নিউজ বাংলা, আন্তর্জাতিক ডেক্স : যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সির ক্লার্ক শহরের ভ্যালি রোড স্কুলের চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থীরা শিল্প, সাহিত্য ও ভাবনার মাধ্যমে ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের সন্ত্রাসী হামলায় নিহতদের স্মরণ করেছে। ইতিহাসের এই গুরুত্বপূর্ণ ও বেদনাদায়ক অধ্যায় সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের ধারণা দিতে বিদ্যালয়ে আয়োজন করা হয় বিশেষ পাঠ ও শিল্পকর্মের কার্যক্রম।
শিক্ষার্থীরা বই পড়ার পাশাপাশি নিজেদের সৃজনশীলতার মাধ্যমে শান্তি, সহমর্মিতা, ঐক্য ও মানবিকতার বার্তা তুলে ধরেছে। তাদের তৈরি ফুলে ঘেরা টুইন টাওয়ারের একটি বড় দেয়ালচিত্র এখন বিদ্যালয়ের করিডরে প্রদর্শিত হচ্ছে।
ভ্যালি রোড স্কুলের চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থীরা প্রথমে জিনেট উইন্টারের লেখা শিশুদের বই ‘September Roses’ পড়ে। বইটি ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের ঘটনার পর ঘটে যাওয়া একটি সত্য ঘটনা থেকে অনুপ্রাণিত।
বইটিতে দক্ষিণ আফ্রিকার দুই বোনের গল্প তুলে ধরা হয়েছে। তারা নিউইয়র্ক শহরে একটি ফুলের প্রদর্শনীতে অংশ নিতে হাজার হাজার গোলাপ নিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু তাদের নিউইয়র্ক সফরের সময় ঘটে যায় ভয়াবহ ৯/১১ হামলা।
এই ঘটনার পর দুই বোন তাদের সঙ্গে থাকা ফুলগুলো ব্যবহার করে একটি স্মরণস্থল তৈরি করেন। ফুলের মাধ্যমে তারা টুইন টাওয়ারের আদলে একটি প্রতীকী স্মৃতিচিহ্ন তৈরি করেছিলেন। কঠিন সেই সময়ে তাদের উদ্যোগ মানুষের মধ্যে সান্ত্বনা, আশা ও মানবিকতার অনুভূতি তৈরি করেছিল।
বইটির গল্প শিক্ষার্থীদের গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করে। এরপর প্রত্যেক শিক্ষার্থী নিজের মতো করে গোলাপের ছবি রঙ করে।
পরে সব শিক্ষার্থীর আঁকা ও রঙ করা গোলাপ একসঙ্গে ব্যবহার করে তৈরি করা হয় একটি বড় দেয়ালচিত্র। সেই চিত্রে ফুলে ঘেরা টুইন টাওয়ারের প্রতিকৃতি ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
বইয়ে বর্ণিত ফুলের স্মরণস্থলের ভাবনা অনুসরণ করেই শিক্ষার্থীরা এই শিল্পকর্ম তৈরি করে। বর্তমানে তাদের তৈরি দেয়ালচিত্রটি ভ্যালি রোড স্কুলের করিডরে প্রদর্শন করা হচ্ছে।
এটি শুধু একটি স্কুলের শিল্পকর্ম নয়। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা ইতিহাসকে নিজেদের সৃজনশীলতার সঙ্গে যুক্ত করার সুযোগ পেয়েছে।
শিল্পকর্ম তৈরির সময় শিক্ষার্থীরা ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের ঘটনার পর মানুষের মধ্যে দেখা দেওয়া বিভিন্ন ইতিবাচক উদ্যোগ নিয়েও আলোচনা করে।
তারা বোঝার চেষ্টা করে, কোনো বড় বিপর্যয়ের পর মানুষ কীভাবে একে অপরের পাশে দাঁড়াতে পারে। সহমর্মিতা, দয়া, সহযোগিতা ও ঐক্যের মতো মূল্যবোধ কীভাবে একটি কঠিন পরিস্থিতিতেও মানুষের মধ্যে আশা তৈরি করতে পারে, সে বিষয়েও তারা ভাবনা ভাগ করে নেয়।
শিক্ষার্থীদের জন্য এই কার্যক্রমের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা ছিল দুঃখজনক ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় শুধু হতাশ হয়ে পড়ার পরিবর্তে মানুষ অন্যকে সাহায্য করতে পারে। ছোট ছোট ভালো কাজও একটি সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে।
