নিজস্ব প্রতিবেদক. নিউজবাংলা : দেশে ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রল ও অকটেনের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা করে বাড়ানো হয়েছে। নতুন এই দাম আগামীকাল সোমবার ২১ সেপ্টেম্বর থেকে কার্যকর হবে। রোববার ২০ সেপ্টেম্বর জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ এ বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে।
নতুন মূল্য অনুযায়ী, এখন থেকে প্রতি লিটার ডিজেল ১৩৫ টাকা, কেরোসিন ১৫৫ টাকা, পেট্রল ১৬০ টাকা এবং অকটেন ১৬৫ টাকায় বিক্রি হবে। এর আগে ডিজেলের দাম ছিল ১১৫ টাকা, কেরোসিন ১৩৫ টাকা, পেট্রল ১৪০ টাকা এবং অকটেন ১৪৫ টাকা।
অর্থাৎ একসঙ্গে চার ধরনের জ্বালানি তেলের দামই ২০ টাকা করে বাড়ানো হয়েছে। এতে ব্যক্তিগত গাড়ি, মোটরসাইকেল, গণপরিবহন ও পণ্য পরিবহনের ব্যয় বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। জ্বালানি তেলের দামের পরিবর্তনের প্রভাব দেশের পরিবহন ও পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থাতেও পড়তে পারে।
নতুন মূল্য কার্যকর হওয়ার পর জ্বালানি তেলের দাম দাঁড়াবে এভাবে—
জ্বালানির নাম আগের দাম নতুন দাম বৃদ্ধি
ডিজেল ১১৫ টাকা ১৩৫ টাকা ২০ টাকা
কেরোসিন ১৩৫ টাকা ১৫৫ টাকা ২০ টাকা
পেট্রল ১৪০ টাকা ১৬০ টাকা ২০ টাকা
অকটেন ১৪৫ টাকা ১৬৫ টাকা ২০ টাকা
এর ফলে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত ডিজেলের দামও ১৩৫ টাকায় উঠেছে। দেশের পরিবহন খাতে ডিজেলের ব্যবহার ব্যাপক হওয়ায় এই মূল্যবৃদ্ধি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হচ্ছে।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের প্রজ্ঞাপনে আন্তর্জাতিক বাজারের পরিস্থিতিকে দাম বাড়ানোর অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের কারণে মার্চ থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম এবং ফ্রেইট চার্জ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম দ্বিগুণের বেশি বাড়লেও জনস্বার্থ বিবেচনায় দেশে সেই হারে দাম সমন্বয় করা হয়নি।
এর ফলে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন বা বিপিসিকে বড় অঙ্কের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হয়েছে। প্রজ্ঞাপনের তথ্য অনুযায়ী, মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত সময়ে বিপিসির লোকসান হয়েছে প্রায় ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি ৬৬ লাখ টাকা।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারের বাড়তি দামের পুরো চাপ এতদিন দেশের বাজারে দেওয়া হয়নি। ফলে বিপিসির ওপর লোকসানের চাপ জমেছে। নতুন মূল্য সমন্বয়ের মাধ্যমে সেই চাপ কিছুটা কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
প্রজ্ঞাপনে দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, বর্তমান আন্তর্জাতিক বাজারদর বিবেচনায় ডিজেলে প্রতি লিটারে বিপিসির লোকসান প্রায় ৮৯ টাকা।
এই হিসাবে ডিজেল বিক্রি করে প্রতিদিন বিপিসির লোকসান হচ্ছে প্রায় ১০৯ কোটি টাকা। দীর্ঘ সময় ধরে আন্তর্জাতিক বাজারের তুলনায় কম দামে ডিজেল বিক্রি করলে এই লোকসানের পরিমাণ আরও বাড়তে পারে।
প্রজ্ঞাপনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে শুধু ডিজেল বিক্রিতেই বছরে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত লোকসান হতে পারে।
