খবর পান সবার আগে

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। আমাদের নিউজলেটারে সাবস্ক্রাইব করুন এবং দেশ-বিদেশের গুরুত্বপূর্ণ সংবাদগুলো প্রতিদিন আপনার ইমেইলে পান।

― Advertisement ―

spot_imgspot_img
Homeএক্সক্লুসিভ৮০ ফুট লম্বা দানব! সমুদ্রের আসল রাজা মেগালোডন সম্পর্কে চমকে দেওয়া নতুন...

৮০ ফুট লম্বা দানব! সমুদ্রের আসল রাজা মেগালোডন সম্পর্কে চমকে দেওয়া নতুন তথ্য

মডেল বিশ্লেষণের ফলাফল অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট মেগালোডনের দৈর্ঘ্য প্রায় ৮০ ফুট হতে পারে। যদিও এর লেজ ও পাখনার সুনির্দিষ্ট আকার সম্পর্কে এখনো নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি, তবে গবেষকদের মতে এটি ছিল বর্তমান সময়ের যেকোনো পরিচিত হাঙরের তুলনায় বহুগুণ বৃহৎ।

প্রাগৈতিহাসিক পৃথিবীর ইতিহাসে এমন কিছু প্রাণী রয়েছে, যাদের আকার, শক্তি এবং শিকারি দক্ষতা আজও বিজ্ঞানীদের বিস্মিত করে। সেই তালিকার শীর্ষে রয়েছে মেগালোডন (Otodus megalodon)—পৃথিবীর ইতিহাসে পরিচিত সবচেয়ে বড় হাঙর। কোটি কোটি বছর আগে এই দৈত্যাকার সামুদ্রিক শিকারি মহাসাগরের খাদ্যশৃঙ্খলের সর্বোচ্চ স্তরে অবস্থান করত। সম্প্রতি প্রকাশিত একটি গবেষণায় মেগালোডনের প্রকৃত দৈর্ঘ্য, খাদ্যাভ্যাস এবং সম্ভাব্য আয়ু সম্পর্কে নতুন ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে এসেছে, যা এই বিলুপ্ত প্রাণী সম্পর্কে আমাদের ধারণাকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।

প্রায় ২ কোটি ৩০ লক্ষ বছর আগে পৃথিবীর মহাসাগরে আবির্ভাব ঘটে মেগালোডনের। এরপর দীর্ঘ সময় ধরে তারা সমুদ্রে আধিপত্য বিস্তার করে এবং প্রায় ৩৬ লক্ষ বছর আগে বিলুপ্ত হয়ে যায়। অর্থাৎ, প্রায় ২ কোটি বছরেরও বেশি সময় ধরে এই বিশালাকার হাঙর পৃথিবীর অন্যতম ভয়ংকর সামুদ্রিক শিকারি হিসেবে টিকে ছিল।

বর্তমান সময়ের গ্রেট হোয়াইট হাঙরকে ভয়ংকর মনে হলেও, মেগালোডনের তুলনায় সেটি ছিল অনেক ছোট। যেখানে একটি পূর্ণবয়স্ক গ্রেট হোয়াইট হাঙরের দৈর্ঘ্য সাধারণত ২০ ফুট, সেখানে নতুন গবেষণা বলছে, একটি পূর্ণবয়স্ক মেগালোডনের দৈর্ঘ্য ৮০ ফুট পর্যন্ত হতে পারত। অর্থাৎ এটি প্রায় দুটি বড় বাসের সমান লম্বা ছিল।

সম্প্রতি Palaeontologia Electronica জার্নালে প্রকাশিত গবেষণায় বিজ্ঞানীরা মেগালোডনের কশেরুকা বিশ্লেষণ করে তাদের দৈর্ঘ্য নির্ধারণ করেছেন। উন্নত কম্পিউটার মডেল ব্যবহার করে গবেষকরা ধারণা করেন যে, বিশ্লেষণ করা নমুনার মালিক হাঙরটির দৈর্ঘ্য প্রায় ৮০ ফুট ছিল।

