সর্বাধিক পঠিত

spot_img

সর্বশেষ আপডেট...

Homeবিশ্ব সংবাদইন্ডিয়া নিউজমতানৈক্য থাকলেও বিবাদ নয়, মোদী-শি জিন পিংয়ের বৈঠকে নতুন বার্তা

মতানৈক্য থাকলেও বিবাদ নয়, মোদী-শি জিন পিংয়ের বৈঠকে নতুন বার্তা

ব্রিক্‌সের অষ্টাদশ শীর্ষ সম্মেলনে ১১ সদস্য দেশের সম্মতিতে যৌথ ঘোষণাপত্র গৃহীত হয়। ঘোষণাপত্রে একতরফা শুল্ক আরোপের সমালোচনা করা হয়েছে। কোনো দেশের নাম উল্লেখ না থাকলেও আন্তর্জাতিক মহলে মনে করা হচ্ছে, এই বার্তার মূল লক্ষ্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্কনীতি।

রাহুল রাহা, এনবি সংবাদ, দিল্লি থেকে : ভারত ও চিনের সম্পর্কে গত কয়েক বছরে তৈরি হওয়া দূরত্ব ধীরে ধীরে কমছে। সীমান্ত নিয়ে মতপার্থক্য এখনও রয়েছে। তবে সেই মতপার্থক্য যেন কোনোভাবেই বিবাদে রূপ না নেয়, সে বিষয়ে একমত হয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। দিল্লিতে ব্রিক্‌স সম্মেলনের ফাঁকে দুই রাষ্ট্রনেতার বৈঠকে উঠে এসেছে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক উন্নয়ন, সীমান্তে শান্তি এবং কৌশলগত সহযোগিতার বিষয়।

অন্যদিকে, ব্রিক্‌সের যৌথ ঘোষণাপত্রে নাম উল্লেখ না করে একতরফা শুল্কনীতি ও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার সমালোচনা করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক মহলের মতে, এই বার্তার নিশানায় রয়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বাণিজ্যনীতি।

গলওয়ান সংঘাতের পর ভারত সফরে এসে চিনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বৈঠক ঘিরে আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছিল। সাম্প্রতিক সময়ে বেজিংয়ের পক্ষ থেকে নয়াদিল্লির সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের আগ্রহ প্রকাশ করা হয়েছে। ফলে দিল্লির এই বৈঠক দুই দেশের ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।

বৈঠকে শি জিনপিং ভারত ও চিনের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি এবং কৌশলগত সম্পর্ক গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন। দুই দেশের পারস্পরিক শক্তি ও সক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে যৌথ উন্নয়নের পথে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

চিনা প্রেসিডেন্টের মতে, ব্রিক্‌সের সামগ্রিক বিকাশের জন্যও ভারত ও চিনের মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানো প্রয়োজন। দুই দেশের স্বার্থে মতপার্থক্য থাকলেও তা যেন কখনও সংঘাতের কারণ না হয়, সেই বার্তাই উঠে এসেছে আলোচনায়।

দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের উন্নয়ন নিয়ে আলোচনা হলেও সীমান্ত পরিস্থিতির গুরুত্ব স্পষ্ট করেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। তাঁর বক্তব্য, ভারত-চিন সম্পর্ক স্বাভাবিক রাখতে সীমান্তে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি।

গলওয়ান সংঘাতের পর থেকে দুই দেশের সম্পর্কের মধ্যে যে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছিল, তা কাটিয়ে উঠতে ধারাবাহিক কূটনৈতিক উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। মোদী-শি বৈঠক সেই প্রক্রিয়াকে আরও এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি করেছে বলে মনে করছেন কূটনৈতিক বিশ্লেষকেরা।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী পারস্পরিক স্বার্থ, শ্রদ্ধা ও সংবেদনশীলতার ভিত্তিতে সম্পর্ক পরিচালনার ওপর জোর দেন। তাঁর মতে, দুই দেশের মধ্যে আস্থা বজায় রাখা এবং একে অপরের উদ্বেগকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

গলওয়ান সংঘাতের পর নরেন্দ্র মোদী ও শি জিনপিংয়ের এটি তৃতীয় মুখোমুখি বৈঠক। এর আগে ২০২৪ সালে রাশিয়ার কাজানে এবং ২০২৫ সালে চিনের তিয়ানজিনে দুই নেতা বৈঠকে বসেছিলেন।

