নিজস্ব প্রতিবেদক, নিউজ বাংলা : মানববর্জ্য, পয়ঃশোধনাগারের বর্জ্য, রান্নাঘরের উচ্ছিষ্ট এবং কৃষিজ অবশিষ্টাংশ থেকে জ্বালানি তেল উৎপাদনের উদ্ভাবনী প্রকল্প বাস্তবায়নে সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) গবেষকদের উদ্ভাবিত এ প্রযুক্তি সফলভাবে বাণিজ্যিক পর্যায়ে নেওয়া সম্ভব হলে দেশের জ্বালানি আমদানিনির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি বর্জ্য ব্যবস্থাপনায়ও নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
শনিবার রাজধানীর তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে বর্জ্য থেকে জ্বালানি তেল উৎপাদনের এ প্রকল্পের প্রদর্শনী পরিদর্শন করেন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় গবেষকেরা তাঁদের উদ্ভাবিত প্রযুক্তি, দীর্ঘদিনের গবেষণার অগ্রগতি এবং দেশে বাণিজ্যিকভাবে জ্বালানি তেল উৎপাদনের সম্ভাবনা তুলে ধরেন।
প্রধানমন্ত্রীর উপপ্রেস সচিব মো. সুজাউদ্দৌলা (সুজন মাহমুদ) এ তথ্য জানান। প্রকল্পটির সম্ভাবনা বিবেচনায় নিয়ে এর বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দেন প্রধানমন্ত্রী।
প্রকল্পটির গবেষক ও খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) অধ্যাপক ড. মো. খালেকুজ্জামান প্রধানমন্ত্রীকে উদ্ভাবিত প্রযুক্তির বিভিন্ন দিক সম্পর্কে বিস্তারিত জানান। তিনি ব্যাখ্যা করেন, মানববর্জ্য, পয়ঃশোধনাগারের বর্জ্য, রান্নাঘরের উচ্ছিষ্ট এবং কৃষিজ অবশিষ্টাংশ প্রক্রিয়াজাত করে কীভাবে জৈব অপরিশোধিত তেল বা বায়োক্রুড উৎপাদন করা সম্ভব।
গবেষকেরা প্রায় ১০ বছর ধরে এ প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণা করছেন। তাঁদের গবেষণায় ব্যবহার করা হচ্ছে ‘হাইড্রোথার্মাল লিকুইফ্যাকশন’ বা এইচটিএল প্রযুক্তি। এ পদ্ধতিতে উচ্চ তাপমাত্রা ও চাপের পরিবেশে ভেজা জৈব বর্জ্যকে প্রক্রিয়াজাত করে জৈব অপরিশোধিত তেল বা বায়োক্রুড উৎপাদন করা হয়।
সাধারণত বিভিন্ন ধরনের জৈব বর্জ্য পরিবেশের জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করে। এসব বর্জ্য সঠিকভাবে সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াজাত না করলে পানি, মাটি ও আশপাশের পরিবেশ দূষিত হতে পারে। গবেষকদের এই উদ্যোগ বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তরের একটি সম্ভাবনাময় পথ তৈরি করেছে।
প্রকল্পটি সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করতে পারলে একদিকে বর্জ্যের ব্যবহার বাড়বে, অন্যদিকে দেশের উৎস থেকে জ্বালানি তেল উৎপাদনের সুযোগ তৈরি হবে।
গবেষকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দীর্ঘদিনের গবেষণায় বর্জ্য থেকে বায়োক্রুড উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি এসেছে। গবেষণাগারের পরীক্ষায় ৫০ থেকে ৫৫ শতাংশ পর্যন্ত বায়োক্রুড উৎপাদনের ফল পাওয়া গেছে। পাশাপাশি ডিজেলসমৃদ্ধ বায়োক্রুড উৎপাদনেও সাফল্য পাওয়ার কথা জানিয়েছেন তাঁরা।
তবে গবেষণাগারে পাওয়া ফলাফল এবং বৃহৎ পরিসরে বাণিজ্যিক উৎপাদনের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। শিল্প পর্যায়ে প্রযুক্তিটি কতটা কার্যকর হবে, উৎপাদনের খরচ কত পড়বে এবং উৎপাদিত তেলের গুণগত মান কেমন থাকবে, তা আরও পরীক্ষা করে দেখতে হবে।
এ কারণে গবেষকেরা পরবর্তী ধাপে একটি পাইলট প্ল্যান্ট স্থাপনের পরিকল্পনা করেছেন। এ প্ল্যান্টের মাধ্যমে বাস্তব পরিস্থিতিতে প্রযুক্তিটির কার্যকারিতা যাচাই করা হবে। একই সঙ্গে বর্জ্য সংগ্রহ, প্রক্রিয়াজাতকরণ, উৎপাদন ব্যয় এবং উৎপাদিত তেলের ব্যবহারযোগ্যতা সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে।
