এনবি সংবাদ ডেক্স : বর্ষা এলেই যেন নতুন রূপে সেজে ওঠে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া উপজেলার ধর্মনগর কালীবাড়ী পদ্মবিল। ভারতের ত্রিপুরা সীমান্তঘেঁষা প্রায় ১২০ একরজুড়ে বিস্তৃত এই বিল বর্ষাকালে অসংখ্য পদ্মফুলে ছেয়ে যায়। দূর থেকে তাকালে মনে হয়, পানির ওপর বিছিয়ে দেওয়া হয়েছে গোলাপি-সাদা ফুলের বিশাল চাদর।
পদ্মের মিষ্টি সুবাস, চারপাশের জলরাশি আর নির্মল প্রাকৃতিক পরিবেশ উপভোগ করতে প্রতিদিনই এখানে ভিড় করছেন দূর-দূরান্তের দর্শনার্থীরা। কেউ আসছেন পরিবার নিয়ে, কেউ বন্ধুদের সঙ্গে। আবার অনেকে ছোট ডিঙি নৌকায় চড়ে বিলের মাঝখানে গিয়ে উপভোগ করছেন পদ্মের রাজ্য।
প্রত্যন্ত এলাকায় অবস্থান হলেও পদ্মফুল ফোটার মৌসুমে এই বিলকে কেন্দ্র করে দর্শনার্থীদের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। বিশেষ করে শ্রাবণ মাসে বিলের সৌন্দর্য সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ করে প্রকৃতিপ্রেমীদের।
ধর্মনগর কালীবাড়ী পদ্মবিল ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহর থেকে প্রায় ৩৮ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। এটি আখাউড়া ও কসবা উপজেলার মধ্যবর্তী এলাকায় এবং ভারতের ত্রিপুরা সীমান্তের কাছাকাছি।
আখাউড়া-কসবা সড়ক দিয়ে মনিয়ন্দ ইউনিয়ন পরিষদের সামনে হয়ে টনকি কর্মমঠ এলাকায় যেতে হয়। সেখান থেকে স্থানীয় বাসিন্দাদের জিজ্ঞেস করলেই সহজেই পদ্মবিলে যাওয়ার পথ জানা যায়।
বিলের পশ্চিম পাশে বাংলাদেশের আখাউড়া ও কসবা উপজেলা। পূর্ব দিকে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের মাধবপুর থানা। যাওয়ার পথে বেশ কিছু আঁকাবাঁকা রাস্তা থাকায় ছোট যানবাহনে যাতায়াত তুলনামূলক সুবিধাজনক। আখাউয়া বা কসবা উপজেলা থেকে সিএনজি অটোরিকশায়ও পদ্মবিলে যাওয়া যায়।
স্থানীয়দের কাছে এটি ধর্মনগর কালীবাড়ী পদ্মবিল নামে পরিচিত। তবে বিলের অপর প্রান্ত কসবা উপজেলার গোসাইস্থল এলাকায় হওয়ায় ওই অংশটি অনেকের কাছে গোসাইস্থল পদ্মবিল নামেও পরিচিত।
প্রকৃতি অনুকূলে থাকলে প্রতিবছর বর্ষার শুরুতেই এই বিলে পদ্মফুল ফুটতে শুরু করে। আষাঢ় মাস থেকে ফুল ফুটলেও শ্রাবণে গিয়ে বিলের সৌন্দর্য যেন পূর্ণতা পায়। বিস্তীর্ণ জলরাশির ওপর একের পর এক পদ্মফুল ফুটে চারপাশকে করে তোলে মনোমুগ্ধকর।
প্রায় পাঁচ মাস ধরে, অর্থাৎ আষাঢ় থেকে কার্তিক পর্যন্ত, বিভিন্ন সময়ে পদ্মফুল দেখা যায়। এ সময় বিলের পাড়ে দাঁড়িয়ে যেমন সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়, তেমনি নৌকায় করে বিলের ভেতরে ঢুকলে পাওয়া যায় আরও ভিন্ন এক অভিজ্ঞতা।
পদ্মের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক গুরুত্বও রয়েছে। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের দুর্গাপূজায় পদ্ম অন্যতম প্রয়োজনীয় উপকরণ। ফলে পূজার সময় ঘনিয়ে এলে এই ফুলের চাহিদাও বাড়ে।
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের টানে প্রতিদিনই বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ ছুটে আসছেন ধর্মনগর কালীবাড়ী পদ্মবিলে। স্থানীয়দের ভাষ্য, সকাল ও বিকেলে দর্শনার্থীর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি থাকে।
ঢাকা থেকে আখাউড়ায় স্বজনের বাড়িতে বেড়াতে এসে পদ্মবিল দেখতে যান পর্যটক জোনায়েদ হোসেন। তিনি জানান, স্বজনদের কাছ থেকে বিলটির কথা জানতে পেরে হঠাৎ করেই সেখানে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। বিলের কাছে পৌঁছে পদ্মের সুবাস ও চারপাশের পরিবেশ তাকে মুগ্ধ করে।
তার মতে, এমন প্রাকৃতিক সৌন্দর্য কাছ থেকে দেখার সুযোগ সত্যিই বিশেষ। তবে এই সৌন্দর্য ধরে রাখতে স্থানীয় প্রশাসন ও মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
স্থানীয় পর্যটক কবীর আহম্মেদ বলেন, দূর-দূরান্ত থেকে অনেক মানুষ পদ্মের সৌন্দর্য দেখতে এখানে আসেন। ছোট ডিঙি নৌকায় বিলের মাঝখানে গেলে চারপাশের দৃশ্য আরও আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। পানির ওপর ফুটে থাকা অসংখ্য পদ্মফুলের মধ্যে নৌকায় ঘুরে বেড়ানোর অভিজ্ঞতা দর্শনার্থীদের কাছে বিশেষ আনন্দের।
