রাহুল রাহা,এনবি সংবাদ, আর্ন্তজাতিক ডেস্ক : আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে যখন একের পর এক সংঘাতের প্রভাব পড়ছে বিশ্ব অর্থনীতিতে, তখন দিল্লিতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের বৈঠক ঘিরে তৈরি হয়েছে নতুন কূটনৈতিক জল্পনা। জ্বালানি, প্রতিরক্ষা, বাণিজ্য এবং প্রযুক্তি—একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা হয়েছে বলে জানা যাচ্ছে।
বিশেষ করে রাশিয়া থেকে ভারতের তেল কেনা নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চাপের মধ্যেই মোদি-পুতিন বৈঠক হওয়ায় বিষয়টি আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ওয়াশিংটনের আপত্তি সত্ত্বেও মস্কোর সঙ্গে সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করার বার্তা দিয়েছে নয়াদিল্লি।
১৮তম ব্রিকস সম্মেলনকে ঘিরে আন্তর্জাতিক মহলের নজর এখন ভারতের দিকে। একদিকে পশ্চিমী দেশগুলির সঙ্গে ভারতের গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে, অন্যদিকে রাশিয়া ও চিনের সঙ্গেও নয়াদিল্লি নিজের স্বার্থ অনুযায়ী সম্পর্ক বজায় রেখে চলেছে।
এই পরিস্থিতিতে পুতিনের সঙ্গে মোদির বৈঠককে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ। কারণ, ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এবং জ্বালানি বাজারের অস্থিরতার মধ্যে ভারত কোনও একটি পক্ষের সঙ্গে পুরোপুরি অবস্থান না নিয়ে নিজের কৌশলগত স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
বৈঠকের আগে পুতিনকে তামিল সাহিত্যের একটি বিখ্যাত বই উপহার দেন মোদি। এরপর দুই রাষ্ট্রনেতার মধ্যে বিভিন্ন দ্বিপাক্ষিক বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়।
বর্তমান আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে ভারতের কাছে জ্বালানি নিরাপত্তা অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এবং গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ ঘিরে অনিশ্চয়তার কারণে বিশ্বজুড়ে তেল ও জ্বালানির বাজারে চাপ তৈরি হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে রাশিয়াকে ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অংশীদার হিসেবে দেখা হচ্ছে। রাশিয়া থেকে তেল কেনা নিয়ে আমেরিকার আপত্তি থাকলেও ভারত নিজের প্রয়োজন এবং অর্থনৈতিক স্বার্থকে সামনে রেখেই সিদ্ধান্ত নিতে চাইছে।
মোদি-পুতিন বৈঠকে জ্বালানি সহযোগিতা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়েছে বলে সূত্রের দাবি। ভবিষ্যতে দুই দেশের মধ্যে জ্বালানি বাণিজ্য আরও বাড়তে পারে বলেও ইঙ্গিত মিলেছে।
শুধু জ্বালানি নয়, সামগ্রিক দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য নিয়েও দুই দেশের মধ্যে আলোচনা হয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে ভারত ও রাশিয়ার দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর লক্ষ্যের কথা উঠে এসেছে।
বাণিজ্যের পাশাপাশি প্রযুক্তি, শিল্প, প্রতিরক্ষা এবং অন্যান্য কৌশলগত ক্ষেত্রেও সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে দুই দেশ আগ্রহী। আন্তর্জাতিক বাজারে নানা বাধা তৈরি হলেও ভারত ও রাশিয়া নিজেদের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করতে চাইছে।
এর ফলে আগামী কয়েক বছরে মস্কো-নয়াদিল্লি অর্থনৈতিক সম্পর্ক নতুন মাত্রা পেতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
ভারত ও রাশিয়ার সম্পর্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হল প্রতিরক্ষা সহযোগিতা। দীর্ঘদিন ধরেই রুশ অস্ত্র ও সামরিক প্রযুক্তি ভারতের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
মোদি-পুতিন বৈঠকেও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে বলে জানা যাচ্ছে। আলোচনায় সুখোই এসইউ-৫৭ যুদ্ধবিমান নিয়ে সম্ভাব্য চুক্তির বিষয়টি উঠে এসেছে। পাশাপাশি ভারতীয় বায়ুসেনার হাতে থাকা সুখোই-৩০ এমকেআই যুদ্ধবিমানের আধুনিকীকরণ নিয়েও আলোচনা হয়েছে বলে খবর।
এছাড়া আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নিয়েও দুই দেশের মধ্যে আলোচনা হয়েছে। আরও এস-৪০০ ট্রায়াম্ফ এবং প্যান্টসিরের মতো প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম কেনার বিষয়টি আলোচনায় থাকার কথা জানা যাচ্ছে।
ভারতের প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে রুশ প্রযুক্তির দীর্ঘদিনের উপস্থিতির কারণে এই সহযোগিতাকে নয়াদিল্লির কাছে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হয়।
ভারত-রাশিয়া প্রতিরক্ষা সম্পর্কের সাম্প্রতিক আলোচনায় আমেরিকার প্রস্তাবও স্বাভাবিকভাবেই সামনে আসছে। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রী মোদির আমেরিকা সফরের সময় ভারতকে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান দেওয়ার প্রস্তাবের কথা জানিয়েছিলেন ট্রাম্প।
