁর মতে, গণতান্ত্রিক পরিবেশকে কার্যকর ও টেকসই করতে হলে রাজনৈতিক মতবিরোধের পাশাপাশি পারস্পরিক সম্মান ও শালীনতার চর্চাও প্রয়োজন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের মানুষ যেন আবার কোনো ফ্যাসিবাদী বা স্বৈরাচারী শাসনের অধীনে না পড়ে, সেটি নিশ্চিত করা সবার দায়িত্ব। একইভাবে কোনো বিবেকবান মানুষ বা দেশপ্রেমিক রাজনীতিবিদ চান না যে দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি গালাগালি ও অশালীন বক্তব্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ুক।

এ কারণে দল-মত নির্বিশেষে সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান তিনি। তাঁর বক্তব্যে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের সঙ্গে মতবিরোধ থাকলেও ব্যক্তিগত আক্রমণ ও অশালীন ভাষা পরিহারের ওপর বিশেষ গুরুত্ব উঠে আসে।

বাক্‌শালীনতা প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, পারিবারিক পরিবেশে মানুষ যে ধরনের কথা বলতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে না, জনপরিসরে সেই শব্দ ব্যবহারের প্রয়োজন কেন হবে?

সংসদ সদস্য ও দেশের সচেতন নাগরিকদের উদ্দেশে তিনি প্রশ্ন রাখেন, জনপরিসরে অশালীন শব্দ ব্যবহার থেকে সবাই কেন বিরত থাকবে না। তাঁর মতে, গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে হলে শুধু মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করলেই হবে না, সেই স্বাধীনতার দায়িত্বশীল ব্যবহারও নিশ্চিত করতে হবে।

তিনি বলেন, সবাই যদি গালাগালির সংস্কৃতির বিরুদ্ধে একমত হন, তাহলে সম্মিলিতভাবে এ ধরনের রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রবণতার বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া সম্ভব।

গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় মতপার্থক্য থাকা স্বাভাবিক বলে মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর মতে, বিশ্বের সব গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রেই বিভিন্ন বিষয়ে রাজনৈতিক মতভেদ ও প্রতিযোগিতা রয়েছে। এটিই গণতান্ত্রিক চর্চার স্বাভাবিক অংশ।

তবে মতবিরোধ যেন ব্যক্তিগত শত্রুতা বা সংঘাতে পরিণত না হয়, সে বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তিনি। রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা থাকবে, ভিন্নমতও থাকবে; কিন্তু রাষ্ট্র ও জনগণের স্বার্থকে সামনে রেখে সেই প্রতিযোগিতা পরিচালনা করতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী সতর্ক করে বলেন, গণতন্ত্রপন্থী শক্তিগুলোর মধ্যে বিরোধ ও বিভেদ তৈরি হলে এর সুযোগ নিতে পারে পরাজিত ফ্যাসিবাদী শক্তি। তাই দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এবং শহীদদের প্রতি দায়িত্ব পালনের অংশ হিসেবে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে রাষ্ট্র সংস্কারের কাজ চালিয়ে যেতে হবে।

তিনি সরকারি দল ও বিরোধী দল সব পক্ষকে দেশের কল্যাণে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান। এ প্রসঙ্গে তিনি তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানের কথা তুলে ধরে বলেন, ‘সবার আগে বাংলাদেশ, সবার জন্য বাংলাদেশ’ এই লক্ষ্য সামনে রেখেই রাষ্ট্র পরিচালনা ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড এগিয়ে নেওয়া প্রয়োজন।

প্রধানমন্ত্রী জাতীয় সংসদকে দেশের সব গুরুত্বপূর্ণ কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। তৃতীয় অধিবেশনে সরকারি ও বিরোধী দলের সদস্যদের মধ্যে বিভিন্ন বিষয়ে যে আলোচনা হয়েছে, সেটিকে তিনি ইতিবাচক হিসেবে দেখেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতীয় সংসদকে কার্যকর ও প্রাণবন্ত রাখার দায়িত্ব সংসদের প্রত্যেক সদস্যের। দেশের গণতন্ত্রকামী মানুষেরও এ সংসদকে ঘিরে প্রত্যাশা রয়েছে। জনগণের সমস্যা নিয়ে সংসদে কার্যকর আলোচনা হবে এবং সেখান থেকে মানুষের জন্য শান্তি ও সমৃদ্ধির পথ তৈরি হবে এটাই জনগণের প্রত্যাশা।

