সর্বাধিক পঠিত

spot_img

সর্বশেষ আপডেট...

Homeজাতীয়টাকা দিলেই মিলত কল রেকর্ড ও লোকেশন! গোপন তথ্য বিক্রি চক্রের ৫...

টাকা দিলেই মিলত কল রেকর্ড ও লোকেশন! গোপন তথ্য বিক্রি চক্রের ৫ সদস্য আটক

একজন নাগরিকের পরিচয়, মোবাইল যোগাযোগ, অবস্থান এবং আর্থিক লেনদেনের সঙ্গে সম্পর্কিত একাধিক তথ্য একই চক্রের মাধ্যমে সংগ্রহ ও সরবরাহ করা হচ্ছিল বলে অভিযোগ উঠেছে।

নিজস্ব প্রতিবেদক, ১৩ সেপ্টেম্বর, এনবি সংবাদ : টাকা দিলেই পাওয়া যেত নাগরিকদের ব্যক্তিগত ও গোপনীয় তথ্য। শুধু মোবাইল নম্বরের মালিকানাই নয়, অর্থের বিনিময়ে সরবরাহ করা হতো কল ডিটেইল রেকর্ড (সিডিআর), মোবাইলের সর্বশেষ লোকেশন, আইএমইআই-সংক্রান্ত তথ্য, এমনকি মোবাইল ব্যাংকিংয়ের নিবন্ধন ও লেনদেনের তথ্যও। অনলাইনে বিজ্ঞাপন দিয়ে গ্রাহক সংগ্রহ করে দীর্ঘদিন ধরে এ ধরনের কর্মকাণ্ড চালিয়ে আসছিল একটি সংঘবদ্ধ চক্র।

এই অভিযোগে চক্রটির পাঁচ সদস্যকে গ্রেফতার করেছে র‍্যাব। গ্রেফতার ব্যক্তিরা হলেন আব্দুস সালাম সরকার, সুব্রত চন্দ্র পাল, ইসমাইল হোসেন সোহাগ, এসএম নাফি এবং মো. মেহেদী হাসান।

রবিবার (১৩ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বসিলায় র‍্যাব-২ সদর দফতরে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান র‍্যাব-২-এর অধিনায়ক অতিরিক্ত ডিআইজি নয়মুল হাসান।

র‍্যাব জানায়, ডার্ক ওয়েবে নাগরিকদের ব্যক্তিগত তথ্য বিক্রির বিষয়টি নজরে আসার পর এ নিয়ে অনুসন্ধান শুরু করা হয়। নাগরিকদের সংবেদনশীল তথ্য কীভাবে অনলাইনে ছড়িয়ে পড়ছে এবং কারা এসব তথ্য বিক্রির সঙ্গে জড়িত, তা শনাক্ত করতে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তা নেওয়া হয়।

প্রাথমিক তদন্তে বিভিন্ন ওয়েবসাইট, লিংক এবং অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে তথ্য কেনাবেচার কার্যক্রমের সন্ধান পাওয়া যায়। এরপর চক্রটির সদস্যদের শনাক্ত করে গ্রেফতারের জন্য দেশের বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালায় র‍্যাব।

অভিযানে পাঁচজনকে গ্রেফতার করা হয়। তাদের জিজ্ঞাসাবাদে নাগরিকদের ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ ও বিক্রির পদ্ধতি সম্পর্কে বেশ কিছু তথ্য পাওয়া যায় বলে জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

র‍্যাবের দাবি, গ্রেফতার আব্দুস সালাম সরকার নাগরিকদের ব্যক্তিগত তথ্য অনলাইনে বিক্রির উদ্দেশ্যে ‘ই-সেবা২৪.টপ’ নামে একটি এনক্রিপ্টেড ওয়েবসাইট তৈরি করেছিলেন। ওয়েবসাইটটির মাধ্যমে গ্রাহকের কাছ থেকে অর্ডার নেওয়া হতো। এরপর নির্দিষ্ট অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে চাহিদা অনুযায়ী তথ্য সরবরাহ করা হতো।

