আর্ন্তজাতিক ডেস্ক : একসময় নেপালের বিদ্যুৎ পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত নাজুক। দেশের বহু মানুষকে দিনের বড় একটি সময় বিদ্যুৎহীন অবস্থায় কাটাতে হতো। কোথাও কোথাও ১৫ থেকে ১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকত না। কিন্তু গত কয়েক বছরে সেই চিত্রে বড় পরিবর্তন এসেছে। পাহাড়ি নদী ও জলসম্পদের ওপর নির্ভর করে বিপুল পরিমাণ জলবিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু করেছে নেপাল। অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি ভারত ও বাংলাদেশে বিদ্যুৎ রফতানি করেও আয় করছে দেশটি।
কিন্তু সাম্প্রতিক প্রাকৃতিক দুর্যোগ নেপালের সেই সাফল্যের ভিত নিয়েই নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। গত ২৬ আগস্টের ভয়াবহ হড়পা বান ও বন্যায় ত্রিশূলী নদীর অববাহিকায় থাকা একাধিক জলবিদ্যুৎকেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে দেশের বিদ্যুৎ সরবরাহেও প্রভাব পড়েছে।
এতে শুধু বর্তমান বিদ্যুৎ পরিস্থিতি নয়, ভবিষ্যতে নেপালের জলবিদ্যুৎনির্ভর অর্থনীতি কতটা নিরাপদ—সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে।
জলবিদ্যুৎ থেকেই বদলে যায় নেপালের বিদ্যুৎ পরিস্থিতি
নেপালের অর্থনীতিতে জলবিদ্যুৎ এখন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। দেশের পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি এবং অসংখ্য নদী বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য বড় সুযোগ তৈরি করেছে। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে গত এক দশকে দেশটি জলবিদ্যুৎ উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে।
২০১০ সালে নেপালের মোট জনসংখ্যার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশের বাড়িতে বিদ্যুৎ সংযোগ ছিল। তবে সংযোগ থাকলেও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ পাওয়া যেত না। বহু পরিবারকে প্রতিদিন দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎহীন থাকতে হতো।
২০১৮ সালের পর পরিস্থিতি দ্রুত বদলাতে শুরু করে। বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বিতরণ ব্যবস্থার উন্নতির ফলে দেশের প্রত্যন্ত এলাকাতেও বিদ্যুৎ পৌঁছাতে থাকে। বর্তমানে নেপালে প্রায় ২২৫টি জলবিদ্যুৎকেন্দ্র সক্রিয় রয়েছে। এর পাশাপাশি আরও প্রায় ১০০টি প্রকল্প নির্মাণাধীন অথবা উৎপাদন শুরুর প্রস্তুতিতে রয়েছে।
অর্থাৎ বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে নেপাল যে পথ বেছে নিয়েছে, তার কেন্দ্রে রয়েছে জলবিদ্যুৎ।
বিদ্যুৎ রফতানি করেও আয় করছে কাঠমান্ডু
নিজেদের প্রয়োজন মেটানোর পর অতিরিক্ত বিদ্যুৎ প্রতিবেশী দেশগুলোতে বিক্রি করছে নেপাল। ভারত ও বাংলাদেশ নেপালের জলবিদ্যুতের অন্যতম সম্ভাব্য বাজার।
বিদ্যুৎ রফতানি থেকে বছরে প্রায় ২০ কোটি মার্কিন ডলার আয় করে নেপাল, যা ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ১ হাজার ৮০০ কোটি টাকার সমান। ফলে জলবিদ্যুৎ শুধু দেশের ঘরে আলো পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যম নয়, নেপালের অর্থনীতিতেও এটি গুরুত্বপূর্ণ একটি খাত হয়ে উঠেছে।
কিন্তু প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হলে এই নির্ভরতার ঝুঁকিও সামনে চলে আসে।
হড়পা বানে ক্ষতিগ্রস্ত ১২ জলবিদ্যুৎকেন্দ্র
২৬ আগস্টের বিপর্যয়ে নেপাল-তিব্বত সীমান্তের বেশ কয়েকটি এলাকা ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। হড়পা বানে গ্রাম ও যোগাযোগ ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোর ওপরও বড় আঘাত আসে।
যে ভোটেকোশী নদীতে হড়পা বান নেমেছিল, সেটি পরে ত্রিশূলী নদীর সঙ্গে মিলিত হয়। ত্রিশূলী নদীর অববাহিকায় থাকা ১২টি জলবিদ্যুৎকেন্দ্র ক্ষতির মুখে পড়ে।
এই ক্ষয়ক্ষতির প্রভাবে নেপালের মোট বিদ্যুৎ সরবরাহ প্রায় ১০ শতাংশ কমে যায় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো, ক্ষতিগ্রস্ত কেন্দ্রগুলো কবে আবার পুরোপুরি বিদ্যুৎ উৎপাদনে ফিরতে পারবে, তা এখনও নিশ্চিত নয়।
জলবিদ্যুৎ প্রকল্প কি আদৌ নিরাপদ?
