খবর পান সবার আগে

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। আমাদের নিউজলেটারে সাবস্ক্রাইব করুন এবং দেশ-বিদেশের গুরুত্বপূর্ণ সংবাদগুলো প্রতিদিন আপনার ইমেইলে পান।

― Advertisement ―

spot_imgspot_img

যৌন হয়রানি ঠেকাতে আসছে নতুন আইন ২০২৬

কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি বন্ধ এবং নারীসহ সব নাগরিকের জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে নতুন একটি আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। প্রস্তাবিত ‘কর্মক্ষেত্র...
Homeবাংলা নিউজ স্পেশালদেশজুড়েচট্টগ্রামে ডেঙ্গুর ভয়াবহ বিস্তার, ৮ এলাকা হটস্পট ঘোষণা!

চট্টগ্রামে ডেঙ্গুর ভয়াবহ বিস্তার, ৮ এলাকা হটস্পট ঘোষণা!

নগরবাসী নিজেরা সচেতন না হলে শুধু সিটি করপোরেশনের পক্ষে ডেঙ্গু পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়।

চট্টগ্রাম নগরীতে আবারও ভয়ংকরভাবে মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে ডেঙ্গু। বর্ষা মৌসুম শুরুর আগেই স্বাস্থ্য বিভাগের সাম্প্রতিক জরিপে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক তথ্য। নগরীর বিভিন্ন এলাকায় এডিস মশার লার্ভার ব্যাপক উপস্থিতি মিলেছে, যা ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলছে কয়েকগুণ।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।

চট্টগ্রাম বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের কার্যালয়ের উদ্যোগে পরিচালিত এক জরিপে দেখা গেছে, নগরীর ৪১টি ওয়ার্ডের মধ্যে ১৮টি ওয়ার্ডে পরীক্ষা চালিয়ে প্রায় ২৭ শতাংশ বাড়িতে এডিস মশার লার্ভা পাওয়া গেছে। অর্থাৎ প্রতি চারটি বাড়ির মধ্যে অন্তত একটি বাড়ি ডেঙ্গুর ঝুঁকিতে রয়েছে।

জরিপে মোট ৩৭০টি বাড়ি পরিদর্শন করা হয়। এর মধ্যে ৯৯টি বাড়িতে সরাসরি এডিস মশার লার্ভা শনাক্ত হয়। পাশাপাশি ১১৪টি পজিটিভ কনটেইনারও পাওয়া গেছে, যেখানে মশার বংশবিস্তার হচ্ছিল।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, চট্টগ্রাম নগরীর প্রতিটি ওয়ার্ডেই এডিস মশার লার্ভার অস্তিত্ব পাওয়া গেছে।

তবে স্বাস্থ্য বিভাগের জরিপে আটটি ওয়ার্ডকে ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার ‘হটস্পট’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব এলাকায় সংক্রমণের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি।

চিহ্নিত ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো হলো:

উত্তর কাট্টলী (ওয়ার্ড-১০)
পাহাড়তলী (ওয়ার্ড-৩)
আলকরণ (ওয়ার্ড-২)
পশ্চিম বাকলিয়া (ওয়ার্ড-১৭)
দক্ষিণ বাকলিয়া (ওয়ার্ড-১৯)
দক্ষিণ বালুচরা (ওয়ার্ড-৩৯)
পাথরঘাটা (ওয়ার্ড-৩৪)
আন্দরকিল্লা (ওয়ার্ড-৩২)

এসব এলাকায় দ্রুত মশক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা জোরদারের সুপারিশ করা হয়েছে।

ডেঙ্গুর ঝুঁকি পরিমাপের জন্য ব্যবহৃত গুরুত্বপূর্ণ সূচকগুলোর ফলও বেশ উদ্বেগজনক।

স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্যমতে:

কনটেইনার ইনডেক্স: ৩৩.০৪%
হাউস ইনডেক্স: ২৬.৭৬%
ব্রেটো ইনডেক্স: ৩০.৮১%

বিশেষজ্ঞদের মতে, কনটেইনার ইনডেক্স ১০ শতাংশের নিচে থাকলে ঝুঁকি তুলনামূলক কম থাকে। কিন্তু চট্টগ্রামে এই হার তিনগুণের বেশি হওয়ায় সংক্রমণের সম্ভাবনা অত্যন্ত বেশি।

অন্যদিকে হাউস ইনডেক্সের স্বাভাবিক মাত্রা ৫ শতাংশের নিচে এবং ব্রেটো ইনডেক্স ২০ শতাংশের নিচে থাকার কথা। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি সেই সীমা ছাড়িয়ে গেছে।

