খবর পান সবার আগে

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। আমাদের নিউজলেটারে সাবস্ক্রাইব করুন এবং দেশ-বিদেশের গুরুত্বপূর্ণ সংবাদগুলো প্রতিদিন আপনার ইমেইলে পান।

― Advertisement ―

spot_imgspot_img
Homeস্পোটস ওয়ার্ল্ডফিফা বিশ্বকাপ স্পেশালমারাদোনা থেকে মেসি: আর্জেন্টিনার জার্সির নেপথ্যে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ ও অবিশ্বাস্য ইতিহাস

মারাদোনা থেকে মেসি: আর্জেন্টিনার জার্সির নেপথ্যে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ ও অবিশ্বাস্য ইতিহাস

১৮১৮ সালে পতাকার মাঝখানে যুক্ত হয় ৩২টি রশ্মিযুক্ত সূর্যের প্রতীক। এটি ইনকা সভ্যতার সূর্যদেবের প্রতীক হিসেবে পরিচিত। এরপর থেকেই নীল-সাদা-সূর্য মিলিয়ে গড়ে ওঠে আধুনিক আর্জেন্টিনার জাতীয় পরিচয়।

ফুটবলের ইতিহাসে এমন কিছু জার্সি আছে, যেগুলো কেবল একটি দলের পরিচয় নয়, বরং একটি জাতির ইতিহাস, সংস্কৃতি ও আবেগের প্রতীক। আর্জেন্টিনা জাতীয় ফুটবল দলের নীল-সাদা ডোরাকাটা জার্সি ঠিক তেমনই একটি প্রতীক। দিয়েগো মারাদোনা, মারিও কেম্পেস কিংবা লিওনেল মেসি—প্রজন্মের পর প্রজন্মের কিংবদন্তির শরীরে দেখা গেছে এই আইকনিক জার্সি। কিন্তু এই নীল-সাদা রঙের পেছনে রয়েছে শতাব্দীজুড়ে ধর্মীয় ঐতিহ্য, স্বাধীনতার সংগ্রাম, রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ এবং এক অনন্য ঐতিহাসিক যাত্রা।

আর্জেন্টিনার জাতীয় রঙের ইতিহাস বুঝতে হলে ফিরে যেতে হবে ১০৫৪ সালে। সে সময় খ্রিস্টান চার্চ বিভক্ত হয়ে যায়। পূর্বাঞ্চলের অর্থোডক্স বা বাইজেন্টাইন চার্চে নীল রঙকে বিশেষভাবে পবিত্র হিসেবে বিবেচনা করা হতো।

তখন ইউরোপে নীল রঙ অত্যন্ত দুর্লভ ছিল। আফগানিস্তানের লাপিস লাজুলি পাথর থেকে তৈরি হতো মূল্যবান নীল রঞ্জক। সমুদ্রপথে আসা এই রঙের নাম ছিল আল্ট্রামেরিন। এর মূল্য এতটাই বেশি ছিল যে এটি মূলত ধর্মীয় চিত্রকর্ম ও পবিত্র ব্যক্তিত্বদের পোশাকেই ব্যবহার করা হতো।

বিশেষ করে মাতা মেরির পোশাককে নীল-সাদা রঙে উপস্থাপন করা হতো। এই ধর্মীয় প্রতীক পরবর্তী সময়ে ইউরোপ ও লাতিন আমেরিকার সংস্কৃতিতে গভীর প্রভাব ফেলে।

উনিশ শতকের শুরুতে স্পেনের ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে স্বাধীনতার আন্দোলনে নামে আর্জেন্টিনা। স্প্যানিশ বাহিনীর প্রতীক ছিল লাল, সাদা ও সোনালি রঙ। তাই স্বাধীনতার সংগ্রামীদের প্রয়োজন ছিল সম্পূর্ণ আলাদা একটি জাতীয় পরিচয়ের।

এই দায়িত্ব নেন স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম নেতা ম্যানুয়েল বেলগ্রানো। ১৮১২ সালে তিনি প্রথম নীল-সাদা পতাকা তৈরি করেন, যা পরবর্তীতে আর্জেন্টিনার জাতীয় পতকা হিসেবে স্বীকৃতি পায়।

