পর্তুগাল জাতীয় দলের বিশ্বকাপ অভিযান শুরু হওয়ার আগেই যেভাবে তাদের অন্যতম শিরোপা দাবিদার হিসেবে দেখা হচ্ছিল, মাঠের বাস্তবতা যেন তার সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র তুলে ধরেছে। ডিআর কঙ্গোর বিপক্ষে হতাশাজনক ১-১ গোলের ড্রয়ের পর শুধু সমর্থকরাই নয়, ফুটবল বিশ্লেষক এবং সাবেক খেলোয়াড়রাও তীব্র সমালোচনায় মুখর হয়ে উঠেছেন। এর মধ্যেই ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর বোন কাতিয়া আভেইরোর একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কার্যকলাপ নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে পর্তুগাল শুরুটা করেছিল দারুণভাবে। তরুণ মিডফিল্ডার জোয়াও নেভেসের অসাধারণ হেডার দলকে দ্রুত এগিয়ে দেয়। মনে হচ্ছিল ম্যাচটি সহজেই নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখবে ইউরোপীয় দলটি।
কিন্তু হাফটাইমের ঠিক আগে ইয়োয়ান উইসার গোল ডিআর কঙ্গোকে ম্যাচে ফিরিয়ে আনে। এরপর পুরো ম্যাচে পর্তুগাল আক্রমণে আধিপত্য বিস্তার করলেও কাঙ্ক্ষিত জয়সূচক গোলটি আর খুঁজে পায়নি। ফিফা বিশ্ব র্যাঙ্কিংয়ে দুই দলের মধ্যে বিশাল ব্যবধান থাকলেও মাঠে তার প্রতিফলন দেখা যায়নি।
ম্যাচ শেষে সবচেয়ে বেশি সমালোচিত খেলোয়াড়দের একজন ছিলেন ব্রুনো ফার্নান্দেস। ক্লাব ফুটবলে ধারাবাহিকভাবে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স করলেও জাতীয় দলের জার্সিতে তিনি প্রত্যাশা পূরণ করতে পারছেন না—এমন অভিযোগ নতুন নয়।
এই পরিস্থিতিতে একটি ব্রাজিলিয়ান ফুটবলভিত্তিক ইনস্টাগ্রাম পেজ ব্রুনোকে নিয়ে কটাক্ষপূর্ণ পোস্ট করে। সেখানে তাকে ব্রাজিলিয়ান উইঙ্গার রাফিনহার সঙ্গে তুলনা করা হয়, যিনি সম্প্রতি জাতীয় দলের হয়ে বাজে ফর্মের কারণে সমালোচনার মুখে পড়েছেন।
পোস্টটিতে দাবি করা হয়, ক্লাব পর্যায়ে উজ্জ্বল হলেও জাতীয় দলের হয়ে ব্রুনোর প্রভাব অনেক কম। বিষয়টি আরও আলোচনায় আসে যখন দেখা যায়, ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর বড় বোন কাতিয়া আভেইরো সেই পোস্টে ‘লাইক’ দিয়েছেন। ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই এটিকে পর্তুগাল শিবিরের অভ্যন্তরীণ বিভক্তির ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন।
তবে ব্রুনো ফার্নান্দেস একমাত্র সমালোচিত খেলোয়াড় নন। বরং ম্যাচ শেষে সবচেয়ে বেশি প্রশ্নের মুখে পড়েছেন পর্তুগালের অধিনায়ক ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো।
ডিআর কঙ্গোর বিপক্ষে পুরো ম্যাচে তিনি মাত্র ২৫ বার বল স্পর্শ করেন এবং কোনো উল্লেখযোগ্য গোলের সুযোগ তৈরি করতে পারেননি। সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, এমন পারফরম্যান্সের পরও তাকে মাঠ থেকে তুলে নেওয়া হয়নি।
সমর্থকদের একটি বড় অংশের মতে, রোনালদোর বর্তমান ভূমিকা নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। অনেকেই মনে করছেন, তার অভিজ্ঞতা অমূল্য হলেও প্রতিটি ম্যাচে পুরো সময় মাঠে রাখা দলের জন্য সবসময় ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নাও হতে পারে।
ম্যাচের ৮৩তম মিনিটে পর্তুগালের একটি গোলের খুব প্রয়োজন ছিল। সেই সময় কোচ রবার্তো মার্টিনেজ মিডফিল্ডার ভিতিনহাকে তুলে গনসালো রামোসকে মাঠে নামান। কিন্তু রোনালদোকে মাঠে রেখেই এই পরিবর্তন করেন তিনি।
