বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে পর্তুগালের কাছে হারার পর টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নিয়েছে ক্রোয়েশিয়া। তবে ম্যাচের ফলের চেয়েও বেশি আলোচনায় উঠে এসেছে রেফারির একাধিক সিদ্ধান্ত এবং VAR প্রযুক্তির ব্যবহার। বিতর্কিত পেনাল্টি, একাধিক গোল বাতিল এবং অফসাইডের সূক্ষ্ম সিদ্ধান্ত ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে ফুটবল বিশ্লেষকদের মধ্যেও তীব্র বিতর্ক চলছে। ম্যাচ শেষে এসব বিষয় নিয়ে প্রকাশ্যে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন ক্রোয়েশিয়ার অধিনায়ক লুকা মদ্রিচ।
পর্তুগালের বিপক্ষে ৩২তম রাউন্ডের গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে হারার পর বিশ্বকাপ অভিযান শেষ হয় ক্রোয়েশিয়ার। ম্যাচে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে রেফারির সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। বিশেষ করে শেষদিকে ক্রোয়েশিয়ার একটি গোল অফসাইডের কারণে বাতিল হওয়া এবং পর্তুগালের পক্ষে দেওয়া পেনাল্টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়।
অনেক ফুটবলপ্রেমীর দাবি, ম্যাচে রেফারিং আরও ভারসাম্যপূর্ণ হতে পারত। আবার কেউ কেউ মনে করছেন, VAR-এর অতিরিক্ত ব্যবহার খেলাটির স্বাভাবিক গতি ও আবেগকে ব্যাহত করছে।
ম্যাচ শেষে সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে নিজের হতাশা লুকাননি লুকা মদ্রিচ। বিশেষ করে ভ্লাসিচের ঘটনাকে কেন্দ্র করে দেওয়া পেনাল্টি নিয়ে তিনি প্রশ্ন তোলেন।
মদ্রিচ বলেন,
“এমন গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে এত সহজে পেনাল্টি দেওয়া উচিত নয়। প্রযুক্তি তখনই ব্যবহার করা প্রয়োজন, যখন ভুলের বিষয়ে সম্পূর্ণ নিশ্চিত হওয়া যায়। এমন সিদ্ধান্ত তরুণ ফুটবলারদের আত্মবিশ্বাসেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। শেষ পর্যন্ত পুরো দলকেই তার মূল্য দিতে হয়।”
তার এই মন্তব্যের পর ফুটবল বিশ্বে আবারও VAR-এর কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে।
শুধু অধিনায়কই নন, ক্রোয়েশিয়ার প্রধান কোচ জ্লাতকো দালিচও রেফারিং নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন।
দালিচ বলেন, দল আরও কয়েকটি ফ্রি-কিক পাওয়ার দাবি রাখত। তবে তিনি পরাজয়ের দায় পুরোপুরি রেফারির ওপর চাপাতে চাননি।
তার ভাষায়,
“আমরা আরও কিছু ফ্রি-কিক পাওয়ার যোগ্য ছিলাম। তবে অজুহাত দিতে চাই না। কারণ সুযোগগুলো কাজে লাগাতে পারলে ম্যাচটি নির্ধারিত সময়েই আমরা জিতে যেতে পারতাম।”
এই মন্তব্যে স্পষ্ট, কোচ রেফারির সিদ্ধান্তে অসন্তুষ্ট হলেও দলের পারফরম্যান্সকেও সমানভাবে মূল্যায়ন করেছেন।
অন্যদিকে পর্তুগালের প্রধান কোচ রবার্তো মার্টিনেজ পুরোপুরি সমর্থন জানিয়েছেন VAR এবং ম্যাচ কর্মকর্তাদের সিদ্ধান্তকে।
তিনি বলেন,
“প্রযুক্তি পরিষ্কারভাবে অফসাইড দেখিয়েছে। সেখানে ভুলের কোনো সুযোগ ছিল না। পেনাল্টির সিদ্ধান্তও যথার্থ ছিল।”
মার্টিনেজের মতে, আধুনিক প্রযুক্তির উদ্দেশ্যই হলো মানবিক ভুল কমানো এবং সঠিক সিদ্ধান্ত নিশ্চিত করা।
