২০২৬ সালের ফিফা বিশ্বকাপকে সামনে রেখে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত বিশ্বের শীর্ষ ফুটবল শক্তিগুলো। বিশ্বকাপের আগে নিজেদের শেষ প্রস্তুতি ম্যাচে মাঠে নেমে জয় পেয়েছে আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল এবং পর্তুগাল। তবে জয় পেলেও সব দলের পারফরম্যান্স যে সমর্থকদের পুরোপুরি আশ্বস্ত করতে পেরেছে, এমনটা বলা যাবে না। বিশেষ করে ব্রাজিলের জন্য জয় যেমন স্বস্তির খবর, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ এক ফুটবলারের চোট নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
বিশ্বকাপের অন্যতম ফেভারিট এই তিন দল শেষ প্রস্তুতি ম্যাচে জয়ের ধারা বজায় রেখে টুর্নামেন্টের আগে আত্মবিশ্বাস বাড়ালেও কিছু প্রশ্ন এখনও রয়ে গেছে। বিশেষ করে দলগত সমন্বয়, খেলোয়াড়দের ফিটনেস এবং বড় মঞ্চে ধারাবাহিক পারফরম্যান্স নিয়ে আলোচনা চলছে ফুটবল বিশ্বে।
বিশ্বকাপের আগে নিজেদের শেষ প্রস্তুতি ম্যাচে যুক্তরাষ্ট্রের ক্লিভল্যান্ডে মিশরের মুখোমুখি হয়েছিল ব্রাজিল। আগের ম্যাচে পানামাকে ৬-২ গোলের বিশাল ব্যবধানে হারিয়ে আত্মবিশ্বাসে উজ্জীবিত ছিল সেলেসাওরা। তবে মিশরের বিপক্ষে তুলনামূলক কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হয় তাদের।
ম্যাচে ২-১ গোলের জয় তুলে নেয় ব্রাজিল। দলের হয়ে গোল করেন ব্রুনো গুইমারেস এবং তরুণ তারকা এনড্রিক। আক্রমণভাগে ভিনিসিয়ুস জুনিয়রদের উপস্থিতি প্রতিপক্ষকে চাপে রাখলেও পুরো ম্যাচে ব্রাজিলের খেলায় কিছুটা অস্থিরতা লক্ষ্য করা গেছে।
তবে ম্যাচের ফলের চেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে রাইটব্যাক ওয়েসলির চোট। ম্যাচের মাত্র ১৫ মিনিট পরই বাঁ কুঁচকিতে ব্যথা অনুভব করে মাঠ ছাড়তে বাধ্য হন তিনি। সাইডলাইনে বসে কান্নায় ভেঙে পড়ার দৃশ্য ব্রাজিল সমর্থকদের আরও উদ্বিগ্ন করে তোলে।
বিশ্বকাপ শুরুর আগে তাঁর ফিট হয়ে ওঠা নিয়ে এখন বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। ম্যাচ শেষে কোচ কার্লো আন্সেলোত্তি ওয়েসলির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে তিনি জানান, প্রয়োজনে বিকল্প খেলোয়াড়দের প্রস্তুত রাখা হয়েছে। তবুও গুরুত্বপূর্ণ সময়ে এমন চোট ব্রাজিল শিবিরে বাড়তি চাপ সৃষ্টি করেছে।
অন্যদিকে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা তাদের শেষ প্রস্তুতি ম্যাচে মুখোমুখি হয়েছিল হন্ডুরাসের। এই ম্যাচে বিশেষ আকর্ষণ ছিল হন্ডুরাসের কোচ জোসে মোলিনা, যিনি ভারতীয় ক্লাব ফুটবলে পরিচিত মুখ এবং মোহনবাগানের সাবেক প্রধান কোচ।
ম্যাচের আগে মোলিনা ও আর্জেন্টিনা কোচ লিওনেল স্কালোনির সৌহার্দ্যপূর্ণ সাক্ষাৎ ফুটবলপ্রেমীদের নজর কাড়ে। তবে মাঠের খেলায় আর্জেন্টিনা প্রতিপক্ষকে খুব বেশি সুযোগ দেয়নি।
পূর্ণ ফিটনেস না থাকায় অধিনায়ক লিওনেল মেসি এই ম্যাচে খেলেননি। কিন্তু মেসির অনুপস্থিতি দলকে খুব বেশি ভোগাতে পারেনি। শুরু থেকেই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রাখে আলবিসেলেস্তেরা।