২০২৪ সালের কাজান বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী মোদী দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে পারস্পরিক বিশ্বাস, শ্রদ্ধা ও সংবেদনশীলতার গুরুত্ব তুলে ধরেছিলেন। দিল্লির বৈঠকেও সেই নীতির ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, দুই দেশের মধ্যে সীমান্ত সমস্যা পুরোপুরি মিটে না গেলেও নিয়মিত শীর্ষ পর্যায়ের বৈঠক সম্পর্কের উত্তেজনা কমাতে সাহায্য করতে পারে। বিশেষ করে এশিয়ার দুই বড় শক্তির মধ্যে সহযোগিতা বাড়লে আঞ্চলিক অর্থনীতি ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও তার প্রভাব পড়তে পারে।

আমেরিকা ও চিনের মধ্যে শুল্ক-সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে ভারতের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক উন্নয়নে আরও আগ্রহী হয়েছে বেজিং। এশিয়ার দুই শক্তিধর দেশকে বোঝাতে চিনের পক্ষ থেকে প্রায়ই ‘ড্রাগন’ ও ‘হাতি’ উপমা ব্যবহার করা হয়।

চিনের বক্তব্য, ভারত ও চিনের মধ্যে সহযোগিতামূলক সম্পর্ক দুই দেশের মানুষের স্বার্থেই গুরুত্বপূর্ণ। দুই দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা, বাজার এবং আঞ্চলিক প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে উন্নয়নের নতুন সুযোগ তৈরি করা সম্ভব।

দিল্লির বৈঠকে শি জিনপিংয়ের যৌথ উন্নয়নের আহ্বান এবং মোদীর সম্পর্ক উন্নয়নের বার্তা সেই সম্ভাবনাকেই সামনে এনেছে। তবে সীমান্তে শান্তি বজায় রাখা এবং পারস্পরিক আস্থা তৈরি করাই যে সম্পর্কের মূল ভিত্তি, তা স্পষ্ট করেছে ভারত।

দিল্লিতে অনুষ্ঠিত ব্রিক্‌সের অষ্টাদশ শীর্ষ সম্মেলনে ১১ সদস্য দেশের সম্মতিতে যৌথ ঘোষণাপত্র গৃহীত হয়। ঘোষণাপত্রে একতরফা শুল্ক আরোপের সমালোচনা করা হয়েছে। কোনো দেশের নাম উল্লেখ না থাকলেও আন্তর্জাতিক মহলে মনে করা হচ্ছে, এই বার্তার মূল লক্ষ্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্কনীতি।

গত এক বছরে বিভিন্ন দেশের পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা শুল্ক আরোপ নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ব্রিক্‌সের ঘোষণাপত্রে এ ধরনের পদক্ষেপের বিরোধিতা করা হয়েছে।

বাণিজ্যনীতির ক্ষেত্রে বহুপাক্ষিক সহযোগিতা এবং ন্যায্য অর্থনৈতিক পরিবেশের ওপর জোর দিয়েছে এই জোট। সদস্য দেশগুলোর মতে, একতরফা অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত বিশ্ববাণিজ্য ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

শুধু শুল্কনীতি নয়, কোনো দেশের ওপর অন্য দেশের একতরফা অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধেও অবস্থান নিয়েছে ব্রিক্‌স। ঘোষণাপত্রে বলা হয়েছে, এ ধরনের নিষেধাজ্ঞা সংশ্লিষ্ট দেশের উন্নয়ন, খাদ্যসুরক্ষা, স্বাস্থ্য ও মানবাধিকারের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে।

ইরানকে ঘিরে সাম্প্রতিক মার্কিন নিষেধাজ্ঞার হুমকির প্রেক্ষাপটে এই বার্তা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। ব্রিক্‌সের অন্যতম সদস্য ইরান। ফলে সদস্য দেশের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের বিরোধিতা জোটের ঘোষণাপত্রে গুরুত্ব পেয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।

তবে ঘোষণাপত্রে কোনো নির্দিষ্ট দেশের নাম উল্লেখ না করেই অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে অবস্থান জানানো হয়েছে।

ব্রিক্‌সের যৌথ ঘোষণাপত্রে যুদ্ধ ও সংঘাতের পরিবর্তে আলোচনা এবং কূটনৈতিক মাধ্যমে সমস্যার সমাধানের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। পশ্চিম এশিয়ার উত্তেজনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হলেও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের বিষয়ে আলাদা করে কোনো বিস্তারিত উল্লেখ করা হয়নি।

