বাংলাদেশের রাজনীতির অন্যতম পরিচিত মুখ, সাবেক মন্ত্রী ও প্রবীণ রাজনীতিবিদ তোফায়েল আহমেদ আর নেই। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে দেশের গুরুত্বপূর্ণ নানা আন্দোলন-সংগ্রামে নেতৃত্ব দেওয়া এই বর্ষীয়ান নেতা সোমবার (১ জুন) বিকেলে রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮২ বছর।
পরিবারের সদস্য ও হাসপাতাল সূত্র জানায়, দীর্ঘদিন ধরে তিনি বার্ধক্যজনিত বিভিন্ন শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন। প্যারালাইসিসসহ নানা স্বাস্থ্য সমস্যার কারণে তার শারীরিক অবস্থা ক্রমেই অবনতি হচ্ছিল। গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে নিবিড় চিকিৎসা ও পর্যবেক্ষণের মধ্যে রাখা হলেও শেষ পর্যন্ত তাকে আর সুস্থ করে তোলা সম্ভব হয়নি।
চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে দীর্ঘ সময় হাসপাতালে থাকার পর সোমবার বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এবং পরিবারের পক্ষ থেকে তার মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে।
তোফায়েল আহমেদের জামাতা ডা. তৌহিদুজ্জামান তুহিন জানান, চিকিৎসাধীন অবস্থায় হাসপাতালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তার মৃত্যুতে পরিবার, স্বজন, রাজনৈতিক সহকর্মী এবং শুভানুধ্যায়ীদের মধ্যে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
তোফায়েল আহমেদ ছিলেন বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনের একটি সুপরিচিত নাম। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হন এবং ধীরে ধীরে জাতীয় পর্যায়ে নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করেন। বিশেষ করে ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থানে তার সক্রিয় ও সাহসী ভূমিকা তাকে দেশব্যাপী পরিচিতি এনে দেয়।
১৯৬৭ থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু)-এর সহ-সভাপতি (ভিপি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সে সময় ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক হিসেবে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং স্বাধিকার আন্দোলনের বিভিন্ন কর্মসূচিতে তার নেতৃত্ব রাজনৈতিক অঙ্গনে তাকে একটি শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে যায়।
১৯৪৩ সালের ২২ অক্টোবর ভোলা সদর উপজেলার দক্ষিণ দিঘলদী ইউনিয়নের কোড়ালিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তোফায়েল আহমেদ। গ্রামবাংলার সাধারণ পরিবেশে বেড়ে ওঠা এই মানুষটি পরবর্তীতে দেশের জাতীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব বিস্তার করেন।
শিক্ষাজীবন শেষ করার পর তিনি সক্রিয়ভাবে রাজনীতিতে যুক্ত হন। তার সাংগঠনিক দক্ষতা, বক্তৃতা দেওয়ার ক্ষমতা এবং জনসম্পৃক্ততা তাকে দ্রুত জনপ্রিয় করে তোলে। রাজনৈতিক জীবনের প্রতিটি ধাপে তিনি নেতৃত্বগুণের স্বাক্ষর রেখে গেছেন।
১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে মাত্র ২৭ বছর বয়সে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন তোফায়েল আহমেদ। তরুণ বয়সেই জাতীয় পর্যায়ের রাজনীতিতে প্রবেশ করে তিনি নিজের রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও নেতৃত্বের পরিচয় দেন।
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের রাজনীতিতেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে তিনি নয়বার জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হন, যা তার জনপ্রিয়তা এবং রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতার অন্যতম প্রমাণ।
রাজনৈতিক জীবনে একাধিকবার তিনি মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন। বিভিন্ন সময়ে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব সামলানোর মাধ্যমে প্রশাসনিক দক্ষতার পরিচয় দেন। দেশের অর্থনীতি, বাণিজ্য এবং উন্নয়নসংক্রান্ত নানা কর্মকাণ্ডে তার সম্পৃক্ততা ছিল উল্লেখযোগ্য।
দীর্ঘ অভিজ্ঞতা এবং রাজনৈতিক বিচক্ষণতার কারণে তিনি দেশের রাজনৈতিক মহলে একজন জ্যেষ্ঠ ও সম্মানিত ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিত ছিলেন। বিভিন্ন জাতীয় ইস্যুতে তার মতামত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচিত হতো।
তোফায়েল আহমেদের মৃত্যুতে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে গভীর শোক নেমে এসেছে। রাজনৈতিক মতভেদ থাকলেও বিভিন্ন দলের নেতা-কর্মীরা তার দীর্ঘ রাজনৈতিক অবদানকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছেন।
সহকর্মীরা বলছেন, তিনি ছিলেন একজন অভিজ্ঞ রাজনীতিক, যিনি বাংলাদেশের রাজনীতির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের প্রত্যক্ষ সাক্ষী। ছাত্র আন্দোলন থেকে শুরু করে জাতীয় রাজনীতির নানা বাঁকবদলে তার উপস্থিতি ছিল দৃশ্যমান।
মৃত্যুকালে তোফায়েল আহমেদ এক মেয়েসহ অসংখ্য আত্মীয়-স্বজন, শুভানুধ্যায়ী এবং রাজনৈতিক সহকর্মী রেখে গেছেন। তার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন, নেতৃত্ব এবং দেশের প্রতি অবদান ভবিষ্যত প্রজন্মের কাছে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে তোফায়েল আহমেদের নাম একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হবে। ছাত্রনেতা থেকে জাতীয় নেতা হয়ে ওঠার তার যাত্রা নতুন প্রজন্মের রাজনীতিবিদদের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে। তার মৃত্যুতে দেশের রাজনীতি হারাল এক অভিজ্ঞ ও প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বকে, যার অবদান দীর্ঘদিন স্মরণ করবে বাংলাদেশ।

