নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা, ১০ সেপ্টেম্বর : অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান গ্রামীণ কল্যাণকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) দাবি করা ৬৬৬ কোটি টাকা কর পরিশোধ করতে হবে। এ অর্থ আয়কর বাবদ পরিশোধের নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট।
গ্রামীণ কল্যাণের দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে জারি করা রুল খারিজ করে বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) এ রায় ঘোষণা করেন হাইকোর্ট। বিচারপতি মো. মজিবুর রহমান মিয়ার নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ এ রায় দেন।
আদালতের এ সিদ্ধান্তের ফলে সংশ্লিষ্ট করবর্ষগুলোর জন্য এনবিআরের দাবি করা অর্থ আদায়ের পথ আরও স্পষ্ট হলো। আইনজীবীরা জানিয়েছেন, রিট খারিজ হওয়ায় গ্রামীণ কল্যাণের কাছ থেকে আয়কর বাবদ ৬৬৬ কোটি টাকা আদায় করতে পারবে এনবিআর।
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের মালিকানাধীন গ্রামীণ কল্যাণের কর সংক্রান্ত বিরোধটি বেশ কয়েক বছর ধরে আদালতে বিচারাধীন ছিল। বিভিন্ন করবর্ষে প্রতিষ্ঠানটির কাছ থেকে এনবিআর যে কর দাবি করেছিল, তার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে গ্রামীণ কল্যাণ আদালতের দ্বারস্থ হয়।
২০১৭ সালে প্রতিষ্ঠানটি এ বিষয়ে পৃথক দুটি রিট আবেদন করে। প্রাথমিক শুনানি শেষে হাইকোর্ট রুল জারি করেন। সেই রুলের ওপর দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া শেষে বৃহস্পতিবার নতুন বেঞ্চ সিদ্ধান্ত জানালেন।
আদালতের রায়ের ফলে রিট আবেদনগুলো খারিজ হয়ে গেছে। একই সঙ্গে এনবিআরের পক্ষে ওই কর দাবি আদায়ের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
গ্রামীণ কল্যাণের কাছ থেকে ৬৬৬ কোটি টাকা কর দাবির বিষয়টি কয়েকটি করবর্ষকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ২০১২-১৩, ২০১৩-১৪, ২০১৪-১৫, ২০১৫-১৬ এবং ২০১৬-১৭ করবর্ষ।
পুনর্মূল্যায়নের পর এসব করবর্ষের জন্য গ্রামীণ কল্যাণের কাছে এনবিআর যে কর দাবি করে, সেটি নিয়ে প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে রাজস্ব কর্তৃপক্ষের বিরোধ তৈরি হয়। পরে বিষয়টি গড়ায় উচ্চ আদালতে।
রিটের মাধ্যমে গ্রামীণ কল্যাণ কর দাবির বিষয়ে আদালতের হস্তক্ষেপ চেয়েছিল। তবে শেষ পর্যন্ত হাইকোর্টের নতুন বেঞ্চ রুল খারিজ করে এনবিআরের দাবির পক্ষে রায় দিয়েছেন।
এই কর মামলায় এর আগেও হাইকোর্টের একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত এসেছিল। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর ২০২৪ সালের ৪ অক্টোবর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের মালিকানাধীন গ্রামীণ কল্যাণের কাছ থেকে এনবিআরের দাবি করা ৬৬৬ কোটি টাকা দেওয়ার বিষয়ে দেওয়া আগের রায় স্বপ্রণোদিতভাবে প্রত্যাহার করে নেন হাইকোর্ট।
বিচারপতি মোহাম্মদ খুরশীদ আলম সরকার ও বিচারপতি সরদার মো. রাশেদ জাহাঙ্গীরের হাইকোর্ট বেঞ্চ ওই রায় প্রত্যাহার করেন। একই সঙ্গে মামলার নথি প্রধান বিচারপতির কাছে পাঠানো হয়।
এরপর মামলাটি নতুন বেঞ্চে শুনানির জন্য পাঠানো হয়। নতুন করে বিষয়টি পর্যালোচনা ও শুনানি শেষে বৃহস্পতিবার রায় ঘোষণা করা হলো।
হাইকোর্টে গ্রামীণ কল্যাণ ও ড. মুহাম্মদ ইউনূসের পক্ষে শুনানি করেন ব্যারিস্টার আবদুল্লাহ আল মামুন এবং ব্যারিস্টার ফিদা এম কামাল।
তারা রিটের পক্ষে আদালতে বিভিন্ন আইনি যুক্তি তুলে ধরেন। তবে শুনানি শেষে আদালত রুল খারিজ করে দেন। ফলে এনবিআরের দাবি করা আয়কর আদায়ের ক্ষেত্রে গ্রামীণ কল্যাণের আইনি চ্যালেঞ্জ সফল হয়নি।
হাইকোর্টের রায়ের পর জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের দাবি করা অর্থ আদায়ের সুযোগ তৈরি হয়েছে। আইনজীবীদের বক্তব্য অনুযায়ী, রিট খারিজ হওয়ায় গ্রামীণ কল্যাণের কাছ থেকে আয়কর বাবদ ওই ৬৬৬ কোটি টাকা আদায় করতে পারবে এনবিআর।
বাংলাদেশে কর আদায় নিয়ে রাজস্ব কর্তৃপক্ষ ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বিরোধ নতুন নয়। কোনো প্রতিষ্ঠান এনবিআরের কর নির্ধারণে আপত্তি জানালে তা অনেক সময় আপিল বা আদালতের মাধ্যমে নিষ্পত্তি হয়। গ্রামীণ কল্যাণের ক্ষেত্রেও দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার পর বিষয়টি হাইকোর্টে এসে চূড়ান্ত পর্যায়ের একটি সিদ্ধান্ত পেয়েছে।
গ্রামীণ কল্যাণের কর সংক্রান্ত এই মামলার শুরু কয়েক বছর আগে। ২০১৭ সালে দায়ের করা পৃথক দুটি রিটের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি এনবিআরের কর দাবিকে চ্যালেঞ্জ করে। এরপর প্রাথমিক শুনানি, রুল জারি, আগের রায় প্রত্যাহার এবং নতুন বেঞ্চে শুনানির মতো একাধিক ধাপ পেরিয়ে মামলাটি বর্তমান পর্যায়ে এসেছে।
বিশেষ করে ২০২৪ সালের অক্টোবরে আগের রায় প্রত্যাহারের পর মামলাটির ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে আইনি প্রক্রিয়া শুরু হয়। পরে প্রধান বিচারপতির নির্দেশনা অনুযায়ী মামলাটি নতুন বেঞ্চে শুনানির জন্য যায়।
নতুন বেঞ্চ সংশ্লিষ্ট নথি ও পক্ষগুলোর বক্তব্য পর্যালোচনা করে বৃহস্পতিবার রুল খারিজ করে রায় দেন। ফলে এনবিআরের দাবি করা ৬৬৬ কোটি টাকা কর নিয়ে গ্রামীণ কল্যাণের করা রিট আর বহাল থাকল না।