তবে সেই প্রস্তাব থাকা সত্ত্বেও ভারত রাশিয়ার সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বন্ধ করেনি। বরং মস্কোর সঙ্গে একাধিক সম্ভাব্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা এগিয়ে চলেছে।
এর অর্থ এই নয় যে ভারত আমেরিকার সঙ্গে প্রতিরক্ষা সম্পর্ক ছিন্ন করছে। বরং নয়াদিল্লি দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন দেশের সঙ্গে একসঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক বজায় রাখার নীতি অনুসরণ করে আসছে। রাশিয়া ও আমেরিকা—দুই দেশের সঙ্গেই সম্পর্ক রেখে নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়াই ভারতের কূটনৈতিক কৌশলের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
রাশিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকলেও ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে ভারত সবসময় মস্কোর অবস্থানকে সরাসরি সমর্থন করেনি। সম্প্রতি সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশনের সম্মেলনের ফাঁকে পুতিনের সঙ্গে বৈঠকেও মোদি যুদ্ধের দ্রুত অবসানের প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়েছিলেন।
ভারতের অবস্থান মূলত আলোচনার মাধ্যমে সংঘাতের সমাধানের পক্ষে। ফলে রাশিয়ার সঙ্গে প্রতিরক্ষা ও জ্বালানি সম্পর্ক বজায় রেখেও ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে নয়াদিল্লি নিজের আলাদা অবস্থান ধরে রেখেছে।
এই ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতিই আন্তর্জাতিক মহলে ভারতের অন্যতম বড় শক্তি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
ব্রিকসের মঞ্চে ভারত ও রাশিয়ার পাশাপাশি চিনের ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ব্রিকস সম্মেলনে চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের ভারত সফরকে ঘিরেও কূটনৈতিক মহলে আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
ভারত, রাশিয়া ও চিন—এই তিন দেশের মধ্যে বিভিন্ন বিষয়ে মতপার্থক্য থাকলেও অর্থনীতি ও বহুপাক্ষিক আন্তর্জাতিক মঞ্চে তাদের সহযোগিতার জায়গাও রয়েছে। বিশেষ করে পশ্চিমী শক্তির প্রভাবের বাইরে বিকল্প অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক কাঠামো তৈরির ক্ষেত্রে ব্রিকসকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হয়।
তবে ভারত-চিন সম্পর্কের ক্ষেত্রে সীমান্তসহ একাধিক সংবেদনশীল বিষয় রয়েছে। তাই তিন দেশের ঘনিষ্ঠতা মানেই সরাসরি কোনও নতুন জোট তৈরি হয়ে যাচ্ছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনোও ঠিক হবে না।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে রাশিয়ার উপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানোর চেষ্টা করছে। ইউক্রেন যুদ্ধের পর সেই চাপ আরও বেড়েছে। রাশিয়ার তেল কেনা নিয়ে ভারতকেও বিভিন্ন সময়ে সতর্ক করেছে ওয়াশিংটন।
এই পরিস্থিতিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী যখন সরাসরি পুতিনের সঙ্গে জ্বালানি ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা করছেন, তখন তা নিঃসন্দেহে আমেরিকার জন্য গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক বার্তা।
তবে ভারত কোনও পক্ষের চাপের কাছে পুরোপুরি নতি স্বীকার না করে নিজের জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে—এমন ব্যাখ্যাই বেশি জোরালো। জ্বালানি নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা প্রয়োজন এবং অর্থনৈতিক স্বার্থ—সবকিছুর মধ্যে ভারসাম্য রেখে এগোতে চাইছে নয়াদিল্লি।
বর্তমান বিশ্ব রাজনীতিতে এককেন্দ্রিক ক্ষমতার বদলে একাধিক শক্তির উত্থান নিয়ে আলোচনা চলছে। ব্রিকসের সম্প্রসারণ এবং ভারত, রাশিয়া, চিনসহ বিভিন্ন দেশের সক্রিয় ভূমিকা সেই পরিবর্তনেরই একটি অংশ।
মোদি-পুতিন বৈঠক সেই বৃহত্তর পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। তবে এটিকে সরাসরি আমেরিকার বিরুদ্ধে নতুন কোনও অক্ষশক্তির সূচনা বলা এখনও তাড়াহুড়োর সিদ্ধান্ত হবে।
বরং ভারত যে নিজের কৌশলগত স্বাধীনতা বজায় রেখে আমেরিকা, রাশিয়া এবং অন্যান্য শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক পরিচালনা করতে চাইছে, এই বৈঠক তারই আরেকটি উদাহরণ। আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি যত জটিল হচ্ছে, ততই ভারতের এই ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি বিশ্ব রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
সব মিলিয়ে দিল্লিতে মোদি-পুতিন বৈঠক শুধু দুই রাষ্ট্রনেতার নিয়মিত বৈঠক নয়। জ্বালানি সংকট, ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা, ব্রিকসের ভবিষ্যৎ এবং ভারত-মার্কিন সম্পর্ক—সবকিছুর প্রেক্ষাপটে এই বৈঠক আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।



