সর্বাধিক পঠিত

spot_img

সর্বশেষ আপডেট...

Homeবিশ্ব সংবাদহরমুজ প্রণালি খুলতে ইরানের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান ট্রাম্পের

হরমুজ প্রণালি খুলতে ইরানের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান ট্রাম্পের

ট্রাম্পের দাবি, ইরান বর্তমানে অর্থনৈতিকভাবে চাপে রয়েছে এবং হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতির কারণে তাদের ওপর সেই চাপ আরও বেড়েছে। একই সঙ্গে তিনি জানান, যুক্তরাষ্ট্র হরমুজের পরিস্থিতির ওপর বড় ধরনের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে বলে তিনি মনে করেন।

নিউজ বাংলা,আন্তর্জাতিক ডেক্স : মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের মধ্যে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য হরমুজ প্রণালি সাত দিনের মধ্যে পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়ে ইরানের দেওয়া প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। শনিবার হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় তিনি জানান, তেহরানের প্রস্তাব তার কাছে গ্রহণযোগ্য নয়।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি অবশ্য জানিয়েছেন, তেহরান এখনো যুক্তরাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক জবাবের অপেক্ষায় রয়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ হলে হরমুজ প্রণালিতে স্বাভাবিক নৌ চলাচল সাত দিনের মধ্যেই ফিরিয়ে আনা সম্ভব।

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনকে কেন্দ্র করে নিউইয়র্কে অবস্থানকালে আরাঘচি জানান, ইরান যুক্তরাষ্ট্রের কাছে একটি সমঝোতার প্রস্তাব দিয়েছে। কাতারের মাধ্যমে ওই প্রস্তাব ওয়াশিংটনের কাছে পৌঁছানো হয়েছে বলে জানা যায়।

আরাঘচির বক্তব্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিলে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া এবং স্বাভাবিক বাণিজ্যিক নৌ চলাচল ফিরিয়ে আনা সম্ভব। তিনি দাবি করেন, ওয়াশিংটনকে যে পদক্ষেপ নিতে হবে, সেগুলো নতুন কোনো শর্ত নয়; জুনে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকেই সেগুলোর উল্লেখ রয়েছে।

ইরানের পক্ষ থেকে প্রস্তাবটি এমন সময়ে দেওয়া হয়েছে, যখন গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথে জাহাজ চলাচল ব্যাপকভাবে কমে গেছে এবং সংঘাতের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

ইরানের প্রস্তাব সম্পর্কে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, তিনি তেহরানের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ইরান দ্রুত হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার জন্য একটি চুক্তিতে যেতে চাইছে।

ট্রাম্পের দাবি, ইরান বর্তমানে অর্থনৈতিকভাবে চাপে রয়েছে এবং হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতির কারণে তাদের ওপর সেই চাপ আরও বেড়েছে। একই সঙ্গে তিনি জানান, যুক্তরাষ্ট্র হরমুজের পরিস্থিতির ওপর বড় ধরনের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে বলে তিনি মনে করেন।

তবে ট্রাম্পের মন্তব্যের পরও ইরানের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তারা যুক্তরাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক অবস্থান জানার অপেক্ষায় থাকবে। আরাঘচি ট্রাম্পের বক্তব্যের কিছু অংশকে পরস্পরবিরোধী বলেও মন্তব্য করেছেন।

হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ। পারস্য উপসাগর থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও গ্যাস পরিবহনের ক্ষেত্রে এই জলপথের গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি।

স্বাভাবিক সময়ে বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাস সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই পথ দিয়ে পরিবহন করা হয়। ফলে দীর্ঘ সময় ধরে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত হলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে তার প্রভাব পড়তে পারে।

বর্তমান সংঘাতের কারণে প্রণালিটিতে জাহাজ চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে কেপলারের তথ্যের ভিত্তিতে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক ১০ দিনে গড়ে প্রতিদিন প্রায় ১৮টি জাহাজ হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে। কোনো কোনো দিনে এই সংখ্যা নেমে এসেছে মাত্র ৯টিতে।

হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের জন্য সরাসরি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই জলপথে তেলবাহী জাহাজের চলাচল বাধাগ্রস্ত হলে সরবরাহ নিয়ে বাজারে উদ্বেগ তৈরি হয়।

এরই মধ্যে হরমুজকে ঘিরে বিভিন্ন কূটনৈতিক তৎপরতার খবর প্রকাশের পর আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দামে ওঠানামা দেখা গেছে। সংঘাতের ভবিষ্যৎ গতিপথ এবং প্রণালিতে বাণিজ্যিক নৌ চলাচল কতটা স্বাভাবিক হবে এসব বিষয় বাজারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