বন্যা ও হড়পা বানের মতো দুর্যোগ নেপালের জন্য নতুন নয়। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে হিমালয় অঞ্চলে প্রাকৃতিক দুর্যোগের ধরন ও তীব্রতা বদলাচ্ছে বলে উদ্বেগ বাড়ছে।
বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রাজন ধাকাল মনে করেন, উষ্ণায়নের প্রভাব যেভাবে বাড়ছে, তাতে নেপালের জলবিদ্যুৎনির্ভর নীতিকে নতুন করে পর্যালোচনা করার প্রয়োজন রয়েছে।
কারণ জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য নদী ও পাহাড়ি জলপ্রবাহের ওপর নির্ভর করতে হয়। কিন্তু একই নদী যখন আকস্মিক বন্যা বা হড়পা বানের উৎস হয়ে ওঠে, তখন সেই নদীর ওপর তৈরি অবকাঠামোই বিপদের মুখে পড়ে।
এখানেই নেপালের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। যে প্রাকৃতিক সম্পদ দেশটির বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রধান শক্তি, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সেটিই আবার অবকাঠামোর জন্য ঝুঁকির কারণ হয়ে উঠছে।
হিমালয়ে উষ্ণায়নের প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ
পরিবেশবিদদের মতে, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাব হিমালয় অঞ্চলে বিশেষভাবে দৃশ্যমান। তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে হিমবাহ ও পাহাড়ি পরিবেশে পরিবর্তন ঘটছে। এর প্রভাব পড়ছে নদীর প্রবাহ, পাহাড়ের স্থিতিশীলতা এবং আকস্মিক বন্যার ঝুঁকিতে।
হিমবাহ গলন, হিমবাহের হ্রদ সৃষ্টি এবং পাহাড়ি এলাকায় আকস্মিক জলপ্রবাহ—সবকিছু মিলিয়ে নেপালের মতো দেশের জন্য জলবায়ু পরিবর্তন বড় ধরনের অবকাঠামোগত চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
এই পরিস্থিতিতে শুধু নতুন নতুন জলবিদ্যুৎ প্রকল্প তৈরি করলেই হবে না। প্রকল্প কোথায় তৈরি হচ্ছে, পাহাড় ও নদীর আচরণ কেমন, ভবিষ্যতের জলবায়ু ঝুঁকি কতটা এবং দুর্যোগ মোকাবিলার ব্যবস্থা কতটা শক্তিশালী—এসব বিষয়ও বিবেচনা করতে হবে।
বিকল্প হিসেবে সৌরবিদ্যুতের পরামর্শ
জলবিদ্যুতের পাশাপাশি নেপালের সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের দিকে আরও বেশি নজর দেওয়া উচিত বলে মত দিয়েছেন বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ।
জার্মানির একটি সংস্থাও নেপালের বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় সৌরশক্তির ব্যবহার বাড়ানোর পক্ষে মত দিয়েছে। তাদের মতে, জলবিদ্যুতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমাতে নবায়নযোগ্য শক্তির অন্যান্য উৎসকে গুরুত্ব দেওয়া দরকার।
সৌরবিদ্যুৎ সেই বিকল্পগুলোর মধ্যে অন্যতম হতে পারে। বিশেষ করে জলবিদ্যুৎ প্রকল্প যখন বন্যা, ভূমিধস বা হড়পা বানের মতো দুর্যোগের ঝুঁকিতে থাকে, তখন বিদ্যুৎ উৎপাদনের উৎসের বৈচিত্র্য নেপালের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
পাহাড়ের ওপরে প্রকল্প তৈরির প্রস্তাব
জলবিদ্যুৎ পুরোপুরি বাদ দেওয়ার কথা বলছেন না নেপালের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। বরং প্রকল্পের অবস্থান ও নির্মাণ পরিকল্পনায় পরিবর্তনের প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছেন কেউ কেউ।
রাজন ধাকালের মতে, জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলো তুলনামূলক নিরাপদ উচ্চভূমিতে স্থাপন করা গেলে ঝুঁকি কমানো সম্ভব হতে পারে।
তবে বিশেষজ্ঞদের আরেকটি অংশ মনে করছে, শুধু প্রকল্পের অবস্থান পরিবর্তন করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। পাহাড়ি নদীর গতিপথ, ভূমিধসের সম্ভাবনা, বন্যার ইতিহাস এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ভবিষ্যৎ প্রভাব—সবকিছুকে প্রকল্প পরিকল্পনার অংশ করতে হবে।
দুর্যোগের সতর্কতা আগে থেকেই ছিল?
