আর্ন্তজাতিক ডেস্ক : ইন্দোনেশিয়ার সক্রিয় আগ্নেয়গিরি মাউন্ট আনাক ক্রাকাতাউয়ে ফের শক্তিশালী অগ্ন্যুৎপাত ঘটেছে। আগ্নেয়গিরি থেকে ছড়িয়ে পড়া ঘন ছাইয়ের মেঘ পশ্চিম ইন্দোনেশিয়ার বিস্তীর্ণ আকাশ ঢেকে ফেলেছে। পরিস্থিতির কারণে জাকার্তার ব্যস্ত সুকর্ণ-হাত্তা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সাময়িকভাবে বিমান চলাচল বন্ধ রাখতে হয়েছে। বাতিল করা হয়েছে আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ মিলিয়ে মোট ২০৯টি উড়ান।
অগ্ন্যুৎপাতের প্রভাবে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যেও সতর্কতা বাড়ানো হয়েছে। কয়েকটি এলাকায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। পাশাপাশি বড় একটি অঞ্চলে মাছ ধরার কার্যক্রমও সাময়িকভাবে স্থগিত রাখা হয়েছে।
ইন্দোনেশিয়ার ভূতাত্ত্বিক কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার থেকেই আনাক ক্রাকাতাউয়ে অগ্ন্যুৎপাতের কার্যক্রম শুরু হয়েছিল। তবে রবিবার ভোরে পরিস্থিতি আরও তীব্র আকার নেয়।
স্থানীয় সময় ভোর ৩টা ৫৩ মিনিটের দিকে আগ্নেয়গিরিটি শক্তিশালীভাবে উদ্গীরণ করে। প্রায় ৩০ সেকেন্ড ধরে চলে ওই তীব্র অগ্ন্যুৎপাত। এর পরপরই আকাশে বিপুল পরিমাণ আগ্নেয় ছাই ছড়িয়ে পড়ে।
ছাইয়ের পরিমাণ দ্রুত বেড়ে যাওয়ায় বিমান চলাচলের ক্ষেত্রে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হয়। প্রথমে ভোর সাড়ে ৫টা পর্যন্ত বিমান চলাচল স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। পরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়ায় সেই নিষেধাজ্ঞার সময় বাড়িয়ে সকাল সাড়ে ৯টা পর্যন্ত করা হয়।
সুকর্ণ-হাত্তা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ইন্দোনেশিয়ার অন্যতম ব্যস্ত বিমানবন্দর। প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক যাত্রী এই বিমানবন্দর ব্যবহার করেন। ফলে অগ্ন্যুৎপাতের কারণে বিমান চলাচল বন্ধ হওয়ায় ব্যাপক ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে যাত্রীদের।
ইন্দোনেশিয়ার পরিবহণ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, অগ্ন্যুৎপাতের ছাইয়ের কারণে আন্তর্জাতিক উড়ানসহ ২০৯টি ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। অনেক যাত্রীর যাত্রাসূচি পরিবর্তন করতে হয়েছে। কেউ কেউ বিমানবন্দরে অপেক্ষা করেছেন, আবার অনেকের যাত্রা পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে।
আকাশে আগ্নেয় ছাই ছড়িয়ে পড়লে বিমানের ইঞ্জিনে ছাই প্রবেশ করে মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। এ কারণে নিরাপত্তার স্বার্থেই বিমান চলাচল বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
আনাক ক্রাকাতাউয়ের অগ্ন্যুৎপাত থেকে তৈরি ছাইয়ের মেঘের অবস্থান পর্যবেক্ষণ করতে উপগ্রহচিত্র ব্যবহার করছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। ইন্দোনেশিয়ার আগ্নেয়গিরি ও ভূতাত্ত্বিক বিপর্যয় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র এবং অস্ট্রেলিয়ার ডারউইন আগ্নেয়গিরি পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র দুটি বড় ছাই-মেঘ শনাক্ত করেছে।