প্রথমার্ধের ৩৭ মিনিটে নিকোলাস তালিয়াফিকো বক্সের মধ্যে ফাউলের শিকার হলে পেনাল্টি পায় আর্জেন্টিনা। স্পট কিক থেকে নিখুঁত শটে গোল করে দলকে এগিয়ে দেন লওতারো মার্টিনেজ।
দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই ব্যবধান দ্বিগুণ করেন জুলিয়ানো সিমিওনে। এরপর আর কোনো গোল না হলেও পুরো ম্যাচে আর্জেন্টিনার আধিপত্য ছিল স্পষ্ট। মেসি ছাড়া দল যে এখনও শক্তিশালী ও ভারসাম্যপূর্ণ, এই ম্যাচে তার প্রমাণ মিলেছে।
বিশ্বকাপের আরেক সম্ভাব্য দাবিদার পর্তুগালও শেষ প্রস্তুতি ম্যাচে জয় পেয়েছে। শক্তিশালী চিলির বিপক্ষে ২-১ গোলের গুরুত্বপূর্ণ জয় তুলে নেয় ইউরোপের এই দলটি।
ম্যাচে পর্তুগালের হয়ে গোল করেন গনসালো গুইদেস এবং ব্রুনো ফার্নান্দেজ। মাঝমাঠ ও আক্রমণভাগে পর্তুগালের নিয়ন্ত্রিত ফুটবল দর্শকদের মুগ্ধ করেছে। যদিও চিলিও কয়েকবার পাল্টা আক্রমণে বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি করেছিল।
অভিজ্ঞ অধিনায়ক ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোর নেতৃত্বে পর্তুগাল বিশ্বকাপের আগে নিজেদের প্রস্তুতি নিয়ে বেশ আত্মবিশ্বাসী। দলের তরুণ ও অভিজ্ঞ খেলোয়াড়দের সমন্বয় তাদেরকে শিরোপা লড়াইয়ের অন্যতম শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বীতে পরিণত করেছে।
শেষ প্রস্তুতি ম্যাচগুলোর ফলাফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা এবং পর্তুগাল তিন দলই জয় নিয়ে বিশ্বকাপের মঞ্চে প্রবেশ করছে। তবে প্রতিটি দলেরই কিছু না কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
ব্রাজিলকে ভাবাচ্ছে ইনজুরি সমস্যা, বিশেষ করে ওয়েসলির শারীরিক অবস্থা। আর্জেন্টিনার ক্ষেত্রে মেসির ফিটনেস বড় আলোচনার বিষয়। অন্যদিকে পর্তুগালকে বড় টুর্নামেন্টে ধারাবাহিকতা ধরে রাখার পরীক্ষা দিতে হবে।
তবুও প্রস্তুতি ম্যাচে জয় পাওয়ায় তিন দলের আত্মবিশ্বাস নিঃসন্দেহে বেড়েছে। বিশ্বকাপের মতো বড় আসরে মানসিক প্রস্তুতি এবং জয়ের অভ্যাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সেই দিক থেকে বিচার করলে তিন ফেভারিটই ইতিবাচক অবস্থানে রয়েছে।
ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬ ঘিরে উত্তেজনা দিন দিন বাড়ছে। শেষ প্রস্তুতি ম্যাচে জয় পেয়ে ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা এবং পর্তুগাল তাদের শক্তিমত্তার আভাস দিয়েছে। তবে একই সঙ্গে ফুটবল বিশ্ব দেখেছে চোটের শঙ্কা, ফিটনেসের প্রশ্ন এবং কৌশলগত কিছু সীমাবদ্ধতাও।
মেসিহীন আর্জেন্টিনার স্বস্তিদায়ক জয়, ওয়েসলির চোটে ব্রাজিলের উদ্বেগ এবং রোনাল্ডোর পর্তুগালের আত্মবিশ্বাসী পারফরম্যান্স—সব মিলিয়ে বিশ্বকাপের আগে ফুটবলপ্রেমীদের প্রত্যাশা আরও বেড়ে গেছে। এখন অপেক্ষা কেবল বিশ্বের সবচেয়ে বড় ফুটবল মঞ্চে এই তারকাখচিত দলগুলোর প্রকৃত শক্তি দেখার।

