রাহুল রাহা,দিল্লি থেকে,এনবি সংবাদ : ব্রিক্স সম্মেলনের সূচনা পর্বে চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংকে অস্বস্তিতে দেখে নিজের বক্তৃতা থামিয়ে দিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। জিনপিংয়ের অনুবাদকের উদ্দেশে তিনি জানতে চান, ‘‘উনি ঠিক আছেন তো?’’ জবাবে মৃদু মাথা নেড়ে সম্মতি জানান চিনের প্রেসিডেন্ট। এরপর ফের ভাষণ শুরু করেন মোদী।
সাত বছর পর ভারতে এসেছেন শি জিনপিং। নয়াদিল্লিতে আয়োজিত ১৮তম ব্রিক্স সম্মেলনের প্রথম দিনের সূচনা পর্বে এই ঘটনা নজর কাড়ে। তবে ঠিক কী কারণে জিনপিং অস্বস্তি বোধ করছিলেন, তা স্পষ্ট নয়। চিনের প্রতিনিধিদলের তরফেও এ বিষয়ে আলাদা করে কিছু জানানো হয়নি।
শনিবার ভারতের প্রধানমন্ত্রীর ভাষণের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় দু’দিনের ব্রিক্স সম্মেলন। সরাসরি সম্প্রচারের সময় শি জিনপিংকে দেখে মনে হচ্ছিল, তিনি কোনও কারণে অস্বস্তিতে রয়েছেন। বিষয়টি লক্ষ্য করেই নিজের বক্তব্য থামান মোদী।
চিনের প্রেসিডেন্টের অনুবাদকের দিকে তাকিয়ে তিনি প্রশ্ন করেন, ‘‘উনি ঠিক আছেন তো?’’ জিনপিং মৃদু মাথা নেড়ে সম্মতি জানান। এরপর কোনও ব্যাখ্যা ছাড়াই নিজের বক্তৃতা চালিয়ে যান ভারতের প্রধানমন্ত্রী।
ঘটনার কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য না থাকায় এ নিয়ে নানা আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে প্রকাশ্য তথ্যের ভিত্তিতে জিনপিংয়ের শারীরিক অবস্থা বা অস্বস্তির কারণ সম্পর্কে কোনও নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছনো যায় না।
ব্রিক্স সম্মেলনের আয়োজক দেশ এ বার ভারত। এই উপলক্ষে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজ়েশকিয়ান-সহ একাধিক রাষ্ট্রনেতা নয়াদিল্লিতে উপস্থিত হয়েছেন।
শনিবার বেলা ১২টার কিছু আগে দিল্লিতে পৌঁছন শি জিনপিং। সম্মেলনে যোগ দেওয়ার পর বিকেলে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করেন তিনি।
দীর্ঘ বিরতির পর চিনের প্রেসিডেন্টের ভারত সফরকে ঘিরে দুই দেশের সম্পর্ক নিয়েও আগ্রহ তৈরি হয়েছে। সীমান্ত-সহ বিভিন্ন বিষয়ে মতপার্থক্য থাকলেও ভারত ও চিনের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগ বজায় রাখার গুরুত্ব রয়েছে।
প্রথম দিনের সম্মেলন শেষে ভারত মণ্ডপমে রাষ্ট্রনেতাদের জন্য নৈশভোজের আয়োজন করেন প্রধানমন্ত্রী মোদী। তবে সেই নৈশভোজে যোগ দেননি শি জিনপিং। তিনি হোটেলে ফিরে যান।
সূত্রের খবর অনুযায়ী, দীর্ঘ যাত্রা এবং পর পর কর্মসূচির কারণে ক্লান্ত ছিলেন চিনের প্রেসিডেন্ট। তাই নৈশভোজে না গিয়ে হোটেলে বিশ্রাম নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।
তবে এই তথ্যও জিনপিংয়ের বক্তৃতার সময় অস্বস্তির নির্দিষ্ট কারণ নিশ্চিত করে না। নৈশভোজে অনুপস্থিত থাকা এবং সম্মেলনের সূচনা পর্বে তাঁর অস্বস্তির মধ্যে সরাসরি কোনও সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা জানা যায়নি।
সংযুক্ত আরব আমিরশাহির প্রতিনিধি আবু ধাবির যুবরাজও নৈশভোজে ছিলেন না। ব্রিক্সের প্রথম দিনের সম্মেলন শেষে তিনি দেশে ফিরে গিয়েছেন।
রবিবার ব্রিক্স সম্মেলনের দ্বিতীয় দিনের সূচনাও হয় নরেন্দ্র মোদীর ভাষণের মাধ্যমে। উপস্থিত ছিলেন শি জিনপিং, ভ্লাদিমির পুতিন, মাসুদ পেজ়েশকিয়ান-সহ একাধিক রাষ্ট্রনেতা।
দ্বিতীয় দিনের বক্তব্যে বিশ্বজুড়ে বাড়তে থাকা ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে সংঘাত, জলবায়ু বিপর্যয়, প্রযুক্তি এবং দুর্লভ খনিজ সম্পদের অস্ত্রায়ণের মতো বিষয়।
মোদী বলেন, বিশ্বজুড়ে দ্বন্দ্ব ও সংঘাত বাড়ছে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের জীবনে। এই পরিস্থিতিতে ব্রিক্স সদস্যদের ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, মহামারি থেকে শুরু করে জলবায়ু সংক্রান্ত বিপর্যয়—কোনও সমস্যাই নির্দিষ্ট একটি দেশ বা অঞ্চলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। তাই যৌথভাবে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার প্রস্তুতি জরুরি।
ব্রিক্সের দ্বিতীয় দিনের ভাষণে ভারতের সভাপতিত্বে চারটি বিষয়ের উপর গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানান মোদী। এগুলি হলো সহশীলতা, উদ্ভাবন, সহযোগিতা এবং স্থায়িত্ব।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সহশীলতা, উদ্ভাবন, সহযোগিতা এবং স্থায়িত্ব ভারতের সভাপতিত্বে এই চারটি বিষয়ের উপর আমরা জোর দিচ্ছি।
তিনি জানান, সদস্য দেশগুলির সহযোগিতায় যৌথ উদ্দেশ্যকে পারস্পরিক লাভজনক পরিস্থিতির দিকে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা হয়েছে।
মোদীর বক্তব্যে উন্নয়নশীল দেশগুলির সমস্যা এবং ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ঐক্যবদ্ধ উদ্যোগের বিষয়টিও গুরুত্ব পায়।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী জানান, ব্রিক্সের উপর সারা বিশ্বের নজর রয়েছে এবং এই জোটের প্রতি আস্থাও বেড়েছে। তাই আগামী দিনে সদস্য দেশগুলিকে একসঙ্গে কাজ করে উন্নয়নের লক্ষ্যে এগিয়ে যেতে হবে।
বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে চলমান উত্তেজনা সাধারণ মানুষের জীবনকে প্রভাবিত করছে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি। তাঁর মতে, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানো এবং সময়মতো সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ চিহ্নিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
প্রযুক্তি ও দুর্লভ খনিজ সম্পদের অস্ত্রায়ণ নিয়েও সতর্ক করেন মোদী। তাঁর বক্তব্য, এ ধরনের প্রবণতা যৌথ অগ্রগতির পথে বাধা তৈরি করতে পারে।
ব্রিক্সের দ্বিতীয় দিনের সম্মেলনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর পাশাপাশি উপস্থিত ছিলেন চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এবং ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজ়েশকিয়ান।
এ ছাড়া মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম এবং ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট প্রাবোয়ো সুবিন্তোও সম্মেলনে অংশ নেন।