পদ্মবিল ঘিরে দর্শনার্থীর সংখ্যা বাড়লেও পর্যাপ্ত পর্যটনসুবিধা এখনও গড়ে ওঠেনি। বিশেষ করে শৌচাগার ও পোশাক পরিবর্তনের ব্যবস্থা না থাকায় ভোগান্তিতে পড়তে হয় অনেককে।
স্থানীয়দের মতে, পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে পদ্মবিলের সম্ভাবনা অনেক। কিন্তু পরিকল্পিতভাবে পর্যটন অবকাঠামো তৈরি না হলে দর্শনার্থীদের বিড়ম্বনা বাড়বে। একই সঙ্গে অব্যবস্থাপনার কারণে প্রাকৃতিক পরিবেশও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
তাই প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা তৈরির পাশাপাশি বিলের স্বাভাবিক পরিবেশ যেন অক্ষুণ্ন থাকে, সেদিকেও নজর দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
পদ্ম শুধু সৌন্দর্যের প্রতীক নয়, এটি জলজ পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি কলেজের উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মনির হোসেনের মতে, পাখি ও প্রাকৃতিক জলপ্রবাহের মাধ্যমে পদ্মের বীজ এক স্থান থেকে অন্য স্থানে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
পদ্মের কন্দ বা রাইজম মাটির নিচে দীর্ঘ সময় জীবিত থাকতে পারে। শুষ্ক মৌসুমে কোনো জলাশয় শুকিয়ে গেলেও মাটির গভীরে থাকা এই কন্দ টিকে থাকে। পরবর্তী সময়ে বৃষ্টি হয়ে জলাশয়ে পানি জমলে সেখান থেকেই নতুন পদ্মগাছ জন্ম নেয়।
জলাশয়ে পদ্মের উপস্থিতি মাছের জন্যও উপকারী। পদ্মের বিস্তৃত অংশের মধ্যে মাছ আশ্রয় নিতে পারে। পাশাপাশি পদ্মের বীজ বিভিন্ন পাখির খাদ্য হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। ফলে কোনো একটি জলাশয় থেকে পদ্ম হারিয়ে গেলে এর প্রভাব শুধু ফুলের সৌন্দর্যের ওপর পড়ে না, বরং ওই এলাকার সামগ্রিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ওপরও পড়তে পারে।
দর্শনার্থীদের ভিড় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পদ্মফুল ছিঁড়ে নেওয়ার ঘটনাও স্থানীয়দের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেকে স্মৃতি হিসেবে ফুল নিয়ে যেতে চান। কিন্তু প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ একটি করে ফুল ছিঁড়ে নিলেও অল্প সময়ের মধ্যে বিলের সৌন্দর্য নষ্ট হয়ে যেতে পারে।
মনিয়ন্দ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মাহাবুবুল আলম দীপক জানান, দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা এবং পদ্মবিলের সৌন্দর্য রক্ষায় স্থানীয়ভাবে একটি কমিটি করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের ইউপি সদস্যসহ স্থানীয় কয়েকজনকে এ কাজে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি একজন গ্রাম পুলিশকেও দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, যাতে দর্শনার্থীরা পদ্মফুল না ছেঁড়েন।
তার ভাষ্য, দর্শনার্থীরা যদি ফুল না ছেঁড়েন, তাহলে বিলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দীর্ঘদিন ধরে উপভোগ করা সম্ভব হবে।
আখাউড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তাপসী রাবেয়া জানিয়েছেন, বর্তমানে পদ্মবিলে প্রচুর ফুল ফুটেছে এবং তিনিও সেখানে গিয়েছেন। দর্শনার্থীদের ফুল না ছেঁড়ার অনুরোধ জানিয়ে বিভিন্ন স্থানে সাইনবোর্ড ও ব্যানার দেওয়া হয়েছিল। তবে সচেতনতার অভাবে সেগুলোর কিছু সরিয়ে ফেলা হচ্ছে এবং কেউ কেউ ফুলও ছিঁড়ে নিচ্ছেন।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে দর্শনার্থীদের নিয়মিতভাবে ফুল না ছেঁড়ার অনুরোধ করা হচ্ছে। একই সঙ্গে পদ্মবিলের পরিবেশ সুরক্ষায় পরিবেশ নিয়ে কাজ করা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে আলোচনা চলছে।
দর্শনার্থীদের সুযোগ-সুবিধার বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে দেখছে উপজেলা প্রশাসন। পদ্মবিলে এখনও ওয়াশ ব্লক ও চেঞ্জিং রুমের ব্যবস্থা নেই। এসব সুবিধা তৈরির জন্য ইতোমধ্যে প্রকল্প নেওয়া হয়েছে এবং টেন্ডারও সম্পন্ন হয়েছে। খুব শিগগিরই নির্মাণকাজ শুরু হওয়ার কথা জানিয়েছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা।
স্থানীয়দের মতে, পরিকল্পিতভাবে শৌচাগার, চেঞ্জিং রুম, বসার জায়গা, নিরাপদ যাতায়াত এবং প্রয়োজনীয় তথ্যসেবা চালু করা গেলে পদ্মবিলটি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত হতে পারে।