এই বিপুল লোকসান কমানোর লক্ষ্যেই প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ২০ টাকা বাড়ানো হয়েছে। প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, এই মূল্য সমন্বয়ের ফলে বছরে বিপিসির লোকসান প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা কমানো সম্ভব হতে পারে।
এবারের মূল্যবৃদ্ধির আগে চলতি বছর কয়েক দফায় জ্বালানি তেলের দাম পরিবর্তন করা হয়েছে।
এর আগে ১৯ এপ্রিল থেকে ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ১৫ টাকা বাড়িয়ে ১১৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়। একই সময়ে কেরোসিনের দাম ১৮ টাকা, পেট্রলের দাম ১৯ টাকা এবং অকটেনের দাম ২০ টাকা বাড়ানো হয়েছিল।
এরপর জুন মাসে কেরোসিন, পেট্রল ও অকটেনের দাম আরও ৫ টাকা করে বাড়ানো হয়। তবে জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বরের ২০ তারিখ পর্যন্ত জ্বালানি তেলের দাম অপরিবর্তিত ছিল। এবার আবার চার ধরনের জ্বালানি তেলের দাম একই হারে বাড়ানো হলো।
জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি সরাসরি শুধু তেল ব্যবহারকারীদের ওপরই প্রভাব ফেলে না। পরিবহন খাতের মাধ্যমে এর প্রভাব বিভিন্ন পণ্য ও সেবার ওপরও পড়তে পারে।
বিশেষ করে ডিজেলনির্ভর বাস, ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান, নৌযান ও বিভিন্ন বাণিজ্যিক পরিবহনের পরিচালন ব্যয় বাড়তে পারে। পরিবহন ব্যয় বাড়লে কৃষিপণ্য, খাদ্যপণ্য ও অন্যান্য পণ্য এক স্থান থেকে অন্য স্থানে নেওয়ার খরচও বাড়তে পারে।
একজন সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রেও এর প্রভাব বিভিন্নভাবে দেখা দিতে পারে। ব্যক্তিগত গাড়ি বা মোটরসাইকেল ব্যবহারকারীদের মাসিক জ্বালানি ব্যয় বাড়বে। অন্যদিকে গণপরিবহন ও পণ্য পরিবহনের খরচ বাড়লে বাজারদরেও এর প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা থাকে।
তবে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর পরিবহন ভাড়া বা পণ্যের দাম ঠিক কতটা বাড়বে, তা সংশ্লিষ্ট খাতের সিদ্ধান্ত ও বাজার পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করবে।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন দেশের জ্বালানি তেল আমদানি ও বিপণনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেড়ে গেলে দেশে তুলনামূলক কম দামে জ্বালানি বিক্রি করলে বিপিসিকে লোকসান গুনতে হয়।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে আন্তর্জাতিক বাজারের বাড়তি দাম এবং ফ্রেইট চার্জের কারণে সেই চাপ আরও বেড়েছে বলে প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়েছে।
নতুন দাম নির্ধারণের মাধ্যমে সরকার একদিকে আন্তর্জাতিক বাজারের দামের সঙ্গে দেশের বাজারের ব্যবধান কমাতে চাইছে, অন্যদিকে বিপিসির লোকসানও কমানোর চেষ্টা করছে।
তবে এই মূল্য সমন্বয়ের ফলে সাধারণ ভোক্তাদের জ্বালানি ব্যয় বাড়বে। বিশেষ করে ডিজেলের দাম বৃদ্ধির কারণে পরিবহন খাতে এর প্রভাব কতটা পড়ে, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।
রোববার ২০ সেপ্টেম্বর জারি করা প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, নতুন দাম সোমবার ২১ সেপ্টেম্বর থেকে কার্যকর হবে।
নতুন দরে প্রতি লিটার ডিজেল ১৩৫ টাকা, কেরোসিন ১৫৫ টাকা, পেট্রল ১৬০ টাকা এবং অকটেন ১৬৫ টাকায় বিক্রি হবে।