র‍্যাব-২-এর অধিনায়ক নয়মুল হাসান জানান, আব্দুস সালাম এবং তার সহযোগীরা শুধু ওয়েবসাইটেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না। বিভিন্ন হোয়াটসঅ্যাপ ও টেলিগ্রাম গ্রুপ ব্যবহার করেও তারা গ্রাহকদের সঙ্গে যোগাযোগ করতেন এবং তথ্যের অর্ডার নিতেন।

চক্রটি যেসব তথ্য বিক্রি করত বলে অভিযোগ রয়েছে, তার মধ্যে ছিল মোবাইল সিমের সর্বশেষ কলের লোকেশন, রেডিও লোকেশন, আইএমইআই সার্চের তথ্য এবং কল ডিটেইল রেকর্ড বা সিডিআর।

এই চক্রের সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, সাধারণ নাগরিকের মোবাইল-সংক্রান্ত অত্যন্ত সংবেদনশীল তথ্যও অর্থের বিনিময়ে সরবরাহ করা হতো বলে জানিয়েছে র‍্যাব।

অভিযোগ অনুযায়ী, কেউ নির্দিষ্ট ব্যক্তির মোবাইল নম্বরের তথ্য চাইলে চক্রটির সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারতেন। প্রয়োজন অনুযায়ী সিমের মালিকানা, কলের বিস্তারিত তথ্য কিংবা সর্বশেষ অবস্থান-সংক্রান্ত তথ্য সরবরাহের ব্যবস্থা করা হতো।

এ ছাড়া আইএমইআই নম্বরের মাধ্যমে অনুসন্ধান-সংক্রান্ত তথ্যও বিক্রি করা হতো বলে তদন্তে উঠে এসেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের তথ্য ব্যক্তিগত গোপনীয়তার জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। কারও চলাফেরা বা যোগাযোগের তথ্য অন্যের হাতে চলে গেলে তা হয়রানি, প্রতারণা কিংবা অন্য কোনো অপরাধে ব্যবহারের আশঙ্কা থাকে।

শুধু টেলিকম-সংক্রান্ত তথ্য নয়, মোবাইল ব্যাংকিংয়ের তথ্যও এই চক্রের মাধ্যমে বিক্রি করা হতো বলে জানিয়েছে র‍্যাব।

অভিযোগ রয়েছে, বিকাশ ও নগদে ব্যবহৃত সিমের নিবন্ধনসংক্রান্ত তথ্য এবং লেনদেনের বিবরণও অর্থের বিনিময়ে গ্রাহকদের দেওয়া হতো।

এ ছাড়া জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) এবং জন্ম নিবন্ধনসংক্রান্ত তথ্যসহ বিভিন্ন ধরনের নাগরিক তথ্যও বিক্রির তালিকায় ছিল।

অর্থাৎ একজন নাগরিকের পরিচয়, মোবাইল যোগাযোগ, অবস্থান এবং আর্থিক লেনদেনের সঙ্গে সম্পর্কিত একাধিক তথ্য একই চক্রের মাধ্যমে সংগ্রহ ও সরবরাহ করা হচ্ছিল বলে অভিযোগ উঠেছে।

র‍্যাবের ভাষ্য অনুযায়ী, চক্রটির সদস্যরা অনলাইন প্ল্যাটফর্মকে ব্যবহার করেই গ্রাহক সংগ্রহ করতেন। গ্রেফতার সুব্রত চন্দ্র পাল, ইসমাইল হোসেন সোহাগ, এসএম নাফি ও মো. মেহেদী হাসান ফেসবুক মার্কেটপ্লেস এবং বিভিন্ন ফেসবুক পেজে বিজ্ঞাপন দিতেন।

বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে আগ্রহী ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হতো। পরে হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে অর্ডার নেওয়া এবং প্রয়োজনীয় তথ্য সরবরাহের ব্যবস্থা করা হতো।