সমাপনী বক্তব্যে দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়েও কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি অভিযোগ করেন, অতীতে দুঃশাসন, দুর্নীতি, লুটপাট ও অর্থপাচারের কারণে বাংলাদেশকে বড় ধরনের আর্থিক চাপের মুখে পড়তে হয়েছে।

তাঁর দাবি, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দেশ ছাড়ার আগে সংশ্লিষ্ট শাসকগোষ্ঠী রাষ্ট্রের ওপর বিপুল ঋণের বোঝা রেখে গেছে। এখন সেই ঋণ পরিশোধের পাশাপাশি দেশের অর্থনৈতিক কাঠামোকে আরও শক্তিশালী করার দায়িত্ব বর্তমান সরকারের ওপর পড়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, অতীতের বিভিন্ন অনিয়মের কারণে বাংলাদেশ ঋণখেলাপির সমস্যার মুখোমুখি হয়েছে। বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে জানান, নির্বাচনের পর ঋণখেলাপির অনুপাত যেখানে ৩৫ দশমিক ৫ শতাংশ ছিল, বিভিন্ন উদ্যোগের ফলে তা কমে বর্তমানে ৩২ দশমিক ৬ শতাংশে নেমে এসেছে।

তিনি এটিকে অর্থনৈতিক পরিস্থিতির উন্নতির একটি ইঙ্গিত হিসেবে তুলে ধরেন। একই সঙ্গে অতীতের আর্থিক অনিয়মের দায় বর্তমান প্রজন্মের ওপর চাপিয়ে না দিয়ে রাষ্ট্রীয় অর্থব্যবস্থাকে আরও সুশৃঙ্খল করার ওপর জোর দেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, অতীতে বাংলাদেশকে ঋণের ভারে জর্জরিত করা হয়েছে। সেই ঋণের বোঝা এখনো জনগণকে বহন করতে হচ্ছে। তবে বর্তমান সরকার অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলা করে দেশকে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে।

বৈদেশিক ঋণ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী জানান, বর্তমান সরকার গত পাঁচ মাসে বিদেশি ঋণের আসল ও সুদ বাবদ ২০৪ কোটি ৭৬ লাখ মার্কিন ডলার পরিশোধ করেছে।

তিনি বলেন, অতীতের লুটপাট ও অর্থপাচারের কারণে দেশের ওপর এখনো বিপুল বৈদেশিক ঋণের দায় রয়েছে। এই ঋণের চাপ মোকাবিলা করে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করার পাশাপাশি ভবিষ্যতে দেশের আর্থিক সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন।

বৃহস্পতিবার বিকেল ৩টায় ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে জাতীয় সংসদের অধিবেশন শুরু হয়। পরে মাগরিবের নামাজের পর স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম সংসদ অধিবেশন সমাপ্তির বিষয়ে রাষ্ট্রপতির আদেশ সংসদে পড়ে শোনান।

সংসদের প্রচলিত রীতি অনুযায়ী সমাপনী দিনে প্রথমে বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান বক্তব্য দেন। এরপর সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সন্ধ্যা ৭টা ৪৫ মিনিটে সমাপনী বক্তব্য শুরু করেন।

গত ২৭ আগস্ট ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশন শুরু হয়েছিল। অধিবেশনের সমাপনী বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী রাজনৈতিক শালীনতা, গণতান্ত্রিক সহনশীলতা, সংসদের কার্যকারিতা এবং অর্থনৈতিক সংস্কারের ওপর গুরুত্ব দেন।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

জনপ্রিয় সংবাদ