এনবি সংবাদ অনলাইন : ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের বৈঠক ঘিরে প্রতিরক্ষা অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে রাশিয়ার পঞ্চম প্রজন্মের স্টেলথ যুদ্ধবিমান সুখোই এসইউ-৫৭ নিয়ে দুই দেশের মধ্যে বড় ধরনের সমঝোতা হতে পারে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। শুধু যুদ্ধবিমান কেনা নয়, যৌথ উৎপাদন ও প্রযুক্তি হস্তান্তরের বিষয়টিও আলোচনায় গুরুত্ব পেতে পারে।
আমেরিকার পক্ষ থেকে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান কেনার প্রস্তাব পাওয়ার পরও ভারত রাশিয়ার সঙ্গে দীর্ঘদিনের প্রতিরক্ষা সহযোগিতাকে কতটা গুরুত্ব দেবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। একই সঙ্গে সুখোই-৩০ এমকেআই আধুনিকীকরণ, এস-৪০০ এবং প্যান্টসিরের মতো আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার বিষয়ও আলোচনার তালিকায় থাকতে পারে।
ব্রিকস সম্মেলনকে সামনে রেখে পুতিনের ভারত সফর দুই দেশের কূটনৈতিক ও প্রতিরক্ষা সম্পর্ককে নতুন মাত্রা দিতে পারে। সম্মেলনের আগে মোদী ও পুতিনের বৈঠকে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা চুক্তি নিয়ে আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে সুখোই এসইউ-৫৭। এটি রাশিয়ার তৈরি পঞ্চম প্রজন্মের স্টেলথ যুদ্ধবিমান। রুশ বিমানবাহিনীতে এটি ‘ফেলন’ নামে পরিচিত। ভারতীয় প্রতিরক্ষা বাজারে এর রপ্তানি সংস্করণ এসইউ-৫৭ই নিয়েও মস্কো আগ্রহ দেখিয়েছে।
রাশিয়ার প্রস্তাবের বিশেষ দিক হলো, শুধু বিমান সরবরাহ নয়, ভারতের মাটিতে যৌথ উৎপাদনের সুযোগ দেওয়া। পাশাপাশি প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং গুরুত্বপূর্ণ সফটওয়্যার বা সোর্স কোড দেওয়ার বিষয়েও মস্কোর পক্ষ থেকে আগ্রহ প্রকাশ করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
ভারতের সামনে এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সিদ্ধান্তের প্রশ্ন রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি এফ-৩৫ বিশ্বের অন্যতম আলোচিত পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমান। অন্যদিকে রাশিয়া ভারতকে এসইউ-৫৭-এর ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে বেশি প্রযুক্তিগত সহযোগিতার প্রস্তাব দিচ্ছে।
ভারতের জন্য বিষয়টি শুধু যুদ্ধবিমান কেনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দেশটির প্রতিরক্ষা নীতিতে এখন স্থানীয় উৎপাদন, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং দেশীয় শিল্পের অংশগ্রহণকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ ও ‘আত্মনির্ভর ভারত’ কর্মসূচির কারণে বিদেশি অস্ত্র কেনার ক্ষেত্রেও প্রযুক্তি পাওয়ার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এই জায়গাতেই রাশিয়ার প্রস্তাব ভারতের কাছে আকর্ষণীয় হতে পারে। বিশেষ করে দেশীয় প্রতিষ্ঠান হিন্দুস্তান অ্যারোনটিক্স লিমিটেড বা হ্যালের মাধ্যমে উৎপাদন ও রক্ষণাবেক্ষণ সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হলে তা ভারতের দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরক্ষা শিল্পের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
এসইউ-৫৭-এর পাশাপাশি সুখোই-৩০ এমকেআই যুদ্ধবিমানের আধুনিকীকরণ নিয়েও আলোচনা হতে পারে। এই প্রকল্পটি ‘সুপার সুখোই’ নামে পরিচিত।
প্রস্তাবিত আধুনিকীকরণের মাধ্যমে ভারতীয় বায়ুসেনার পুরনো সুখোই-৩০ এমকেআই বিমানগুলোকে আরও আধুনিক প্রযুক্তিতে সজ্জিত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এতে উন্নত রাডার, নেভিগেশন ব্যবস্থা, ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার প্রযুক্তি এবং নতুন সেন্সর যুক্ত করার কথা রয়েছে।
প্রকল্পটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার স্যুট। এর ফলে যুদ্ধক্ষেত্রে শত্রুপক্ষের রাডার ও যোগাযোগব্যবস্থা শনাক্ত এবং মোকাবিলায় বিমানগুলোর সক্ষমতা বাড়তে পারে।
দূরপাল্লার আকাশ থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য আর-৩৭এম ক্ষেপণাস্ত্রসহ আধুনিক অস্ত্র ব্যবহারের সক্ষমতাও এই প্রকল্পের অংশ হতে পারে। ফলে বর্তমান সুখোই-৩০ এমকেআই বহরের কার্যক্ষমতা আরও কয়েক ধাপ বাড়ানোর লক্ষ্য রয়েছে।