ইরানের প্রস্তাবের সঙ্গে জুনে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের বিষয়টি বারবার সামনে আসছে। আরাঘচির বক্তব্য অনুযায়ী, ওই সমঝোতায় সংঘাত কমানো, সামরিক অভিযান বন্ধ করা এবং হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচল পুনরুদ্ধারের মতো বিষয় ছিল।

এ ছাড়া ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা ও সামরিক অবরোধসহ বিভিন্ন বিষয়ও আলোচনার অংশ ছিল বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে ওই সমঝোতার পর পরিস্থিতি স্থায়ীভাবে শান্ত হয়নি। পরবর্তী সময়ে আবারও হামলা ও পাল্টা হামলা শুরু হওয়ায় সমঝোতার কাঠামো কার্যত ভেঙে পড়ে। এ কারণেই আগের সমঝোতা পুনরায় কার্যকর করা নিয়ে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে বড় পার্থক্য রয়েছে।

হরমুজ প্রণালি পুনরায় খোলার পাশাপাশি ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার অন্যতম বড় বিষয়।

ট্রাম্প প্রশাসন বারবার বলেছে, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখাই ওয়াশিংটনের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। অন্যদিকে তেহরান চায় সামরিক চাপ ও অর্থনৈতিক অবরোধ কমানোর পাশাপাশি আলোচনার মাধ্যমে সমাধান বের করতে।

সাম্প্রতিক সময়ে দুই পক্ষের মধ্যে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে যোগাযোগের খবর এলেও কোনো চূড়ান্ত সমঝোতায় পৌঁছানো যায়নি। রয়টার্স জানিয়েছে, ইরান হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক চাপ ও ইরানি বন্দরের ওপর অবরোধ কমানোর বিষয়টি সামনে এনেছে।

হরমুজ প্রণালির সংকটের সঙ্গে ইয়েমেনের হুথি গোষ্ঠীর কর্মকাণ্ডও মধ্যপ্রাচ্যের সামুদ্রিক নিরাপত্তাকে আরও জটিল করে তুলেছে।

সৌদি আরবের বিরুদ্ধে হুথিদের হামলা এবং লোহিত সাগরকেন্দ্রিক সামুদ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ফলে শুধু হরমুজ নয়, মধ্যপ্রাচ্যের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সতর্কতা বেড়েছে।

রয়টার্স জানিয়েছে, সৌদি আরবের দিকে হুথিদের হামলার প্রেক্ষাপটে রিয়াদ যুক্তরাষ্ট্রের কাছে সামরিক সহায়তা চেয়েছে। একই সময়ে উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলো আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার উপায় নিয়েও আলোচনা করছে।

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে দেওয়া বক্তব্যে ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন, নভেম্বরের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানের সঙ্গে একটি সমঝোতার সম্ভাবনা থাকতে পারে। তবে একই সময়ে তিনি ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথাও বলেছেন।

এতে বোঝা যাচ্ছে, ওয়াশিংটনের অবস্থান এখনো পুরোপুরি কূটনৈতিক সমাধানের দিকে স্থির হয়নি। একদিকে আলোচনার সম্ভাবনা উন্মুক্ত রাখার কথা বলা হচ্ছে, অন্যদিকে ইরানের ওপর চাপ বজায় রাখার অবস্থানও প্রকাশ করা হচ্ছে।

অন্যদিকে আরাঘচি বলেছেন, ধ্বংসের হুমকি দিয়ে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। ইরানের পক্ষ থেকে আলোচনার দরজা খোলা রাখার বার্তা দেওয়া হলেও তারা যুক্তরাষ্ট্রের বাস্তব পদক্ষেপের দিকে তাকিয়ে আছে।

ট্রাম্প ইরানের সাত দিনের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা আপাতত কাটেনি। ইরান বলছে, প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ হলে তারা দ্রুত নৌ চলাচল স্বাভাবিক করতে প্রস্তুত। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সেই শর্ত মেনে নেওয়ার বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সমঝোতা হয়নি।

এই পরিস্থিতিতে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল, আন্তর্জাতিক তেলের বাজার এবং মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক পরিস্থিতি তিনটি বিষয়ই পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে গেছে। কূটনৈতিক আলোচনা নতুন করে শুরু হয় কি না এবং দুই পক্ষ আগের সমঝোতার কাঠামোতে ফিরতে পারে কি না, সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

হরমুজ প্রণালি দিয়ে আন্তর্জাতিক জ্বালানি পরিবহনের বড় একটি অংশ হওয়ায় সংকট দীর্ঘ হলে এর প্রভাব শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। বিশ্ববাজার, জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সব ক্ষেত্রেই এর প্রভাব পড়তে পারে।

তথ্য সূত্র: বিবিসি বাংলা

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

জনপ্রিয় সংবাদ