এই সিদ্ধান্ত নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানান সাবেক ইংল্যান্ড ফরোয়ার্ড ক্রিস সাটন। তার মতে, মার্টিনেজ রোনালদোকে বদলি করতে সাহস দেখাতে পারেননি। সাটন মনে করেন, আধুনিক ফুটবলের গতি ও তীব্রতার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে রোনালদোর ভূমিকা এখন অনেক সীমিত হয়ে গেছে।
তার মন্তব্য ফুটবল অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। অনেক বিশ্লেষকও প্রশ্ন তোলেন, দলের স্বার্থে কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে মার্টিনেজ কতটা স্বাধীন।
সমালোচনার জবাবে রবার্তো মার্টিনেজ স্পষ্টভাবে রোনালদোর পাশে দাঁড়িয়েছেন। তিনি বলেন, যখন একটি দলের গোলের প্রয়োজন হয়, তখন বিশ্বের অন্যতম সেরা গোলদাতাকে মাঠ থেকে তুলে নেওয়া যৌক্তিক নয়।
মার্টিনেজের মতে, প্রতিপক্ষ যখন গভীর রক্ষণাত্মক কৌশল গ্রহণ করে, তখন রোনালদোর অবস্থানগত বুদ্ধিমত্তা এবং ডিফেন্ডারদের ব্যস্ত রাখার ক্ষমতা দলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
তিনি আরও ব্যাখ্যা করেন যে, রোনালদো শুধু গোল করার জন্য নয়, আক্রমণভাগে ফাঁকা জায়গা তৈরি করতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাই ম্যাচের শেষ মুহূর্তে তাকে মাঠে রাখা ছিল কৌশলগত সিদ্ধান্ত।
বিশ্বকাপের ফলাফল যাই হোক, অনেকেই মনে করছেন এই টুর্নামেন্টই হতে পারে রবার্তো মার্টিনেজের শেষ আন্তর্জাতিক আসর। পর্তুগাল যদি প্রত্যাশা অনুযায়ী পারফর্ম করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে তার বিদায় প্রায় নিশ্চিত বলেই ধারণা করা হচ্ছে।
একই সময়ে নতুন খবর এসেছে যে সৌদি আরবের ক্লাব আল নাসর তাকে প্রধান কোচ হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার বিষয়ে আগ্রহী। ক্লাবটি বর্তমানে নতুন ম্যানেজার খুঁজছে এবং মার্টিনেজ তাদের অন্যতম পছন্দের প্রার্থী হিসেবে বিবেচিত হচ্ছেন।
যদি মার্টিনেজ আল নাসরের দায়িত্ব গ্রহণ করেন, তাহলে তিনি আবারও ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর সঙ্গে কাজ করার সুযোগ পাবেন। শুধু তাই নয়, পর্তুগিজ তারকা জোয়াও ফেলিক্সও ভবিষ্যতে সেই প্রকল্পের অংশ হতে পারেন বলে গুঞ্জন রয়েছে।
এক দশকেরও বেশি সময় পর ক্লাব ফুটবলে প্রত্যাবর্তন মার্টিনেজের ক্যারিয়ারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হতে পারে। উইগান অ্যাথলেটিক এবং এভারটনের সাবেক এই কোচের জন্য মধ্যপ্রাচ্যের ফুটবল এখন আকর্ষণীয় একটি গন্তব্য হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ডিআর কঙ্গোর বিপক্ষে ড্র শুধু পর্তুগালের বিশ্বকাপ যাত্রাকেই কঠিন করে তোলেনি, বরং দলের ভেতরের পরিবেশ নিয়েও নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। ব্রুনো ফার্নান্দেসকে ঘিরে বিতর্ক, রোনালদোর পারফরম্যান্স নিয়ে সমালোচনা এবং রবার্তো মার্টিনেজের ভবিষ্যৎ নিয়ে জল্পনা—সব মিলিয়ে পর্তুগাল এখন চাপের মধ্যেই রয়েছে।
বিশ্বকাপের মতো বড় মঞ্চে দ্রুত ঘুরে দাঁড়ানোই হবে তাদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। অন্যথায়, শিরোপার স্বপ্ন শুরু হওয়ার আগেই বড় ধাক্কা খেতে পারে ইউরোপের অন্যতম শক্তিশালী এই দল।