তদন্তকারীদের মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিশাল ব্যবহারকারীভিত্তিকে কাজে লাগিয়ে খুব সহজেই সম্ভাব্য গ্রাহকদের কাছে পৌঁছে যেত চক্রটি।

তথ্য বিক্রির অর্থ সরাসরি নিজেদের পরিচয় ব্যবহার করে গ্রহণ করতেন না চক্রের সদস্যরা। র‍্যাব জানিয়েছে, অর্থ লেনদেনের জন্য তারা বিভিন্ন নামে-বেনামে নিবন্ধিত সিম এবং মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করতেন।

এভাবে প্রকৃত পরিচয় আড়াল করে টাকা সংগ্রহের চেষ্টা করা হতো। গ্রাহকের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রেও একাধিক হোয়াটসঅ্যাপ ও টেলিগ্রাম গ্রুপ ব্যবহার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে র‍্যাব।

নয়মুল হাসানের বক্তব্য অনুযায়ী, এনআইডি, সিডিআর, লোকেশনসহ বিভিন্ন সেবার জন্য সংশ্লিষ্ট গ্রুপে যোগাযোগ করা হতো। সেখান থেকে তথ্য সংগ্রহ করে পরে তা গ্রাহকদের কাছে বিক্রি করা হতো।

গ্রেফতার আব্দুস সালাম সরকার সম্পর্কে র‍্যাব আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানিয়েছে। চলতি বছরের এপ্রিল মাসে ‘ই-সেবা২৪.টপ’ ওয়েবসাইটটি তৈরি করা হয় এবং সালাম নিজেই এর প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণে ছিলেন বলে দাবি করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

র‍্যাবের তথ্য অনুযায়ী, সালাম ২০১৮ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন অফিসে অস্থায়ী ভিত্তিতে বিভিন্ন কাজে নিয়োজিত ছিলেন।

তিনি কীভাবে নাগরিকদের এসব তথ্য সংগ্রহ করতেন, সে বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে র‍্যাব-২-এর অধিনায়ক বলেন, সরকারি সার্ভার থেকে কারা অর্থের বিনিময়ে তথ্য ফাঁস করেছে, তা তদন্তের স্বার্থে এই মুহূর্তে প্রকাশ করা হচ্ছে না।

তবে গ্রেফতারদের মধ্যে একজন নির্বাচন কমিশনে চুক্তিভিত্তিক কাজ করতেন এবং সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে তিনি এসব কর্মকাণ্ড করে থাকতে পারেন বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করছে র‍্যাব।

র‍্যাব জানিয়েছে, বিষয়টি এখনও তদন্তাধীন। সরকারি কোনো সার্ভার থেকে তথ্য ফাঁসের ঘটনা ঘটেছে কি না এবং ঘটলে কারা এর সঙ্গে জড়িত, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত এ বিষয়ে নির্দিষ্ট করে কিছু বলতে রাজি হয়নি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কোনো সদস্য এই তথ্য পাচার চক্রের সঙ্গে যুক্ত কি না, সেটিও জানতে চাওয়া হয় সংবাদ সম্মেলনে। জবাবে র‍্যাব-২-এর অধিনায়ক জানান, এখন পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কোনো সদস্যের যোগসাজশের প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

র‍্যাব জানিয়েছে, গ্রেফতার পাঁচজনকে জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে চক্রটির সঙ্গে আরও কারা জড়িত এবং তথ্যগুলো কোথা থেকে সংগ্রহ করা হতো, তা জানার চেষ্টা চলছে।

তদন্ত এগোনোর সঙ্গে সঙ্গে নাগরিকদের ব্যক্তিগত তথ্য বিক্রির এই নেটওয়ার্কের আরও সদস্য কিংবা তথ্য সরবরাহের উৎস সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

জনপ্রিয় সংবাদ