এই গবেষণা শুধু দৈর্ঘ্য নয়, বরং প্রাণীটির জীবনধারা, খাদ্যাভ্যাস এবং আয়ুষ্কাল সম্পর্কেও নতুন তথ্য প্রদান করেছে।

এই গবেষণার অন্যতম আকর্ষণীয় দিক হলো এর পেছনের নাটকীয় ইতিহাস।

১৯৭৮ সালে ডেনমার্কে কাদামাটির স্তূপ থেকে জীবাশ্মবিদেরা একটি মেগালোডনের প্রায় ২০টি কশেরুকা উদ্ধার করেন। এগুলো একই প্রাণীর দেহাবশেষ বলে নিশ্চিত হন গবেষকরা। উদ্ধার হওয়া কশেরুকাগুলোর মধ্যে একটি ছিল প্রায় ২৩ সেন্টিমিটার ব্যাসের, যা আজ পর্যন্ত আবিষ্কৃত মেগালোডনের সবচেয়ে বড় কশেরুকাগুলোর একটি।

জীবাশ্মগুলো সংরক্ষণের জন্য ডেনমার্কের ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়ামে রাখা হয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে ১৯৮৯ সালে জাদুঘরের স্থানান্তরের সময় পুরো জীবাশ্ম সংগ্রহটি হারিয়ে যায়।

দীর্ঘ ২৮ বছর পরে, ২০১৭ সালে জাদুঘরের কিউরেটর বেন্ট এরিক ক্রেমা লিন্ডো একটি পুরোনো বাক্সের মধ্যে হারিয়ে যাওয়া জীবাশ্মগুলো পুনরায় খুঁজে পান।

যদিও সময়ের সঙ্গে জীবাশ্মের অনেক অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল, তবুও সংরক্ষিত কশেরুকা এবং প্রায় ১৮৫টি ছোট জীবাশ্মের টুকরো বিজ্ঞানীদের নতুন গবেষণার সুযোগ করে দেয়।

পুনরুদ্ধার হওয়া কশেরুকার একটি অংশের ব্যাস ছিল প্রায় ২৩ সেন্টিমিটার। এই তথ্যকে ভিত্তি করে গবেষকরা আধুনিক ত্রিমাত্রিক কম্পিউটার মডেল তৈরি করেন।

মডেল বিশ্লেষণের ফলাফল অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট মেগালোডনের দৈর্ঘ্য প্রায় ৮০ ফুট হতে পারে। যদিও এর লেজ ও পাখনার সুনির্দিষ্ট আকার সম্পর্কে এখনো নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি, তবে গবেষকদের মতে এটি ছিল বর্তমান সময়ের যেকোনো পরিচিত হাঙরের তুলনায় বহুগুণ বৃহৎ।

আগে বিজ্ঞানীরা মনে করতেন, মেগালোডনের প্রধান খাদ্য ছিল তিমি এবং বড় সামুদ্রিক স্তন্যপায়ী প্রাণী। কিন্তু নতুন গবেষণা সেই ধারণাকে আরও বিস্তৃত করেছে।

জীবাশ্মের সঙ্গে বাস্কিং হাঙরের আঁশ পাওয়া গেছে, যা প্রমাণ করে যে মেগালোডন অন্যান্য বড় হাঙরকেও শিকার করত।

গবেষণার প্রধান বিজ্ঞানী কেনশু শিমাদা, যিনি শিকাগোর ডিপল ইউনিভার্সিটির জীবাশ্মবিদ, জানান যে বাস্কিং হাঙরের অসংখ্য আঁশ জীবাশ্মের সঙ্গে পাওয়া যাওয়া অত্যন্ত বিস্ময়কর। এটি স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত দেয় যে মেগালোডনের পাকস্থলীতে ওই হাঙরের দেহাবশেষ ছিল।

