নিউজ বাংলা, আন্তর্জাতিক ডেক্স : জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে যোগ দিতে ২১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে যান বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সরকার প্রধান হিসেবে জাতিসংঘে এটিই ছিল তাঁর প্রথম অংশগ্রহণ। ২৫ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্ক থেকে দেশের উদ্দেশে রওনা হওয়ার আগে চার দিনের কর্মসূচিতে তিনি জাতিসংঘের বিভিন্ন আয়োজন, দ্বিপক্ষীয় বৈঠক, বিনিয়োগসংক্রান্ত আলোচনা এবং রোহিঙ্গা ও জলবায়ু ইস্যুতে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরেন।
সফরের সময় বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বোয়িং কোম্পানির আরও ১১টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি এবং শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক সহযোগিতা নিয়ে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের খবরও সামনে আসে। পাশাপাশি শেখ হাসিনা ও বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক নিয়েও মার্কিন অবস্থানসংক্রান্ত বক্তব্য আলোচনায় আসে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ২৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সাধারণ বিতর্ক পর্বে বাংলায় বক্তব্য দেন। তাঁর ভাষণে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক যাত্রা, আইনের শাসন, জবাবদিহি, বিশ্বশান্তি, জলবায়ু পরিবর্তন, অর্থনৈতিক সহযোগিতা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং রোহিঙ্গা সংকটের মতো বিষয় উঠে আসে।
তিনি জাতিসংঘকে সমঝোতাভিত্তিক বিশ্বব্যবস্থার কেন্দ্র হিসেবে দেখার কথা বলেন। বিভিন্ন সংঘাতের সমাধানে আলোচনা, কূটনৈতিক প্রক্রিয়া ও পারস্পরিক সহযোগিতার ওপর গুরুত্ব দেন।
এটি নতুন সরকারের জন্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের অগ্রাধিকার তুলে ধরারও একটি সুযোগ ছিল। সফরের আগে পররাষ্ট্রসচিব জানিয়েছিলেন, প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রত্যাশা তুলে ধরা হবে।
প্রধানমন্ত্রীর নিউইয়র্ক সফরে ১১টি দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চার দিনের সফরে জাতিসংঘ-সংশ্লিষ্ট আটটি কর্মসূচি, চারটি উচ্চপর্যায়ের অনুষ্ঠান এবং ১১টি দ্বিপক্ষীয় বৈঠকসহ মোট ৩০টি আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি ছিল।
এসব আলোচনায় বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থের পাশাপাশি বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, জনশক্তি রপ্তানি, জ্বালানি নিরাপত্তা, আঞ্চলিক সহযোগিতা, স্বাস্থ্য, জলবায়ু এবং রোহিঙ্গা সংকট গুরুত্ব পেয়েছে।
কুয়েতের ক্রাউন প্রিন্স, সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের উপপ্রধানমন্ত্রীর সঙ্গেও প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক হয়েছে। এসব আলোচনায় জ্বালানি, খনিজ সম্পদ, জনশক্তি রপ্তানি ও বাংলাদেশে বিনিয়োগ বাড়ানোর মতো বিষয় উঠে আসে।
তারেক রহমানের সফরে রোহিঙ্গা সংকট অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে উঠে আসে। বাংলাদেশ ও গাম্বিয়ার যৌথ আয়োজনে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
সেখানে রোহিঙ্গাদের দীর্ঘস্থায়ী বাস্তুচ্যুতির অবসান এবং টেকসই সমাধানের জন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। প্রধানমন্ত্রী সংকট সমাধানে একাধিক প্রস্তাব তুলে ধরেন।
তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সতর্ক করে বলেন, রোহিঙ্গা সংকট শুধু মানবিক সমস্যা নয়, এটি ভবিষ্যতে পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তার জন্যও চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।
সফরের আগে এবং পরে সরকারের বিভিন্ন বক্তব্যেও রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতা পাওয়ার বিষয়টি গুরুত্ব পায়।
জাতিসংঘের বিভিন্ন কর্মসূচিতেও জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টি গুরুত্ব পায়। প্রধানমন্ত্রী জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরেন।
জলবায়ু অর্থায়ন, অভিযোজন, প্রযুক্তি হস্তান্তর, ক্ষয়ক্ষতি এবং জলবায়ু ন্যায়বিচারের মতো বিষয় আলোচনায় আসে। ‘ক্লাইমেট অ্যাকশন অ্যান্ড দ্য জাস্ট ট্রানজিশন’ শীর্ষক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকেও তিনি অংশ নেন।
বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর জন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানোর দাবি জানিয়ে আসছে। ফলে নিউইয়র্ক সফরেও বিষয়টি সরকারের কূটনৈতিক অগ্রাধিকারের অংশ ছিল।
তারেক রহমানের যুক্তরাষ্ট্র সফরের সময় সবচেয়ে আলোচিত অর্থনৈতিক খবরগুলোর একটি ছিল বোয়িংয়ের সঙ্গে বাংলাদেশের ১১টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি।
প্রধানমন্ত্রী নিজে চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন না। তবে সফরের সময় চুক্তিটি হওয়ায় বিষয়টি তাঁর যুক্তরাষ্ট্র সফরের অন্যতম আলোচিত ঘটনা হয়ে ওঠে।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের বিমান পরিবহন খাত সম্প্রসারণের প্রয়োজন বিবেচনায় নিয়ে নতুন উড়োজাহাজ কেনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এর আগে চলতি বছরের ৩০ এপ্রিল রাষ্ট্রায়ত্ত বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের সঙ্গে বোয়িংয়ের ১৪টি উড়োজাহাজ কেনার বিষয়ে একটি চুক্তির খবর প্রকাশিত হয়েছিল। ফলে নতুন ১১টি উড়োজাহাজ যুক্ত হলে বিমানবহর সম্প্রসারণের পরিকল্পনা আরও এগিয়ে যাবে।
