খবর পান সবার আগে

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। আমাদের নিউজলেটারে সাবস্ক্রাইব করুন এবং দেশ-বিদেশের গুরুত্বপূর্ণ সংবাদগুলো প্রতিদিন আপনার ইমেইলে পান।

― Advertisement ―

spot_imgspot_img
Homeগণমাধ্যমসাগর-রুনি হত্যা মামলায় আবারও বিলম্ব! ১২৭ বার পিছালো তদন্ত প্রতিবেদন

সাগর-রুনি হত্যা মামলায় আবারও বিলম্ব! ১২৭ বার পিছালো তদন্ত প্রতিবেদন

হত্যাকাণ্ডের পর নিহত রুনির ভাই নওশের আলম রোমান রাজধানীর শেরেবাংলা নগর থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। সেই মামলার ভিত্তিতেই শুরু হয় দীর্ঘ তদন্ত কার্যক্রম।

সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যা মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের তারিখ আবারও পিছিয়েছে। সর্বশেষ আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, মামলার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নতুন তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে আগামী ২২ জুলাই। এর মাধ্যমে বহুল আলোচিত এই হত্যা মামলায় তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের সময়সীমা মোট ১২৭ বার পিছিয়ে গেল, যা দেশের বিচারব্যবস্থা ও তদন্ত প্রক্রিয়া নিয়ে নতুন করে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আরিফুল ইসলামের আদালতে মামলাটির শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। এদিন তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য নির্ধারিত তারিখ ছিল। তবে তদন্তকারী সংস্থা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) নির্ধারিত সময়ে প্রতিবেদন জমা দিতে ব্যর্থ হয়। ফলে আদালত নতুন করে আগামী ২২ জুলাই প্রতিবেদন দাখিলের দিন ধার্য করেন।

আদালত সূত্রে জানা গেছে, তদন্তের অগ্রগতি সম্পন্ন না হওয়ায় পিবিআই সময়ের আবেদন জানায়। সেই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত নতুন তারিখ নির্ধারণ করেন। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ঢাকা মহানগর পুলিশের প্রসিকিউশন বিভাগের উপপরিদর্শক রফিকুল ইসলাম।

২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারের একটি ভাড়া বাসা থেকে সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনির মরদেহ উদ্ধার করা হয়। নৃশংস এই হত্যাকাণ্ড দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। ঘটনার সময় বাসার ভেতরেই উপস্থিত ছিল তাদের সাড়ে চার বছর বয়সী একমাত্র ছেলে মাহির সরওয়ার মেঘ।

সাগর সরওয়ার তখন বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল মাছরাঙা টেলিভিশনের বার্তা সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। অন্যদিকে মেহেরুন রুনি কর্মরত ছিলেন এটিএন বাংলার জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক হিসেবে। দেশের গণমাধ্যম অঙ্গনে তারা ছিলেন পরিচিত ও সম্মানিত মুখ।

হত্যাকাণ্ডের পর নিহত রুনির ভাই নওশের আলম রোমান রাজধানীর শেরেবাংলা নগর থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। সেই মামলার ভিত্তিতেই শুরু হয় দীর্ঘ তদন্ত কার্যক্রম।

মামলার তদন্ত শুরুতে পরিচালনা করে শেরেবাংলা নগর থানা পুলিশ। পরবর্তীতে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয় ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশকে (ডিবি)। এরপর দায়িত্ব যায় র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‌্যাব) হাতে।

তবে বছরের পর বছর তদন্ত চললেও মামলার কোনো চূড়ান্ত প্রতিবেদন আদালতে জমা দেওয়া সম্ভব হয়নি। দীর্ঘসূত্রতা ও তদন্তে অগ্রগতির অভাব নিয়ে ভুক্তভোগী পরিবার, সাংবাদিক সমাজ এবং মানবাধিকার সংগঠনগুলো বারবার উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

মামলার তদন্তে দীর্ঘ বিলম্বের কারণে গত বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর হাইকোর্ট গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা প্রদান করেন। আদালত র‌্যাবের কাছ থেকে তদন্তভার সরিয়ে একটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন টাস্কফোর্স গঠনের নির্দেশ দেন।

বিচারপতি ফারাহ মাহবুব এবং বিচারপতি মুহাম্মদ মাহবুব উল ইসলামের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এক আদেশে বলেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে গঠিত বিশেষ টাস্কফোর্স এই মামলার তদন্ত পরিচালনা করবে।

আদালতের নির্দেশ অনুসারে গত ২৩ অক্টোবর সরকার চার সদস্যবিশিষ্ট একটি টাস্কফোর্স গঠন করে। এই টাস্কফোর্সের আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয় পিবিআই প্রধানকে। আশা করা হয়েছিল, নতুন এই উদ্যোগ তদন্তে গতি আনবে এবং দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত রহস্যের সমাধান হবে।

মামলায় অভিযুক্তদের মধ্যে রয়েছেন রফিকুল ইসলাম, বকুল মিয়া, মাসুম মিন্টু, কামরুল ইসলাম ওরফে অরুণ, আবু সাঈদ, নিরাপত্তারক্ষী পলাশ রুদ্র পাল, এনায়েত আহমেদ এবং তাদের পরিচিত তানভীর রহমান খান।

বর্তমানে তানভীর রহমান খান ও পলাশ রুদ্র পাল জামিনে রয়েছেন। অন্য আসামিরা কারাগারে আটক আছেন। যদিও এত বছর পেরিয়ে গেলেও মামলার তদন্ত সম্পন্ন না হওয়ায় অভিযোগপত্র ও বিচারিক প্রক্রিয়া পূর্ণাঙ্গভাবে এগোতে পারেনি।

সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের ১৪ বছরেরও বেশি সময় পার হয়ে গেছে। কিন্তু এখনও তদন্ত প্রতিবেদন জমা না হওয়ায় বিচার প্রক্রিয়া শুরুই করা সম্ভব হয়নি। একের পর এক তারিখ পেছানোয় নিহতদের পরিবার, সহকর্মী এবং দেশের সাংবাদিক সমাজের মধ্যে হতাশা বাড়ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি বহুল আলোচিত হত্যা মামলার তদন্তে এত দীর্ঘ সময় নেওয়া বিচার ব্যবস্থার জন্য উদ্বেগজনক। একই সঙ্গে এটি অপরাধ তদন্তের দক্ষতা ও কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তোলে।

সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যা মামলা বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে আলোচিত এবং দীর্ঘসূত্রতায় ভোগা মামলাগুলোর একটি। তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের তারিখ ১২৭ বার পিছিয়ে যাওয়ার ঘটনা বিচারপ্রত্যাশী মানুষের কাছে হতাশাজনক হলেও নতুন টাস্কফোর্সের মাধ্যমে তদন্তে অগ্রগতি আসবে—এমন প্রত্যাশা এখনও রয়েছে। এখন সবার দৃষ্টি আগামী ২২ জুলাইয়ের দিকে, যখন আদালতে মামলার সর্বশেষ তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কথা রয়েছে।