নিজস্ব প্রতিবেদক, নিউজ বাংলা : জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে অংশগ্রহণ শেষে দেশের উদ্দেশে নিউইয়র্ক ত্যাগ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। পাঁচ দিনের যুক্তরাষ্ট্র সফর শেষ করে স্থানীয় সময় শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর) রাত ১১টা ৩৫ মিনিটে প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর সফরসঙ্গীদের বহনকারী এমিরেটস এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইট জন এফ কেনেডি (জেএফকে) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হয়।
এই সফরে প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি বিশ্বনেতা, সরকারপ্রধান এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। সফরের বিভিন্ন কর্মসূচিতে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং বৈশ্বিক বিভিন্ন সংকটের বিষয় উঠে আসে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গত ২১ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে যোগ দিতে নিউইয়র্কে পৌঁছান। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এটি ছিল জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে তাঁর প্রথম অংশগ্রহণ।
নিউইয়র্কে পৌঁছানোর পর থেকেই তাঁর কর্মসূচি ছিল ব্যস্ত। জাতিসংঘ সদর দপ্তরে বিভিন্ন উচ্চপর্যায়ের অনুষ্ঠান, সাধারণ পরিষদের কার্যক্রম এবং দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে অংশ নেন তিনি। বিশ্বনেতাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ ও আলোচনার মাধ্যমে বাংলাদেশের বিভিন্ন অগ্রাধিকার ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সাধারণ বিতর্কে ২৪ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশের পক্ষে বাংলায় ভাষণ দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এটি ছিল প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাঁর প্রথম জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ভাষণ।
ভাষণে বাংলাদেশ ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের কথা তুলে ধরেন তিনি। বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠা, বহুপক্ষীয় সহযোগিতা, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং রোহিঙ্গা সংকটসহ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো তাঁর বক্তব্যে স্থান পায়।
এ ছাড়া রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে জনগণের ক্ষমতায়ন এবং সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করার মাধ্যমে একটি সমৃদ্ধ, স্বনির্ভর ও কল্যাণমুখী গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্য তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।
নিউইয়র্ক সফরে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির বিষয়টিও গুরুত্ব পায়। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর সমস্যাকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আরও গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টি আলোচনায় আসে।
বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরেই জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ওপর গুরুত্ব দিয়ে আসছে। এবারের জাতিসংঘ অধিবেশনেও এ বিষয়টি বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার হিসেবে উঠে আসে।
জাতিসংঘের বিভিন্ন কর্মসূচি ও বৈঠকে রোহিঙ্গা সংকট নিয়েও আলোচনা করেন প্রধানমন্ত্রী। মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের দীর্ঘস্থায়ী সংকটের সমাধান এবং নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে এই সংকট মোকাবিলায় সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়। জাতিসংঘের মতো বহুপক্ষীয় প্ল্যাটফর্মে রোহিঙ্গা সংকট তুলে ধরা বাংলাদেশের কূটনৈতিক প্রচেষ্টার অন্যতম অংশ।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন দেশের সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধান এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। এসব আলোচনায় দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদার, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি, অর্থনৈতিক সহযোগিতা, উন্নয়ন এবং পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়।
সফরের সময় ক্রোয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আন্দ্রেই প্লেনকোভিচ, থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী আনুতিন চার্নভিরাকুলসহ বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী। এসব বৈঠকে অর্থনৈতিক সহযোগিতা, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, দক্ষ জনশক্তি, শিক্ষা ও প্রযুক্তিসহ বিভিন্ন খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয় উঠে আসে।
নিউইয়র্ক সফরে জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসসহ আন্তর্জাতিক পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী। এসব বৈঠকে বাংলাদেশের বিভিন্ন স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়।
এ ছাড়া জাতিসংঘ মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ভলকার তুর্কসহ আন্তর্জাতিক সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গেও প্রধানমন্ত্রীর যোগাযোগ ও বৈঠক হয়।
সফরের বিভিন্ন পর্যায়ে কুয়েতের ক্রাউন প্রিন্স, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের উপ-প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেন তারেক রহমান।
বিশেষ করে ২৫ সেপ্টেম্বর সংযুক্ত আরব আমিরাতের উপ-প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ আবদুল্লাহ বিন জায়েদ আল নাহিয়ানের সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশ-ইউএই সম্পর্ক আরও জোরদারের উপায় নিয়ে আলোচনা হয়।
প্রধানমন্ত্রীর নিউইয়র্ক সফর শুধু জাতিসংঘের সাধারণ বিতর্কে অংশগ্রহণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। বিভিন্ন উচ্চপর্যায়ের অনুষ্ঠান, দ্বিপক্ষীয় বৈঠক এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ের আলোচনায় অংশ নেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদি আমিনের তথ্য অনুযায়ী, নিউইয়র্ক সফরে তারেক রহমান মোট ৩০টি সরকারি কর্মসূচিতে অংশ নেন এবং ১১টি দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেন।
এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের সঙ্গে বিভিন্ন দেশের সম্পর্ক, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ এবং পারস্পরিক সহযোগিতার বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করার সুযোগ তৈরি হয়।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে বাংলাদেশের বক্তব্যে উন্নয়নশীল দেশগুলোর স্বার্থ সংরক্ষণের বিষয়টিও গুরুত্ব পায়। প্রধানমন্ত্রী টেকসই উন্নয়নের জন্য অর্থায়ন, বাজারে প্রবেশাধিকার, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং সক্ষমতা বৃদ্ধির মতো বিষয়ের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
বিশেষ করে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশের জন্য ধারাবাহিক আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরা হয়।
পাঁচ দিনের যুক্তরাষ্ট্র সফর শেষ করে শুক্রবার রাতে নিউইয়র্ক থেকে দেশের উদ্দেশে রওনা হন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তাঁর সফরসঙ্গীরা।