জরিপে ধরা পড়া মশার মধ্যে প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ ছিল এডিস ইজিপটাই। এটি ডেঙ্গু ভাইরাসের প্রধান বাহক।

বাকি ২০ থেকে ৩০ শতাংশ ছিল এডিস এলবোপিকটাস, যা ডেঙ্গুর দ্বিতীয় প্রধান বাহক হিসেবে পরিচিত।

এই তথ্য বিশেষজ্ঞদের আরও চিন্তিত করেছে। কারণ এডিস ইজিপটাই সাধারণত বাসাবাড়ির আশপাশেই বেশি বংশবিস্তার করে।

স্বাস্থ্য বিভাগের প্রতিবেদনে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে কয়েকটি জরুরি সুপারিশ দেওয়া হয়েছে।

প্রথমত, কোনও পাত্র, টব, টায়ার, ড্রাম কিংবা বাড়ির আঙিনায় তিন দিনের বেশি পানি জমতে দেওয়া যাবে না।

দ্বিতীয়ত, বাড়ি ও অফিসের আশপাশ নিয়মিত পরিষ্কার রাখতে হবে।

তৃতীয়ত, প্লাস্টিকের বোতল, কৌটা ও অন্যান্য পানি জমার উপকরণ দ্রুত অপসারণ করতে হবে।

বিশেষ করে বহুতল ভবনের বেইসমেন্ট, আন্ডারগ্রাউন্ড ট্যাংক, নির্মাণাধীন ভবন এবং ছাদে জমে থাকা পানির দিকে বাড়তি নজর দিতে বলা হয়েছে।

এছাড়া সময়মতো লার্ভিসাইডিং এবং অ্যাডাল্টিসাইডিং কার্যক্রম চালানোরও পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

চট্টগ্রাম স্বাস্থ্য বিভাগের বিভাগীয় কীটতত্ত্ববিদ মো. মফিজুল হক শাহ বলেছেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে জনগণের সচেতনতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

তার মতে, নিজের বাড়ির আঙিনা, ফুলের টব, নারিকেলের খোসা, পুরোনো বোতল বা যেকোনও পানি জমতে পারে এমন জিনিস পরিষ্কার রাখলেই ডেঙ্গুর ঝুঁকি অনেক কমানো সম্ভব।

তিনি বলেন, শুধু সরকারি উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। জনগণকে নিজ দায়িত্বও নিতে হবে।

চট্টগ্রাম বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) ডা. শেখ ফজলে রাব্বি জানিয়েছেন, এবার আগস্টের আগেই জরিপ করা হয়েছে, যাতে আগাম প্রস্তুতি নেওয়া যায়।

তিনি জানান, হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসা নিশ্চিত করতে স্টাফ নার্সদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।

একই সঙ্গে চিকিৎসকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হয়েছে এবং পর্যাপ্ত স্যালাইন ও ওষুধ মজুদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

এর ফলে ডেঙ্গু পরিস্থিতি খারাপ হলেও দ্রুত মোকাবিলা করা সহজ হবে।

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন জানিয়েছে, এবার ডেঙ্গু দমনে প্রচলিত রাসায়নিকের বদলে আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব বিটিআই প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে।

মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেছেন, প্রতিটি ওয়ার্ডে মশক নিধনে বিশেষ ক্র্যাশ প্রোগ্রাম চালানো হচ্ছে।

তার দাবি, এই উদ্যোগের ফলে আক্রান্তের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।

তবে তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, নগরবাসী নিজেরা সচেতন না হলে শুধু সিটি করপোরেশনের পক্ষে ডেঙ্গু পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়।

ডেঙ্গু এখন আর শুধু মৌসুমি রোগ নয়। জলবায়ু পরিবর্তন, নগরায়ন এবং অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কারণে এর বিস্তার বাড়ছে।

চট্টগ্রামের বর্তমান জরিপ বলছে, পরিস্থিতি আগাম সতর্কবার্তা দিচ্ছে।

এখনই যদি বাসাবাড়ি, ছাদ, নির্মাণাধীন ভবন এবং আশপাশ পরিষ্কার রাখা যায়, তাহলে বড় ধরনের ডেঙ্গু প্রাদুর্ভাব ঠেকানো সম্ভব।

মনে রাখতে হবে, ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অস্ত্র হলো সচেতনতা। কারণ এডিস মশা জন্মানোর আগেই যদি উৎস ধ্বংস করা যায়, তাহলে রোগ ছড়ানোর সুযোগই থাকবে না।