সাউথ এশিয়া নেটওয়ার্কের সমন্বয়ক হিমাংশু ঠক্করের দাবি, নেপালকে অতীতেও সম্ভাব্য দুর্যোগের ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্ক করা হয়েছিল। কিন্তু সেই সতর্কতা অনুযায়ী পর্যাপ্ত পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
গত কয়েক বছরে নেপালে একাধিক পাহাড়ি দুর্যোগ ও বন্যার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনার পরও জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের পরিকল্পনা ও অবস্থান নির্ধারণে যথেষ্ট পরিবর্তন না এলে ভবিষ্যতে একই ধরনের ক্ষয়ক্ষতি আবারও হতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।
বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকেও স্বীকার করা হয়েছে যে কিছু জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের পরিকল্পনা ও ঝুঁকি মূল্যায়ন আরও উন্নত করা প্রয়োজন।
বেসরকারি বিদ্যুৎ সংস্থাগুলোর ওপর বড় চাপ
সাম্প্রতিক বিপর্যয়ের সবচেয়ে বড় আর্থিক ধাক্কা সামলাতে হচ্ছে বেসরকারি জলবিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে। প্রকল্প ক্ষতিগ্রস্ত হলে উৎপাদন বন্ধ থাকে, অথচ ঋণ, রক্ষণাবেক্ষণ ও অন্যান্য খরচ চলতেই থাকে।
ফলে একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ শুধু কয়েক দিনের বিদ্যুৎ ঘাটতি তৈরি করে না; দীর্ঘমেয়াদে বিদ্যুৎ কোম্পানিগুলোর আর্থিক স্থিতিশীলতার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
এ ছাড়া ক্ষতিগ্রস্ত প্রকল্পগুলো পুনর্গঠন করতে বিপুল অর্থ প্রয়োজন হতে পারে।
জলবিদ্যুৎকেন্দ্রে আটকে থাকা কর্মীদের নিয়েও উদ্বেগ
বিপর্যয়ের পর জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত কর্মী ও প্রকৌশলীদের নিরাপত্তাও বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় প্রকল্পগুলোর অবস্থান হওয়ায় দুর্যোগের সময় উদ্ধারকাজ অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে।
ক্ষতিগ্রস্ত জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোর বিভিন্ন অংশে কর্মী ও প্রকৌশলীদের আটকে থাকার বিষয়টিও সামনে এসেছে। সময় যত গড়াচ্ছে, তাঁদের নিরাপদে উদ্ধারের সম্ভাবনা নিয়ে উদ্বেগ তত বাড়ছে।
ক্ষতিপূরণ দাবি করলেই কি সমাধান হবে?
জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য নেপাল বিশ্বের বড় কার্বন নিঃসরণকারী দেশগুলোর দিকে আঙুল তুলেছে। ভারত, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশগুলোর কাছ থেকে জলবায়ুজনিত ক্ষয়ক্ষতির জন্য ক্ষতিপূরণের দাবিও জানিয়েছে কাঠমান্ডু।
তবে ক্ষতিপূরণ পাওয়া গেলেও নেপালের মূল সমস্যার সমাধান হবে কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি যদি ভবিষ্যতে আরও বাড়ে, তাহলে শুধু ক্ষয়ক্ষতির পর ক্ষতিপূরণ নেওয়া নয়, দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থাকেও আরও স্থিতিশীল ও বহুমুখী করতে হবে।
নেপালের সামনে নতুন বাস্তবতা
নেপালের জলবিদ্যুৎ খাত গত কয়েক বছরে দেশের অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় বড় পরিবর্তন এনেছে। বিদ্যুৎ সংকট কমেছে, প্রত্যন্ত অঞ্চলে সংযোগ পৌঁছেছে এবং প্রতিবেশী দেশে বিদ্যুৎ বিক্রির মাধ্যমে বৈদেশিক আয়ও বাড়ছে।
কিন্তু সাম্প্রতিক হড়পা বান দেখিয়ে দিয়েছে, একটি নির্দিষ্ট প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার ঝুঁকি কতটা বড় হতে পারে।
নেপালের জন্য তাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে জলবিদ্যুৎ উন্নয়ন ও জলবায়ু ঝুঁকির মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করা। জলবিদ্যুৎ উৎপাদন অব্যাহত রাখার পাশাপাশি সৌরবিদ্যুৎসহ অন্যান্য নবায়নযোগ্য শক্তির উৎস বাড়ানো, প্রকল্পের ঝুঁকি মূল্যায়ন শক্তিশালী করা এবং দুর্যোগ সহনশীল অবকাঠামো গড়ে তোলাই হতে পারে ভবিষ্যতের পথ।
যে জলবিদ্যুৎ একসময় নেপালের বিদ্যুৎ সংকট দূর করার অন্যতম বড় হাতিয়ার হয়েছিল, সাম্প্রতিক দুর্যোগের পর সেই খাতই এখন নতুন প্রশ্নের মুখে। সামনে নেপাল কীভাবে এই ঝুঁকি সামলে জলবিদ্যুৎনির্ভর উন্নয়নের পথ ধরে রাখে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।