এর মধ্যে একটি ছাইয়ের মেঘ প্রায় ২০ হাজার ফুট উচ্চতায় অবস্থান করছে। সেটি জাকার্তা, বান্তেন ও পশ্চিম জাভার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
অন্য ছাই-মেঘটির উচ্চতা আরও বেশি। সেটি প্রায় ৫০ হাজার ফুট পর্যন্ত উঠেছে বলে জানা গেছে। এই মেঘ বান্তেন, লামপুং ও বেংকুলুর দিকে ছড়িয়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এ ছাড়া দক্ষিণ সুন্দা প্রণালী এবং সুমাত্রার পশ্চিমাঞ্চলের কাছাকাছি ভারত মহাসাগরের আকাশেও আগ্নেয় ছাইয়ের উপস্থিতি দেখা যেতে পারে।
আনাক ক্রাকাতাউয়ের সবচেয়ে কাছের জনবসতি আগ্নেয়গিরি থেকে প্রায় ১৬ কিলোমিটার দূরে। ফলে এখন পর্যন্ত অগ্ন্যুৎপাতের কারণে কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।
প্রশাসনের ধারণা, বর্তমান পরিস্থিতিতে আশপাশের জনবসতি সরিয়ে নেওয়ার প্রয়োজন নেই। তবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। আগ্নেয়গিরির সক্রিয় গহ্বরের কাছাকাছি যাওয়ার ক্ষেত্রে কঠোর সতর্কতা জারি করা হয়েছে।
সাধারণ মানুষকে সক্রিয় গহ্বর থেকে অন্তত তিন কিলোমিটার দূরে থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া কেউ যেন ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় প্রবেশ না করেন, সে বিষয়েও সতর্ক করা হয়েছে।
অগ্ন্যুৎপাতের পর বাতাসে ছড়িয়ে পড়া আগ্নেয় ছাই মানুষের জন্য অস্বস্তিকর হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে চোখ ও শ্বাসযন্ত্রে এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা থাকে। তাই ছাই পড়ছে এমন এলাকায় অপ্রয়োজনে বাইরে না যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছে ইন্দোনেশিয়ার দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ।
জরুরি প্রয়োজনে বাইরে বের হলে মুখে মাস্ক ব্যবহার এবং চোখে সুরক্ষাচশমা পরার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। বাড়ির বাইরে থাকা পানির উৎস ও অন্যান্য উন্মুক্ত জলাধার ঢেকে রাখতে বলা হয়েছে।
ছাই জমে থাকা রাস্তায় গাড়ি চালানোর সময়ও বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন। কারণ ছাইয়ের কারণে রাস্তার দৃশ্যমানতা কমে যেতে পারে এবং যানবাহনের চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সাধারণ মানুষের আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই। তবে আগ্নেয়গিরির আশপাশে পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তিত হতে পারে বলে সবাইকে সরকারি নির্দেশনা মেনে চলতে হবে।
মাউন্ট আনাক ক্রাকাতাউ নামটির অর্থই হলো ‘ক্রাকাতোয়ার সন্তান’। জাভা ও সুমাত্রার মধ্যবর্তী সুন্দা প্রণালীতে অবস্থিত এই আগ্নেয়গিরির জন্ম হয়েছিল পুরনো ক্রাকাতাউ আগ্নেয়গিরির ধ্বংসের পর।