প্রকল্পের পরবর্তী ধাপে প্রতিদিন ১ থেকে ৩ টন বর্জ্য প্রক্রিয়াজাত করতে সক্ষম একটি পাইলট প্ল্যান্ট স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, এ পর্যায়ের প্রকল্প বাস্তবায়নে আনুমানিক ১০০ থেকে ১২০ কোটি টাকা প্রয়োজন হবে।
পাইলট প্ল্যান্ট স্থাপন করা হলে গবেষণাগারে উদ্ভাবিত প্রযুক্তির কার্যকারিতা বাস্তব উৎপাদন পর্যায়ে যাচাই করা যাবে। এর মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের বর্জ্য থেকে কী পরিমাণ জ্বালানি তেল উৎপাদন সম্ভব, যন্ত্রপাতি কতটা দক্ষতার সঙ্গে কাজ করে এবং পুরো প্রক্রিয়ায় কী পরিমাণ ব্যয় হয়, তা নির্ধারণ করা সহজ হবে।
পাশাপাশি উৎপাদিত তেলের গুণগত মান ও বাণিজ্যিক ব্যবহারের উপযোগিতাও যাচাই করা যাবে। এসব পরীক্ষার ফলের ভিত্তিতে প্রযুক্তিটির ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণ এবং বাণিজ্যিক উৎপাদনের সম্ভাবনা সম্পর্কে বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হবে।
বাণিজ্যিক উৎপাদনের আগে এসব বিষয় যাচাই করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, কোনো প্রযুক্তি গবেষণাগারে সফল হলেও শিল্প পর্যায়ে তা লাভজনকভাবে পরিচালনা করা সব সময় সহজ হয় না।
এ ক্ষেত্রে সরকারের আর্থিক ও নীতিগত সহযোগিতা প্রকল্পটির অগ্রগতিতে ভূমিকা রাখতে পারে। প্রধানমন্ত্রীর আশ্বাসের ফলে গবেষণাটিকে পরবর্তী পর্যায়ে নেওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তবে প্রকল্পের বাস্তবায়ন, অর্থায়ন এবং পাইলট প্ল্যান্ট স্থাপনের সময়সূচি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সামনে আসা প্রয়োজন।
গবেষকদের প্রত্যাশা, প্রযুক্তিটি বাণিজ্যিকভাবে সম্প্রসারণ করা সম্ভব হলে ভবিষ্যতে আমদানিকৃত অপরিশোধিত তেলের প্রায় ১০ থেকে ১৫ শতাংশের বিকল্প হিসেবে বর্জ্য থেকে উৎপাদিত তেল ব্যবহার করা যেতে পারে।
এ লক্ষ্য অর্জন করা গেলে বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসতে পারে। বর্তমানে দেশের জ্বালানি চাহিদার একটি বড় অংশ আমদানির মাধ্যমে পূরণ করতে হয়। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বাড়লে আমদানি ব্যয়ও বেড়ে যায়। এতে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ তৈরি হয়।
গবেষকদের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, প্রযুক্তিটি সফলভাবে বাণিজ্যিক পর্যায়ে নেওয়া গেলে বছরে আনুমানিক ৬ হাজার ৫০০ কোটি থেকে ১৩ হাজার কোটি টাকা সমমূল্যের বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে এই হিসাব এখনো সম্ভাবনার পর্যায়ে রয়েছে। বাস্তবে কতটা তেল উৎপাদন করা সম্ভব হবে, উৎপাদিত তেল প্রচলিত জ্বালানির বিকল্প হিসেবে কতটা ব্যবহার করা যাবে এবং পুরো প্রক্রিয়ার ব্যয় কত হবে, তার ওপর সাশ্রয়ের পরিমাণ নির্ভর করবে।
বৃহৎ পরিসরে প্রযুক্তিটির কার্যকারিতা ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা যাচাই না করে সম্ভাব্য সাশ্রয়কে নিশ্চিত ফল হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই।
বর্জ্য থেকে জ্বালানি তেল উৎপাদনের প্রযুক্তি সফল হলে দেশের জ্বালানি খাতে বিকল্প উৎস তৈরির সুযোগ বাড়তে পারে। বিশেষ করে কৃষিপ্রধান বাংলাদেশে কৃষিজ অবশিষ্টাংশের ব্যবহার বাড়িয়ে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও জ্বালানি উৎপাদনকে একই উদ্যোগের আওতায় আনা সম্ভব হতে পারে।