মোদী-পুতিন বৈঠকে রাশিয়ার এস-৪০০ ট্রায়াম্ফ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হতে পারে। ভারতের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় এস-৪০০ ইতিমধ্যেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ভারতের প্রতিরক্ষা ক্রয়বিষয়ক কমিটি রাশিয়া থেকে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে ২৮৮টি এস-৪০০ ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্র কেনার প্রস্তাবে অনুমোদন দেয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে স্বল্প ও দীর্ঘপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে।
এর পাশাপাশি এস-৪০০-এর পরবর্তী স্তরের ব্যবস্থা এস-৫০০ নিয়েও রাশিয়ার আগ্রহ রয়েছে। ফলে ভারত ভবিষ্যতে আরও উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি সংগ্রহ করবে কি না, সেটিও আলোচনায় আসতে পারে।
রাশিয়ার প্যান্টসির আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও সম্ভাব্য চুক্তির তালিকায় রয়েছে। ভারতের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠান ভারত ডায়নামিক্স লিমিটেড এবং রুশ অস্ত্র রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান রোসোবোরোনএক্সপোর্টের মধ্যে এই ব্যবস্থা যৌথভাবে উৎপাদনের বিষয়ে প্রাথমিক সমঝোতার কথা জানা গেছে।
প্যান্টসির একটি স্বল্প ও মধ্যপাল্লার বহুমুখী আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। বিমান, ড্রোন এবং অন্যান্য আকাশপথের হুমকি মোকাবিলায় এটি ব্যবহার করা যায়। ক্ষেপণাস্ত্র ও কামানভিত্তিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে রাডার ও ট্র্যাকিং প্রযুক্তি যুক্ত থাকায় এটি একাধিক ধরনের লক্ষ্য শনাক্ত ও মোকাবিলা করতে সক্ষম।
ভারতের জন্য ড্রোন ও বিভিন্ন ধরনের আকাশপথের হুমকি মোকাবিলায় এমন ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। বিশেষ করে সীমান্ত ও গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনার সুরক্ষায় বহুস্তরীয় আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা বাড়ছে।
মোদী-পুতিন বৈঠকের আলোচনার পরিধি শুধু অস্ত্র চুক্তিতে সীমাবদ্ধ থাকবে না। ক্রেমলিনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, দুই দেশের বাণিজ্য, জ্বালানি ও পারমাণবিক সহযোগিতার বিষয়ও আলোচনায় থাকতে পারে।
ভারতে নতুন রুশ পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন এবং অসামরিক পরমাণু সহযোগিতা সম্প্রসারণ নিয়ে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা হতে পারে। পাশাপাশি দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যে ডলারের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ভারতীয় রুপি ও রুশ রুবলের ব্যবহার বাড়ানোর বিষয়টিও গুরুত্ব পেতে পারে।
ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে রাশিয়ার ওপর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা থাকায় ভারত-রাশিয়া বাণিজ্যে বিকল্প অর্থপ্রদানের ব্যবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তেল আমদানি এবং বাণিজ্যের ওপর মার্কিন চাপের বিষয়টিও দুই রাষ্ট্রনেতার আলোচনায় জায়গা পেতে পারে।
এসইউ-৫৭ নিয়ে ভারতের আগ্রহের সবচেয়ে বড় কারণগুলোর একটি হতে পারে প্রযুক্তি হস্তান্তরের সুযোগ। ভারত দীর্ঘদিন ধরে বিদেশি প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম আমদানির পাশাপাশি নিজস্ব উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে।
এ কারণে কোনো আধুনিক যুদ্ধবিমান কেনার ক্ষেত্রে শুধু বিমান পাওয়া যথেষ্ট নয়। বিমানটির রক্ষণাবেক্ষণ, যন্ত্রাংশ উৎপাদন, সফটওয়্যার, প্রযুক্তিগত জ্ঞান এবং ভবিষ্যতে নিজস্বভাবে উন্নয়ন করার সক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ।
রাশিয়ার প্রস্তাবে যৌথ উৎপাদন ও প্রযুক্তি সহযোগিতার বিষয় থাকায় সেটি ভারতের দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরক্ষা শিল্পনীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে খরচ, প্রযুক্তির বাস্তব মূল্য, উৎপাদন সক্ষমতা, রক্ষণাবেক্ষণ এবং ভবিষ্যৎ আপগ্রেডের বিষয়গুলো ভারতকে বিবেচনা করতে হবে।
তথ্য সূত্র: আনন্দবাজার