ক্রাকাতাউ নামটি বিশ্বের ইতিহাসে অন্যতম ভয়াবহ আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। ১৮৮৩ সালের ভয়াবহ অগ্ন্যুৎপাতে পুরনো ক্রাকাতাউ কার্যত ধ্বংস হয়ে যায়। সেই বিস্ফোরণের প্রভাবে সমুদ্রে ভয়াবহ সুনামি সৃষ্টি হয়েছিল। ওই ঘটনায় প্রায় ৩৬ হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছিলেন।
পরবর্তী সময়ে সেই একই অঞ্চলে নতুন আগ্নেয়গিরি হিসেবে আনাক ক্রাকাতাউয়ের উত্থান ঘটে।
আনাক ক্রাকাতাউকে ঘিরে সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনাগুলোর একটি ঘটেছিল ২০১৮ সালের ডিসেম্বর মাসে। তখন অগ্ন্যুৎপাতের সময় আগ্নেয়গিরির একটি বড় অংশ ধসে সমুদ্রে গিয়ে পড়ে।
এর ফলে সমুদ্রের পানিতে শক্তিশালী ঢেউ তৈরি হয়। সেই সুনামি জাভা ও সুমাত্রার উপকূলবর্তী এলাকায় আঘাত হানে। ভয়াবহ ওই ঘটনায় ৪৩০ জনের মৃত্যু হয়েছিল।
এই অতীত অভিজ্ঞতার কারণে আনাক ক্রাকাতাউয়ে নতুন করে অগ্ন্যুৎপাত হলেই ইন্দোনেশিয়ার প্রশাসন বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করে। বিশেষ করে আগ্নেয়গিরির কোনো অংশ ধসে সমুদ্রে পড়ছে কি না, সেটিও নজরে রাখা হয়।
সাম্প্রতিক অগ্ন্যুৎপাতের পর সাধারণ মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি হয়েছে—এবারও কি সুনামি হতে পারে?
ইন্দোনেশিয়ার দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে সুনামি তৈরির কোনো আশঙ্কা নেই। তবে আনাক ক্রাকাতাউ একটি সক্রিয় ও অগ্ন্যুৎপাতপ্রবণ আগ্নেয়গিরি হওয়ায় পরিস্থিতির ওপর ঘনিষ্ঠ নজর রাখা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞ ও প্রশাসনের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আগ্নেয়গিরির আচরণ পর্যবেক্ষণ করা। অগ্ন্যুৎপাতের মাত্রা বাড়ছে কি না, নতুন করে ছাইয়ের মেঘ তৈরি হচ্ছে কি না এবং আগ্নেয়গিরির কোনো অংশ ধসে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে কি না—এসব বিষয় নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
আনাক ক্রাকাতাউয়ের অগ্ন্যুৎপাত আপাতত বড় ধরনের প্রাণহানি বা জনবসতি উচ্ছেদের পরিস্থিতি তৈরি না করলেও এর প্রভাব ইতোমধ্যে বিমান চলাচল ও স্থানীয় মানুষের স্বাভাবিক জীবনে পড়েছে।
বিশেষ করে আকাশে ছাইয়ের মেঘের বিস্তার এবং তা বিভিন্ন অঞ্চলের দিকে এগিয়ে যাওয়ায় বিমান চলাচলে সতর্কতা অব্যাহত থাকতে পারে। পরিস্থিতি অনুযায়ী আরও ফ্লাইট বাতিল বা সময়সূচিতে পরিবর্তন আসতে পারে।
ইন্দোনেশিয়া প্রশাসন জানিয়েছে, আতঙ্কিত না হয়ে সরকারি নির্দেশনা অনুসরণ করাই সবচেয়ে নিরাপদ। আগ্নেয়গিরির কাছাকাছি যাওয়া থেকে বিরত থাকা, ছাইয়ের এলাকায় প্রয়োজন ছাড়া বাইরে না বের হওয়া এবং সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
আনাক ক্রাকাতাউয়ের সাম্প্রতিক অগ্ন্যুৎপাত আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে, ইন্দোনেশিয়ার মতো আগ্নেয়গিরিপ্রবণ দেশে প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি কতটা বাস্তব। তাই পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত স্থানীয় প্রশাসন ও ভূতাত্ত্বিক সংস্থাগুলোর নির্দেশনা মেনে চলাই হবে সবচেয়ে নিরাপদ পথ।