এর অর্থ, মেগালোডন ছিল অত্যন্ত সুযোগসন্ধানী এবং শক্তিশালী শিকারি, যার খাদ্যতালিকা পূর্ব ধারণার তুলনায় অনেক বেশি বৈচিত্র্যময় ছিল।

গবেষণার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল মেগালোডনের সম্ভাব্য আয়ু নির্ধারণ।

জীবাশ্ম বিশ্লেষণে বিজ্ঞানীরা অনুমান করেছেন, গবেষণায় ব্যবহৃত হাঙরটির মৃত্যুকালে বয়স ছিল অন্তত ৬৪ বছর। তবে উন্নত কম্পিউটার মডেলের সাহায্যে তারা ধারণা করছেন, অনুকূল পরিবেশে একটি মেগালোডন ৯৬ বছর পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারত।

এটি প্রমাণ করে যে শুধু আকারেই নয়, দীর্ঘ জীবনকালেও মেগালোডন ছিল অসাধারণ একটি সামুদ্রিক প্রাণী।

অন্যান্য ডাইনোসরের মতো মেগালোডনের সম্পূর্ণ কঙ্কাল খুব কমই পাওয়া যায়। এর প্রধান কারণ হলো হাঙরের শরীরের অধিকাংশ অংশ তরুণাস্থি (Cartilage) দিয়ে তৈরি, যা সহজেই নষ্ট হয়ে যায় এবং জীবাশ্মে রূপান্তরিত হওয়ার সম্ভাবনা কম।

ফলে গবেষকদের মূল ভরসা থাকে দাঁত, কশেরুকা এবং অল্প কিছু সংরক্ষিত অংশের ওপর। এই কারণেই প্রতিটি নতুন জীবাশ্ম আবিষ্কার মেগালোডন সম্পর্কে নতুন তথ্য জানার মূল্যবান সুযোগ তৈরি করে।

মেগালোডন কেন বিলুপ্ত হয়ে গেল, তার সুনির্দিষ্ট উত্তর এখনো বিজ্ঞানীদের কাছে নেই। তবে ধারণা করা হয়, সমুদ্রের তাপমাত্রার পরিবর্তন, খাদ্যের সংকট, নতুন প্রতিযোগী শিকারির আবির্ভাব এবং পরিবেশগত পরিবর্তনের সম্মিলিত প্রভাবে ধীরে ধীরে এই বিশাল শিকারি পৃথিবী থেকে হারিয়ে যায়।

তবুও তাদের রেখে যাওয়া জীবাশ্ম আজও বিজ্ঞানীদের সামনে কোটি বছরের পুরোনো সমুদ্রজগতের অসাধারণ ইতিহাস উন্মোচন করে চলেছে।

মেগালোডন শুধু একটি বিশাল হাঙর নয়, বরং পৃথিবীর সামুদ্রিক ইতিহাসের অন্যতম বিস্ময়কর প্রাণী। নতুন গবেষণায় প্রমাণ মিলেছে যে তারা প্রায় ৮০ ফুট দীর্ঘ, শক্তিশালী এবং বৈচিত্র্যময় খাদ্যাভ্যাসসম্পন্ন শিকারি ছিল। একই সঙ্গে তাদের দীর্ঘ জীবনকাল এবং শিকারি দক্ষতা প্রাগৈতিহাসিক সমুদ্রের পরিবেশ সম্পর্কে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি প্রদান করছে।

ভবিষ্যতে আরও জীবাশ্ম আবিষ্কার এবং আধুনিক প্রযুক্তির সহায়তায় গবেষণা এগিয়ে গেলে, পৃথিবীর ইতিহাসের এই কিংবদন্তি সামুদ্রিক দৈত্য সম্পর্কে আরও চমকপ্রদ তথ্য সামনে আসবে বলেই বিজ্ঞানীরা আশা করছেন।