রোসারিও শহরের পারানা নদীর তীরে প্রথমবারের মতো এই পতাকা উত্তোলন করা হয়েছিল। কাকতালীয়ভাবে এই রোসারিও শহরই পরবর্তীতে জন্ম দেয় ফুটবল ইতিহাসের আরেক মহাতারকা লিওনেল মেসিকে।

ইতিহাসবিদদের মধ্যে এ নিয়ে একাধিক মত রয়েছে।

সবচেয়ে প্রচলিত ব্যাখ্যা হলো—

  • নীল রঙ মুক্ত আকাশের প্রতীক।
  • সাদা রঙ মেঘের প্রতীক।
  • আরেকটি মত অনুযায়ী, মাতা মেরির নীল-সাদা পোশাক থেকেই অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন বেলগ্রানো।
  • কেউ কেউ মনে করেন, ব্রিটিশ বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করা স্থানীয় সেনাদের প্রতীকী রঙও এর পেছনে ভূমিকা রেখেছিল।

১৮১৮ সালে পতাকার মাঝখানে যুক্ত হয় ৩২টি রশ্মিযুক্ত সূর্যের প্রতীক। এটি ইনকা সভ্যতার সূর্যদেবের প্রতীক হিসেবে পরিচিত। এরপর থেকেই নীল-সাদা-সূর্য মিলিয়ে গড়ে ওঠে আধুনিক আর্জেন্টিনার জাতীয় পরিচয়।

আজকের পরিচিত স্ট্রাইপযুক্ত জার্সি কিন্তু শুরু থেকেই ছিল না।

উনিশ শতকের শেষ দিকে ব্রিটিশদের মাধ্যমে আর্জেন্টিনায় ফুটবলের প্রসার ঘটে। জাতীয় দল গঠনের পর ১৯০১ সালে উরুগুয়ের বিপক্ষে প্রথম আন্তর্জাতিক ম্যাচে তারা সম্পূর্ণ আকাশি রঙের জার্সি পরে মাঠে নামে।

কিন্তু এই রঙ অনেকটাই উরুগুয়ের জার্সির সঙ্গে মিল থাকায় পরে নতুন পরিচয়ের প্রয়োজন দেখা দেয়।

১৯০৮ সালে ব্রাজিলের সাও পাওলো সফরে প্রথমবারের মতো নীল-সাদা ডোরাকাটা জার্সি পরে মাঠে নামে আর্জেন্টিনা। সেখান থেকেই শুরু হয় ইতিহাসের অন্যতম পরিচিত ফুটবল জার্সির যাত্রা।

আর্জেন্টিনার দ্বিতীয় পরিচিত জার্সি হলো গাঢ় নীল অ্যাওয়ে কিট। এই জার্সির সঙ্গেও জড়িয়ে আছে বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে স্মরণীয় অধ্যায়।

১৯৮৬ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপে প্রচণ্ড গরমের কথা মাথায় রেখে হোম জার্সি বিশেষভাবে তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু অ্যাওয়ে জার্সির দিকে খুব বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়নি।

কোয়ার্টার ফাইনালে খারাপ আবহাওয়ায় ব্যবহৃত জার্সি ভারী হয়ে যাওয়ায় সেমিফাইনালের আগে দেখা দেয় বড় সমস্যা। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে একই জার্সি পরে খেললে ফুটবলারদের জন্য অসুবিধা হতে পারত।

নতুন জার্সি তৈরির জন্য প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তারা অল্প সময়ের মধ্যে নতুন কিট সরবরাহ করতে অস্বীকৃতি জানায়।

এরপর দলের দুই কর্মকর্তা স্থানীয় বাজারে গিয়ে সাধারণ দুটি নীল রঙের জার্সি কিনে আনেন। সেখানে কোনো লোগো, নম্বর বা জাতীয় পরিচয়ের চিহ্ন ছিল না।

প্রথমে কোচ কার্লোস বিলার্দো সন্তুষ্ট হতে পারেননি। ঠিক তখনই সিদ্ধান্ত নেন দিয়েগো মারাদোনা।