৯/১১ হামলা ঘটে ২০০১ সালে। ফলে ভ্যালি রোড স্কুলের বর্তমান চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্মের আগেই ইতিহাসের এই ঘটনা ঘটে গেছে।
তবু শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের আলোচনায় উঠে আসে, ৯/১১ এখনো কীভাবে যুক্তরাষ্ট্র এবং বিশ্বের বিভিন্ন মানুষের জীবন ও চিন্তায় প্রভাব ফেলছে।
শিশুদের বয়স ও বোঝার ক্ষমতার কথা বিবেচনা করে ইতিহাসকে সরাসরি ভয়াবহতার মাধ্যমে না দেখিয়ে সাহিত্য, শিল্প ও মানবিকতার দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি তুলে ধরা হয়। এতে শিক্ষার্থীরা একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ঘটনা সম্পর্কে জানতে পারে এবং একই সঙ্গে মানুষের প্রতি সহমর্মী হওয়ার শিক্ষাও পায়।
এই উদ্যোগ দেখিয়েছে, ইতিহাস শেখানোর ক্ষেত্রে শুধু বইয়ের তথ্য বা তারিখ মুখস্থ করাই যথেষ্ট নয়। একটি গল্প, একটি ছবি কিংবা একটি সৃজনশীল কাজও শিক্ষার্থীদের ইতিহাসের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত করতে পারে।
‘September Roses’ বইয়ের গল্প থেকে শুরু করে নিজেদের হাতে গোলাপ রঙ করা এবং শেষে সম্মিলিতভাবে দেয়ালচিত্র তৈরি—পুরো প্রক্রিয়াটিই শিক্ষার্থীদের সক্রিয়ভাবে শেখার সুযোগ দিয়েছে।
একজন শিক্ষার্থী যখন নিজের হাতে একটি ফুল আঁকে বা রঙ করে, তখন সেটি তার কাছে শুধু একটি ছবি থাকে না। সেই ফুল একটি বড় গল্পের অংশ হয়ে ওঠে। একইভাবে অনেক শিক্ষার্থীর কাজ একত্র হয়ে যখন একটি দেয়ালচিত্র তৈরি করে, তখন সেখানে ঐক্য ও সম্মিলিত প্রচেষ্টার একটি বার্তাও ফুটে ওঠে।
ভ্যালি রোড স্কুলের এই উদ্যোগের মূল বার্তা শুধু অতীতকে মনে রাখা নয়। বরং অতীত থেকে কী শেখা যায়, সেটিও শিক্ষার্থীদের সামনে তুলে ধরা।
৯/১১-এর মতো একটি ঐতিহাসিক ঘটনা মানুষের জীবনে গভীর প্রভাব ফেলেছে। তবে সেই ঘটনার পর মানুষের সহায়তা, সহমর্মিতা ও ঐক্যের যে উদাহরণ তৈরি হয়েছিল, সেগুলোও ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের তৈরি ফুলে ঘেরা টুইন টাওয়ারের দেয়ালচিত্র তাই স্মৃতির পাশাপাশি আশার প্রতীক হিসেবেও কাজ করছে। এটি শিক্ষার্থীদের মনে করিয়ে দেয়, কঠিন সময়েও মানুষ একে অপরের পাশে দাঁড়াতে পারে।
ভ্যালি রোড স্কুলের চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের এই কার্যক্রম প্রমাণ করেছে, ইতিহাসের শিক্ষা শুধু অতীত বোঝার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সেই শিক্ষা বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সমাজকেও প্রভাবিত করতে পারে।
সাহিত্য শিক্ষার্থীদের একটি সত্য ঘটনার সঙ্গে পরিচয় করিয়েছে। শিল্প তাদের সেই গল্পকে নিজেদের ভাষায় প্রকাশের সুযোগ দিয়েছে। আর আলোচনা তাদের বুঝিয়েছে, বিপর্যয়ের সময় মানুষের প্রতি সহমর্মিতা ও সহযোগিতা কতটা গুরুত্বপূর্ণ।
এইভাবেই ইতিহাস, সাহিত্য ও শিল্প একসঙ্গে শিক্ষার্থীদের সামনে একটি বড় মানবিক বার্তা তুলে ধরেছে অতীতকে স্মরণ করার পাশাপাশি ভবিষ্যৎকে আরও সহানুভূতিশীল, ঐক্যবদ্ধ ও আশাবাদী করে গড়ে তোলাও জরুরি।
ভ্যালি রোড স্কুলের করিডরে থাকা সেই ফুলে ঘেরা টুইন টাওয়ারের দেয়ালচিত্র তাই শিক্ষার্থীদের একটি সৃজনশীল কাজের চেয়েও বেশি কিছু। এটি ইতিহাস স্মরণ, মানবিকতা চর্চা এবং আগামী দিনের জন্য ইতিবাচক মূল্যবোধ গড়ে তোলার একটি প্রতীক হয়ে উঠেছে।