সবচেয়ে বেশি বিতর্ক তৈরি হয়েছে ক্রোয়েশিয়ার বাতিল হওয়া গোলটি নিয়ে।
ঘটনার শুরু ইভান পেরিসিচের একটি ক্রস থেকে। তিনি বলটি বক্সের দিকে পাঠানোর সময় কোনো ক্রোয়েশিয়ান ফুটবলার অফসাইড অবস্থানে ছিলেন না। কিন্তু মাঝপথে সতীর্থ মাটানোভিচ বলটিতে মাথা ছোঁয়ান।
ঠিক সেই মুহূর্তেই পাসালিচ অফসাইড অবস্থানে চলে যান। ফলে মাটানোভিচের হেড থেকে বল পেয়ে গোল করায় সেটি অফসাইড হিসেবে গণ্য হয় এবং VAR-এর সহায়তায় গোল বাতিল করা হয়।
ফুটবলের বর্তমান অফসাইড আইন অনুযায়ী, বলের দিক পরিবর্তনকারী সতীর্থের স্পর্শই নতুন পাস হিসেবে বিবেচিত হয়। তাই সিদ্ধান্তটি নিয়ম মেনেই নেওয়া হয়েছে।
বর্তমান বিশ্বকাপে ব্যবহৃত আধুনিক প্রযুক্তির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো বলের ভেতরে থাকা বিশেষ সেন্সর বা চিপ। এই প্রযুক্তি বল স্পর্শের সঠিক সময় রেকর্ড করে।
সেই তথ্য এবং সেমি-অটোমেটেড অফসাইড প্রযুক্তির বিশ্লেষণে নিশ্চিত হওয়া যায় যে পাসালিচ অফসাইড অবস্থানেই ছিলেন। ফলে গোল বাতিলের সিদ্ধান্ত ছিল প্রযুক্তিগতভাবে সঠিক।
অর্থাৎ আবেগের জায়গা থেকে বিতর্ক থাকলেও ফুটবলের প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী ক্রোয়েশিয়ার সঙ্গে কোনো অন্যায় হয়নি।
এই ম্যাচটি আরেকটি কারণেও ইতিহাসে জায়গা করে নিয়েছে।
বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে প্রথমবারের মতো এক ম্যাচে চারটি গোল বাতিল হয়েছে। প্রতিটি ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে VAR প্রযুক্তি।
বাতিল হওয়া গোলগুলোর মধ্যে একটি ছিল ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোরও। ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারির পর্যালোচনার পর সেই গোলটিও অফসাইডের কারণে বাতিল করা হয়।
এটি প্রমাণ করে যে প্রযুক্তি দুই দলের ক্ষেত্রেই একই নিয়মে প্রয়োগ করা হয়েছে।
VAR চালুর মূল উদ্দেশ্য ছিল স্পষ্ট ভুল সংশোধন করা। তবে সাম্প্রতিক সময়ে অনেকেই অভিযোগ করছেন, অতিরিক্ত হস্তক্ষেপের কারণে ম্যাচের স্বাভাবিক গতি, আবেগ এবং উদযাপনের মুহূর্ত নষ্ট হচ্ছে।
একদিকে প্রযুক্তি নির্ভুল সিদ্ধান্ত নিশ্চিত করছে, অন্যদিকে প্রতিটি গোলের পর দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হওয়ায় দর্শকদের উত্তেজনাও কমে যাচ্ছে।
ফলে ফুটবলবিশ্বে এখন বড় প্রশ্ন—VAR কি শুধুই ন্যায়বিচার নিশ্চিত করছে, নাকি খেলাটির স্বতঃস্ফূর্ত আনন্দও ধীরে ধীরে কমিয়ে দিচ্ছে?
ক্রোয়েশিয়ার বিদায়ের পর রেফারিং এবং VAR নিয়ে বিতর্ক নতুন মাত্রা পেয়েছে। লুকা মদ্রিচ ও জ্লাতকো দালিচ সিদ্ধান্তগুলোর সমালোচনা করলেও প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণ বলছে, অফসাইডের সিদ্ধান্ত ছিল নিয়মসঙ্গত। একই সঙ্গে পর্তুগালের পক্ষেও VAR একইভাবে প্রয়োগ হয়েছে, যার ফলে ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোর একটি গোলও বাতিল করা হয়।
ফুটবলে প্রযুক্তির ব্যবহার ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে, তবে VAR-এর সীমা কোথায় হওয়া উচিত—সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই এখন ব্যস্ত ফুটবলবিশ্ব।