প্যালেস্টাইনের পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ জানিয়েছে ব্রিক্‌স। গাজা ভূখণ্ডে চলমান মানবিক সংকটের প্রসঙ্গ তুলে ধরে রাষ্ট্রপুঞ্জে প্যালেস্টাইনের পূর্ণ সদস্যপদের দাবির প্রতি সমর্থন জানিয়েছে জোটটি।

গত বছরের পহেলগাঁও জঙ্গি হামলারও নিন্দা জানানো হয়েছে ব্রিক্‌সের যৌথ ঘোষণাপত্রে। ভারত শুরু থেকেই দাবি করে আসছে, পাকিস্তান থেকে আসা জঙ্গিরা ওই হামলার সঙ্গে যুক্ত ছিল।

অন্যদিকে, চিন ও পাকিস্তানের মধ্যে দীর্ঘদিনের কৌশলগত সম্পর্ক রয়েছে। সেই প্রেক্ষাপটে পহেলগাঁও হামলার নিন্দা জানিয়ে যৌথ ঘোষণাপত্রে চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের স্বাক্ষরকে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন অনেকে।

ভারতের কাছে সন্ত্রাসবাদবিরোধী অবস্থান বরাবরই গুরুত্বপূর্ণ। ব্রিক্‌সের ঘোষণাপত্রে এই বিষয়ে বার্তা থাকায় আন্তর্জাতিক মঞ্চে ভারতের অবস্থান আরও জোরালো হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।

ব্রিক্‌স সম্মেলনের বক্তৃতায় রাষ্ট্রপুঞ্জের নিরাপত্তা পরিষদে সংস্কারের দাবি ফের জোরালো করেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। বহু বছর ধরে ভারত নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যপদ পাওয়ার জন্য কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালিয়ে আসছে।

মোদী বলেন, নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কারে আর দেরি করা উচিত নয়। তাঁর মতে, বর্তমান বিশ্বের বাস্তবতা ও শক্তির ভারসাম্য বিবেচনায় আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কাঠামোতে পরিবর্তন আনা প্রয়োজন।

প্রধানমন্ত্রী ব্রিক্‌সের গত দুই দশকের সাফল্যের কথাও তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্য, আন্তর্জাতিক মঞ্চে এই জোট নিজস্ব পরিচিতি তৈরি করেছে এবং আগামী দিনে আরও শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে।

ব্রিক্‌স সম্মেলনে দক্ষিণ গোলার্ধের দেশগুলোর প্রতিনিধিত্ব ও অংশগ্রহণের বিষয়েও কথা বলেন নরেন্দ্র মোদী। আন্তর্জাতিক নীতি নির্ধারণে এসব দেশের ভূমিকা আরও বাড়ানোর আহ্বান জানান তিনি।

মোদী আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাঠামোকে একটি পিরামিডের সঙ্গে তুলনা করেন। তাঁর বক্তব্য, পিরামিডের শীর্ষে থাকা দেশগুলোই অধিকাংশ সিদ্ধান্ত নেয়। অন্যদিকে, নীচের দিকে থাকা দেশগুলো সেই সিদ্ধান্তের প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

দক্ষিণ গোলার্ধের দেশগুলোতে সংকট বেশি থাকলেও আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাদের ভূমিকা তুলনামূলকভাবে কম— এমন মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী।

তিনি বলেন, ব্রিক্‌স কারও বিরুদ্ধে নয়। বরং সব দেশকে সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার নীতিতে বিশ্বাসী এই জোট।

দিল্লিতে মোদী ও শি জিনপিংয়ের বৈঠক ভারত-চিন সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিয়েছে। দুই দেশের মধ্যে সীমান্ত সমস্যা ও মতপার্থক্য এখনও রয়েছে। তবে শীর্ষ পর্যায়ের আলোচনার মাধ্যমে উত্তেজনা কমানোর চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।

একই সঙ্গে ব্রিক্‌সের ঘোষণাপত্রে একতরফা শুল্কনীতি ও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার সমালোচনা আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে জোটটির অবস্থান স্পষ্ট করেছে।

বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে যখন সংঘাত ও বাণিজ্যিক চাপ বাড়ছে, তখন ভারত-চিন সম্পর্কের উন্নয়ন এবং ব্রিক্‌সের ঐকমত্যভিত্তিক অবস্থান নতুন কূটনৈতিক সমীকরণের দিশা দেখাতে পারে।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

জনপ্রিয় সংবাদ