তবে এত বড় অঙ্কের উড়োজাহাজ কেনার সিদ্ধান্ত নিয়ে অর্থনৈতিক দিক থেকে প্রশ্নও উঠেছে। বিশেষ করে দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ এবং অন্যান্য ব্যয়ের সঙ্গে এই বিনিয়োগ কীভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে এ নিয়ে আলোচনা রয়েছে।
সফরের শেষ পর্যায়ে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্র শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক সহযোগিতা বাড়াতে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেছে।
বাংলাদেশের পক্ষে প্রধানমন্ত্রীর টেলিযোগাযোগ ও আইসিটি বিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসাদ এবং যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, জ্বালানি ও পরিবেশবিষয়ক আন্ডার সেক্রেটারি জ্যাকব হেলবার্গ এতে স্বাক্ষর করেন।
বাংলাদেশে রাশিয়ার সহযোগিতায় রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের কাজ চলমান। এই বাস্তবতায় শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক প্রযুক্তি ও সহযোগিতার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতাটি গুরুত্বপূর্ণ একটি কূটনৈতিক ঘটনা হিসেবে আলোচনায় এসেছে।
তবে এটিও মনে রাখা প্রয়োজন, সমঝোতা স্মারক কোনো নির্দিষ্ট প্রকল্প বাস্তবায়নের চূড়ান্ত চুক্তি নয়। এর পরবর্তী বাস্তবায়ন নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর পরবর্তী সিদ্ধান্ত ও প্রক্রিয়ার ওপর।
তারেক রহমানের নিউইয়র্ক সফরের সময় শেখ হাসিনা প্রসঙ্গও আলোচনায় আসে। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের একটি ‘অন-ব্যাকগ্রাউন্ড’ ব্রিফিংয়ে এক কর্মকর্তা বলেন, শেখ হাসিনার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র কোনো আনুষ্ঠানিক অবস্থান নেয়নি।
বিভিন্ন বাংলাদেশি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে ওই কর্মকর্তার বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র আশা করে বাংলাদেশ ও ভারত নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে বিষয়টির সমাধানে পৌঁছাবে।
অর্থাৎ, সফরের সময় বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বিষয়ও আন্তর্জাতিক আলোচনার মধ্যে ছিল।
সফরে অর্থনৈতিক কূটনীতিও গুরুত্ব পেয়েছে। প্রধানমন্ত্রী ওয়াল স্ট্রিটের বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে বৈঠক করেন। সেখানে বাংলাদেশে বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগের সুযোগ এবং বিনিয়োগ বাড়ানোর সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয় বলে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন জানিয়েছেন।
এ ছাড়া বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্টসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী। এসব আলোচনায় বাংলাদেশের উন্নয়ন, অর্থনীতি এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার বিভিন্ন দিক উঠে আসে।
সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়ানো এবং জনগণের সঙ্গে জনগণের যোগাযোগ আরও জোরদার করার লক্ষ্যেও বৈঠকগুলোতে আলোচনা হয়েছে।
নিউইয়র্ক সফরে প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘ মহাসচিব, বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট, মিয়ানমারবিষয়ক জাতিসংঘ মহাসচিবের বিশেষ দূত, জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থার হাইকমিশনার এবং জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের সঙ্গে বৈঠক করেন।
বাংলাদেশে মানবাধিকার, আইনের শাসন, গণতন্ত্র এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মতো বিষয়ও এসব আলোচনায় এসেছে বলে মাহদী আমিন জানিয়েছেন।
সরকারের হিসাব অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রীর নিউইয়র্ক সফরে ৩০টি আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি ছিল। এর মধ্যে ছিল জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদকেন্দ্রিক আয়োজন, উচ্চপর্যায়ের বৈঠক, দ্বিপক্ষীয় আলোচনা এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক।
মাহদী আমিনের ভাষ্য অনুযায়ী, ছোট একটি প্রতিনিধিদল নিয়ে সফরে সময়ের সর্বোচ্চ ব্যবহার করার চেষ্টা করা হয়েছে এবং প্রতিটি কর্মসূচিতে বাংলাদেশের স্বার্থকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর স্ত্রী জুবাইদা রহমানও কয়েকটি উচ্চপর্যায়ের আন্তর্জাতিক কর্মসূচিতে অংশ নেন এবং কয়েকটিতে বক্তব্য দেন বলে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
সাবেক কূটনীতিকদের কেউ কেউ মনে করছেন, সরকার গঠনের পর এটি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম বড় আন্তর্জাতিক সফর হওয়ায় এর আলাদা গুরুত্ব রয়েছে।
তাদের মতে, জাতিসংঘের মূল অধিবেশন, সাইডলাইন বৈঠক এবং দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় বাংলাদেশের রোহিঙ্গা সংকট, জলবায়ু পরিবর্তন, অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রয়োজন তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
তবে সফরের ঘোষিত লক্ষ্য কতটা বাস্তব ফল দিয়েছে, তা এখনই চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করা কঠিন। কারণ অনেক আলোচনার ফলাফল দীর্ঘমেয়াদি কূটনৈতিক যোগাযোগ, বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত ও পরবর্তী চুক্তির মাধ্যমে স্পষ্ট হবে।
তথ্য সূত্র: বিবিসি বাংলা



