রাহুল রাহা,এনবি সংবাদ, আর্ন্তজাতিক ডেস্ক : পৃথিবীতে এমন কিছু প্রাকৃতিক বিস্ময় রয়েছে, যেগুলির বিশালত্ব চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন। তেমনই এক আশ্চর্য সৃষ্টি হল বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু গাছ। এতটাই উঁচু এই গাছ যে ভারতের বিখ্যাত কুতুবমিনারও তার সামনে তুলনায় ছোট মনে হবে। গাছটির নাম হাইপেরিয়ন।
প্রকৃতির এই মহীরুহের উচ্চতা প্রায় ৩৮০ ফুট। ফলে মাটিতে দাঁড়িয়ে উপরের দিকে তাকালে এর পুরো উচ্চতা উপলব্ধি করাই কঠিন। আরও অবাক করার বিষয় হল, গাছটি সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত কোনও পর্যটনস্থানের মতো নয়। এর সঠিক অবস্থানও গোপন রাখা হয়।
দিল্লির ঐতিহাসিক কুতুবমিনারের উচ্চতা প্রায় ২৩৮ ফুট। স্থাপনাটির নিচে দাঁড়ালে তার চূড়া দেখতে মাথা অনেকটাই পেছনে হেলাতে হয়। কিন্তু হাইপেরিয়নের সামনে সেই উচ্চতাও যেন কম মনে হতে পারে।
প্রায় ৩৮০ ফুট উচ্চতার এই গাছ কুতুবমিনারের তুলনায় প্রায় ১৪০ ফুটেরও বেশি উঁচু। অর্থাৎ একটি সুউচ্চ ঐতিহাসিক স্থাপত্যের থেকেও প্রকৃতির তৈরি এই গাছ অনেক বেশি লম্বা।
বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু গাছটি রয়েছে আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়ায় অবস্থিত রেডউড ন্যাশনাল পার্কের বিস্তীর্ণ অরণ্যে। এটি কোনও সাধারণ গাছ নয়, বরং কোস্ট রেডউড প্রজাতির একটি বিশাল মহীরুহ।
রেডউড অরণ্যে এমনিতেই অসংখ্য অতিকায় গাছ দেখা যায়। কিন্তু তাদের মধ্যেও হাইপেরিয়ন নিজের উচ্চতার কারণে আলাদা করে নজর কেড়ে নেয়।
গাছটি মূলত সোজা হয়ে আকাশের দিকে উঠে গিয়েছে। কাণ্ডের নিচের দিকে খুব বেশি ডালপালা দেখা যায় না। তুলনায় উপরের অংশে রয়েছে বেশি শাখা-প্রশাখা ও পাতার বিস্তার।
হাইপেরিয়নের সন্ধান পাওয়া যায় ২০০৬ সালে। আবিষ্কারের পর থেকেই বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু গাছ হিসেবে এটি প্রকৃতিপ্রেমী ও গবেষকদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি করে।
এমন একটি বিশাল গাছের অস্তিত্ব স্বাভাবিকভাবেই পর্যটকদের মধ্যেও কৌতূহল তৈরি করেছে। অনেকেই এই গাছটি নিজের চোখে দেখতে চান। তবে চাইলেই হাইপেরিয়নের একেবারে কাছে গিয়ে দাঁড়ানো সম্ভব নয়।
বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু গাছটির সঠিক অবস্থান সাধারণ পর্যটকদের জানানো হয় না। এর অন্যতম কারণ গাছটিকে মানুষের অতিরিক্ত আনাগোনা থেকে রক্ষা করা।
কোনও বিরল বা অতি গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদকে ঘিরে পর্যটকদের ভিড় বাড়লে পরিবেশের উপর চাপ পড়তে পারে। গাছের আশপাশের মাটি, শিকড় এবং অরণ্যের স্বাভাবিক পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কাও থাকে।
তাই হাইপেরিয়নকে রক্ষা করতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে এর অবস্থান গোপন রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে। নির্দিষ্ট এলাকা থেকে দূরে থেকেই পর্যটকদের এই মহীরুহ দেখার সুযোগ দেওয়া হয়।
অনেক পর্যটকের স্বাভাবিক ইচ্ছা থাকে এত বড় একটি গাছের কাণ্ডে হাত রেখে ছবি তোলার বা তার নিচে দাঁড়িয়ে উচ্চতা অনুভব করার। কিন্তু হাইপেরিয়নের ক্ষেত্রে সেই সুযোগ নেই।
গাছটির সুরক্ষার জন্য দর্শনার্থীদের নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রাখতে হয়। গাছটির কাছে গিয়ে সেটিকে ক্ষতিগ্রস্ত করার চেষ্টা করলে প্রশাসনের তরফে জরিমানার ব্যবস্থাও রয়েছে।
ফলে হাইপেরিয়নের নিচে দাঁড়িয়ে ছবি তোলা বা গাছটিকে ছুঁয়ে দেখার অভিজ্ঞতা সাধারণ পর্যটকের ভাগ্যে জোটে না। বরং নির্ধারিত স্থান থেকেই দূর থেকে এই প্রাকৃতিক বিস্ময়কে দেখতে হয়।
হাইপেরিয়নের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য শুধু তার উচ্চতা নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা প্রকৃতির ভারসাম্যও। মানুষের তৈরি কুতুবমিনার, আকাশচুম্বী ভবন বা বিশাল কোনও স্থাপনার উচ্চতা দেখে আমরা বিস্মিত হই। কিন্তু প্রকৃতিও যে তার নিজস্ব উপায়ে আরও বড় বিস্ময় তৈরি করতে পারে, হাইপেরিয়ন তারই উদাহরণ।
প্রায় ৩৮০ ফুট উচ্চতায় দাঁড়িয়ে থাকা এই কোস্ট রেডউড দেখিয়ে দেয়, একটি গাছও কতটা বিশাল আকার ধারণ করতে পারে। আর সেই কারণেই বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু গাছের তালিকায় হাইপেরিয়নের নাম বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
তবে এই মহীরুহকে কাছ থেকে দেখার চেয়ে তাকে সুরক্ষিত রাখা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাই দূর থেকেই হাইপেরিয়নের সৌন্দর্য উপভোগ করতে হয় পর্যটকদের। প্রকৃতির এই অনন্য সৃষ্টি টিকে থাকুক আগামী প্রজন্মের জন্য—সেটিই এখন সবচেয়ে বড় লক্ষ্য।



