এনবি সংবাদ,আর্ন্তজাতিক ডেস্ক : কংক্রিটের তৈরি শহর। চারদিকে উঁচু উঁচু বাড়ি, সেতু, রাস্তা এবং নানা ধরনের পরিকাঠামো। আধুনিক নগরজীবনের অন্যতম প্রধান উপাদানই হল কংক্রিট। কিন্তু আগামী দিনে এই কংক্রিট তৈরির উপকরণে আসতে পারে অবিশ্বাস্য পরিবর্তন। মানুষের মলকেও কাজে লাগিয়ে তৈরি হতে পারে নির্মাণসামগ্রী। এমনই সম্ভাবনার দিক দেখিয়েছেন ভারতীয় বিজ্ঞানীরা।
শুনতে অবাক লাগলেও মানুষের মল থেকে তৈরি বায়োচার ব্যবহার করে কংক্রিটের বৈশিষ্ট্য উন্নত করার বিষয়ে গবেষণা চলছে। এই প্রযুক্তি সফল হলে একদিকে যেমন বর্জ্য ব্যবস্থাপনার নতুন পথ খুলতে পারে, অন্যদিকে নির্মাণশিল্পেও আসতে পারে পরিবেশবান্ধব বিকল্প।
ভারতের ওয়ারাঙ্গলের একটি ট্রিটমেন্ট প্লান্টে মানুষের মল প্রক্রিয়াজাত করে বায়োচার তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় উচ্চ তাপমাত্রায় জৈব বর্জ্যকে উত্তপ্ত করলে যে কার্বনসমৃদ্ধ পদার্থ তৈরি হয়, সেটিই বায়োচার নামে পরিচিত।
এই বায়োচারকে বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করার সম্ভাবনা নিয়ে বিশ্বজুড়েই গবেষণা চলছে। কৃষি থেকে শুরু করে পরিবেশ ব্যবস্থাপনা—বায়োচারের একাধিক সম্ভাব্য ব্যবহার রয়েছে। এবার নির্মাণশিল্পেও এর প্রয়োগের পথ খুঁজছেন বিজ্ঞানীরা।
কংক্রিট সাধারণত সিমেন্ট, বালি, পাথর বা অন্যান্য উপকরণের মিশ্রণে তৈরি হয়। এর শক্তি ও স্থায়িত্ব নির্ভর করে ব্যবহৃত উপকরণ এবং মিশ্রণের অনুপাতের উপর।
গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, কংক্রিটের নির্দিষ্ট উপাদানের কিছু অংশের বিকল্প হিসেবে বায়োচার ব্যবহার করলে তার গঠন ও শক্তিতে কী ধরনের পরিবর্তন আসে। মানুষের মল থেকে তৈরি বায়োচারও সেই পরীক্ষার আওতায় এসেছে।
গবেষণার ফলাফল ভবিষ্যতে কার্যকর প্রমাণিত হলে বর্জ্য থেকে পাওয়া এই কার্বনসমৃদ্ধ উপাদান নির্মাণসামগ্রীর একটি অংশ হিসেবে ব্যবহার করা সম্ভব হতে পারে।
মানুষের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিশ্বের বহু শহরের কাছেই বড় চ্যালেঞ্জ। জনসংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পয়ঃবর্জ্যের পরিমাণও বাড়ছে। এই বর্জ্যকে নিরাপদভাবে প্রক্রিয়াজাত করে যদি নির্মাণসামগ্রী তৈরির কাজে ব্যবহার করা যায়, তাহলে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
বিশেষ করে বর্জ্যকে ফেলে না দিয়ে পুনর্ব্যবহারের মাধ্যমে নতুন সম্পদে পরিণত করার ধারণা বর্তমানে বিজ্ঞান ও পরিবেশ গবেষণায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মানুষের মল থেকে বায়োচার তৈরি করে সেটিকে নির্মাণসামগ্রীতে ব্যবহার করার ভাবনাও সেই বৃহত্তর পুনর্ব্যবহারযোগ্য প্রযুক্তির অংশ।
আগামী দিনে শহরের নির্মাণকাজে বর্জ্য থেকে তৈরি উপাদানের ব্যবহার বাড়তে পারে বলে মনে করছেন গবেষকেরা। তবে মানুষের মল দিয়ে সরাসরি কংক্রিট তৈরি হবে—বিষয়টি এমন সরল নয়। আসলে মলকে বিশেষ প্রক্রিয়ায় রূপান্তর করে পাওয়া বায়োচারকে সম্ভাব্য নির্মাণ উপাদান হিসেবে পরীক্ষা করা হচ্ছে।
এই প্রযুক্তি বাস্তবে প্রয়োগের আগে একাধিক বিষয় নিশ্চিত করা প্রয়োজন। কংক্রিট কতটা শক্তিশালী হবে, দীর্ঘদিন ব্যবহারের পর তার স্থায়িত্ব কেমন থাকবে, বিভিন্ন আবহাওয়ায় তার আচরণ কী হবে এবং নির্মাণের নিরাপত্তা বজায় থাকবে কি না—সবকিছুই পরীক্ষা করে দেখতে হবে।
নতুন ধরনের নির্মাণ উপাদান নিয়ে আশাবাদ তৈরি হলেও এখনই এটিকে প্রচলিত কংক্রিটের বিকল্প হিসেবে ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। পরীক্ষাগারে পাওয়া ফলাফল বাস্তব নির্মাণক্ষেত্রে কতটা কার্যকর হবে, তা নিশ্চিত করতে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
বিশেষ করে বড় ভবন, সেতু বা গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামো তৈরিতে ব্যবহারের আগে উপাদানটির নিরাপত্তা ও স্থায়িত্ব সম্পর্কে দীর্ঘমেয়াদি তথ্য প্রয়োজন হবে।
বিজ্ঞানীরা যদি এই প্রযুক্তির সব দিক সফলভাবে যাচাই করতে পারেন, তাহলে ভবিষ্যতে পয়ঃবর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং নির্মাণশিল্প—দুই ক্ষেত্রেই এর প্রভাব পড়তে পারে।
মানুষের মল থেকে তৈরি বায়োচারকে কংক্রিটের সঙ্গে যুক্ত করার ধারণা নিঃসন্দেহে অভিনব। বর্জ্যকে সম্পদে পরিণত করার এই প্রচেষ্টা সফল হলে তা পরিবেশবান্ধব নির্মাণ প্রযুক্তির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হয়ে উঠতে পারে।
তবে গবেষণার বর্তমান পর্যায় থেকে সরাসরি বলা যায় না যে আগামী দিনের সমস্ত শহর মানুষের মল থেকে তৈরি কংক্রিটে গড়ে উঠবে। তার জন্য আরও পরীক্ষা, নিরাপত্তা যাচাই এবং বাস্তব প্রয়োগের প্রয়োজন রয়েছে।
তবু একটি বিষয় স্পষ্ট—যে বর্জ্যকে এতদিন শুধুই ফেলে দেওয়ার বস্তু হিসেবে দেখা হত, বিজ্ঞানীরা সেটিকেই ভবিষ্যতের সম্পদে পরিণত করার চেষ্টা করছেন। আর সেই গবেষণাই আগামী দিনের আরও টেকসই ও পরিবেশবান্ধব শহর নির্মাণের নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিতে পারে।