তিনি দুটি জার্সির মধ্যে একটি হাতে তুলে নিয়ে বলেন,

“এই জার্সিটাই সবচেয়ে সুন্দর। আমরা এটিই পরে ইংল্যান্ডকে হারাব।”

এরপর দ্রুত ৩৮টি জার্সি সংগ্রহ করা হয়। প্রতিটিতে হাতে সেলাই করে আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের প্রতীক লাগানো হয়। পরে বিশেষভাবে নম্বরও বসানো হয়।

১৯৮৬ সালের ২২ জুন মেক্সিকো সিটির ঐতিহাসিক সেই ম্যাচে জন্ম নেয় ফুটবল ইতিহাসের দুটি সবচেয়ে আলোচিত মুহূর্ত।

প্রথমটি ছিল বিতর্কিত ‘হ্যান্ড অব গড’ গোল।

আর দ্বিতীয়টি ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা গোল। নিজের অর্ধ থেকে বল নিয়ে ছয়জন ইংলিশ ফুটবলারকে কাটিয়ে অসাধারণ গোল করেন মারাদোনা।

সেই ম্যাচে আর্জেন্টিনা জয় পায়। এরপর পুরো বিশ্বকাপও জিতে নেয় তারা। ফলে বাজার থেকে কেনা সেই সাধারণ নীল জার্সি রাতারাতি কিংবদন্তিতে পরিণত হয়।

মারাদোনার পর দীর্ঘ ৩৬ বছর বিশ্বকাপ জিততে পারেনি আর্জেন্টিনা। ১৯৯০ ও ২০১৪ সালের ফাইনালে হারের যন্ত্রণা আরও গভীর করে সমর্থকদের অপেক্ষা।

অবশেষে ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে সেই অপেক্ষার অবসান ঘটে। লিওনেল মেসির নেতৃত্বে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয় আর্জেন্টিনা। নীল-সাদা জার্সি আবারও ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে আলোচিত প্রতীকে পরিণত হয়।

মেসির হাতে বিশ্বকাপ ট্রফি ওঠার সেই ছবি এখন শুধু একটি ক্রীড়া মুহূর্ত নয়, বরং আর্জেন্টিনার শতাব্দীজুড়ে চলা ইতিহাস, সংগ্রাম ও স্বপ্নপূরণের প্রতীক।

আর্জেন্টিনার নীল-সাদা জার্সি শুধুমাত্র একটি ক্রীড়া পোশাক নয়। এর প্রতিটি রঙের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ধর্মীয় বিশ্বাস, স্বাধীনতার সংগ্রাম, জাতীয় পতাকার জন্ম, কিংবদন্তি ফুটবলারদের সাফল্য এবং কোটি সমর্থকের আবেগ।

একদিকে যেমন এটি মাতা মেরির পবিত্রতার প্রতীক হিসেবে পরিচিত, অন্যদিকে স্বাধীনতার লড়াইয়ের স্মারক। আবার ফুটবল ইতিহাসে মারাদোনা ও মেসির বিশ্বজয়ের সাক্ষী হিসেবেও এই জার্সির মর্যাদা অনন্য।

আর্জেন্টিনার নীল-সাদা জার্সির গল্প কেবল ফুটবলের ইতিহাস নয়, এটি একটি জাতির পরিচয়ের গল্প। ধর্মীয় ঐতিহ্য, স্বাধীনতার আন্দোলন, জাতীয় পতাকার বিবর্তন এবং বিশ্বকাপের অবিস্মরণীয় মুহূর্ত—সবকিছু মিলিয়েই গড়ে উঠেছে এই আইকনিক জার্সির উত্তরাধিকার। তাই যখনই মেসি, মারাদোনা কিংবা আর্জেন্টিনার কোনো ফুটবলার এই জার্সি পরে মাঠে নামেন, তখন তারা শুধু একটি দলের প্রতিনিধিত্ব করেন না; বহন করেন শতাব্দীজুড়ে গড়ে ওঠা ইতিহাস, গৌরব ও আবেগের এক অনন্য প্রতীক।