ধানের খড়, ফসলের অবশিষ্টাংশ ও বিভিন্ন ধরনের জৈব বর্জ্য সঠিক পদ্ধতিতে ব্যবহার করা গেলে সেগুলো থেকেও অর্থনৈতিকভাবে মূল্যবান পণ্য উৎপাদন সম্ভব। তবে সব ধরনের বর্জ্য একই প্রক্রিয়ায় ব্যবহার করা যায় না। বর্জ্যের ধরন, আর্দ্রতা, সংগ্রহ ও পরিবহনের ব্যবস্থা এবং প্রক্রিয়াজাতকরণের ব্যয়—এসব বিষয়ের ওপর উৎপাদনের পরিমাণ ও কার্যকারিতা নির্ভর করবে।
এ ছাড়া উৎপাদিত বায়োক্রুডকে সরাসরি প্রচলিত জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা যাবে কি না, নাকি আরও পরিশোধন করতে হবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বাণিজ্যিক উৎপাদনের আগে এ বিষয়ে প্রযুক্তিগত পরীক্ষা প্রয়োজন।
তারপরও গবেষণাটি সফল হলে দেশে জ্বালানি উৎপাদনের নতুন ক্ষেত্র তৈরি হতে পারে। এতে আমদানির ওপর চাপ কমানোর পাশাপাশি দেশীয় প্রযুক্তি ও গবেষণার বিকাশের সুযোগ বাড়বে।
জ্বালানি উৎপাদনের পাশাপাশি বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রেও প্রকল্পটি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। শহরাঞ্চলে রান্নাঘরের বর্জ্য, পয়ঃশোধনাগারের অবশিষ্টাংশ এবং অন্যান্য জৈব বর্জ্য ব্যবস্থাপনা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এসব বর্জ্য যথাযথভাবে প্রক্রিয়াজাত করা গেলে পরিবেশের ওপর চাপ কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
কৃষিজ অবশিষ্টাংশ সঠিকভাবে কাজে লাগানো গেলে বর্জ্যকে কেন্দ্র করে নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। সাধারণত যেসব উপাদান ফেলে দেওয়া হয়, সেগুলো আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে প্রক্রিয়াজাত করে মূল্যবান সম্পদে রূপান্তর করা সম্ভব। এতে বর্জ্যের অপচয় কমার পাশাপাশি নতুন পণ্য উৎপাদন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগও বাড়তে পারে।
তবে পরিবেশগত সুফল নিশ্চিত করতে পুরো উৎপাদনপ্রক্রিয়ার প্রভাব মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। বর্জ্য সংগ্রহ থেকে শুরু করে তেল উৎপাদন, পরিশোধন এবং অবশিষ্ট উপাদান ব্যবস্থাপনা প্রতিটি ধাপে পরিবেশগত নিরাপত্তা বজায় রাখতে হবে।
শনিবার তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে আয়োজিত প্রদর্শনীতে গবেষকেরা তাঁদের প্রযুক্তি ও গবেষণার অগ্রগতি তুলে ধরেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রকল্পটি সরেজমিনে পরিদর্শন করেন এবং এর কার্যক্রম ও বাস্তবায়ন পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চান।
এ সময় বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) পাবলিক ম্যানেজমেন্ট বিভাগের সদস্য অধ্যাপক আব্দুল্লাহ আল মামুন, কুয়েটের উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ মাছুদ এবং বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের(বিপিসি) চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন।
গবেষকদের উদ্ভাবিত প্রযুক্তির সম্ভাবনা বিবেচনায় নিয়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় সহযোগিতার আশ্বাস দেন প্রধানমন্ত্রী।
গবেষকেরা মনে করছেন, প্রয়োজনীয় সরকারি সহায়তা পেলে প্রযুক্তিটিকে বাণিজ্যিক পর্যায়েনিয়ে যাওয়া সম্ভব। এর মাধ্যমে একদিকে যেমন বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উন্নতি হবে, অন্যদিকে দেশে বিকল্প জ্বালানির উৎপাদন বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।



