নিউজ বাংলা, আন্তর্জাতিক ডেক্স : মধ্যপ্রাচ্যের ভ্রমণ ও পর্যটন খাত ২০২৬ সালে বড় ধরনের সাময়িক চাপের মুখে পড়তে পারে। আঞ্চলিক সংঘাত, আকাশপথে বিঘ্ন এবং আন্তর্জাতিক ভ্রমণ প্রবাহে পরিবর্তনের কারণে এ অঞ্চলের পর্যটন অর্থনীতি সংকুচিত হওয়ার পূর্বাভাস দিয়েছে ওয়ার্ল্ড ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুরিজম কাউন্সিল (WTTC)। তবে স্বল্পমেয়াদি এই ধাক্কার বিপরীতে দীর্ঘমেয়াদে মধ্যপ্রাচ্যের পর্যটন খাতের সম্ভাবনা বেশ শক্তিশালী বলে মনে করছে সংস্থাটি।
WTTC-এর সর্বশেষ Economic Impact Research (EIR): Global Trends Report-এ মধ্যপ্রাচ্যের পর্যটন অর্থনীতির এই দ্বিমুখী চিত্র উঠে এসেছে। Chase Travel-এর পৃষ্ঠপোষকতায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমান সংকট কাটিয়ে উঠতে পারলে আগামী এক দশকে মধ্যপ্রাচ্য বিশ্বের দ্রুততম বর্ধনশীল ভ্রমণ ও পর্যটন অঞ্চলগুলোর একটি হয়ে উঠতে পারে।
২০২৫ সালে মধ্যপ্রাচ্যের ভ্রমণ ও পর্যটন খাতের অর্থনৈতিক আকার ছিল প্রায় ৩৮৬ বিলিয়ন ডলার। ২০২৬ সালে তা কমে প্রায় ৩৩০ বিলিয়ন ডলারে নেমে যেতে পারে।
অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে খাতটির আকার প্রায় ১৪ দশমিক ৫ শতাংশ কমার সম্ভাবনা রয়েছে।
এই পতনের পেছনে আঞ্চলিক সংঘাত ও এর ফলে সৃষ্ট ভ্রমণ প্রতিবন্ধকতাকে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে দেখছে WTTC। সংঘাতের কারণে বিমান চলাচল ব্যাহত হওয়া, ভ্রমণ পরিকল্পনায় অনিশ্চয়তা এবং পর্যটকদের সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের মতো বিষয় সরাসরি পর্যটন অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্য শুধু একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন অঞ্চল নয়, আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলের ক্ষেত্রেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি কেন্দ্র। বিশ্বের আন্তর্জাতিক যাত্রীদের প্রায় ১৪ শতাংশ এ অঞ্চলের বিমানবন্দর ও আকাশপথের সঙ্গে যুক্ত।
সহজভাবে বললে, বিশ্বের প্রতি সাতজন আন্তর্জাতিক ভ্রমণকারীর মধ্যে প্রায় একজন কোনো না কোনোভাবে মধ্যপ্রাচ্যের বিমান যোগাযোগ ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করেন।
এ কারণে এ অঞ্চলে সংঘাত বা আকাশপথে বড় ধরনের বিঘ্ন দেখা দিলে তার প্রভাব শুধু স্থানীয় পর্যটনে সীমাবদ্ধ থাকে না। আন্তর্জাতিক বিমান রুট, ট্রানজিট যাত্রী, হোটেল ব্যবসা এবং বিভিন্ন দেশের পর্যটন প্রবাহেও এর প্রভাব পড়ে।
স্বল্পমেয়াদে বড় ধরনের সংকোচনের পূর্বাভাস থাকলেও মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘমেয়াদি পর্যটন সম্ভাবনা নিয়ে WTTC ইতিবাচক পূর্বাভাস দিয়েছে।
এই প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে পারলে ২০৩৬ সালে মধ্যপ্রাচ্যের পর্যটন অর্থনীতির আকার প্রায় ৬০৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে। অর্থাৎ ২০২৬ সালের সম্ভাব্য সংকোচনের পরবর্তী দশকে এই খাতে উল্লেখযোগ্য সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘমেয়াদি পর্যটন প্রবৃদ্ধিতে চারটি দেশকে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখছে WTTC। দেশগুলো হলো সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত (UAE), ওমান ও কাতার।
২০২৫ সালে এই চার দেশের সম্মিলিত Travel & Tourism GDP ছিল প্রায় ২৭২ বিলিয়ন ডলার।
WTTC-এর পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩৬ সালের মধ্যে তা বেড়ে প্রায় ৪৩৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে।
অর্থাৎ এক দশকে চার দেশের সম্মিলিত পর্যটন অর্থনীতিতে প্রায় ১৬৩ বিলিয়ন ডলার যোগ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের পর্যটন রূপান্তরের অন্যতম বড় উদাহরণ হিসেবে সৌদি আরবকে তুলে ধরেছে WTTC।
দেশটির Vision 2030 পরিকল্পনায় অর্থনীতিকে তেলনির্ভরতা থেকে আরও বহুমুখী করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এই পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ হচ্ছে পর্যটন খাতের সম্প্রসারণ।
WTTC-বলছে, সৌদি আরবের Travel & Tourism খাতে ২০২৫ সালে বিনিয়োগ ১৯. ৪ শতাংশ বেড়েছে
পর্যটন অবকাঠামো উন্নয়ন, বিনিয়োগবান্ধব সংস্কার এবং বড় আকারের পর্যটন প্রকল্পের মাধ্যমে সৌদি আরব আন্তর্জাতিক পর্যটন বাজারে নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করার চেষ্টা করছে। আগামী এক দশকে আন্তর্জাতিক পর্যটকদের ব্যয়ও দ্বিগুণের বেশি হওয়ার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে পরিণত পর্যটন অর্থনীতিগুলোর একটি হিসেবে সংযুক্ত আরব আমিরাতের অবস্থানও উল্লেখ করেছে WTTC।
আন্তর্জাতিক বিমান যোগাযোগ, আধুনিক বিমানবন্দর, হোটেল, ব্যবসায়িক পর্যটন এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন আয়োজন UAE-এর পর্যটন অর্থনীতিকে শক্তিশালী করেছে। দেশটিতে আন্তর্জাতিক পর্যটকদের ব্যয় প্রায় ৫৭ বিলিয়ন ডলার পর্যায়ে রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
দীর্ঘমেয়াদি পর্যটন প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে ওমানকেও গুরুত্বপূর্ণ দেশ হিসেবে দেখছে WTTC।
সংস্থাটির পূর্বাভাস অনুযায়ী, ওমানের Travel & Tourism অর্থনীতির আকার ২০৩৬ সালের মধ্যে প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে, যা বর্তমান প্রায় ৭ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি।
দেশটির প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, উপকূলীয় অঞ্চল, মরুভূমি এবং ঐতিহাসিক স্থাপনা আন্তর্জাতিক পর্যটকদের আকর্ষণের গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। অবকাঠামো উন্নয়ন, নতুন পর্যটন গন্তব্য তৈরি এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের মাধ্যমে ওমান পর্যটন বাজারে নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করার চেষ্টা করছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কাতারও আন্তর্জাতিক পর্যটন বাজারে নিজের উপস্থিতি বাড়িয়েছে।
WTTC-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশটির মোট সেবা রপ্তানির প্রায় ৯৪ দশমিক ১ শতাংশের সঙ্গে পর্যটক ব্যয় সম্পর্কিত। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মধ্যে এটি উল্লেখযোগ্য মাত্রার পর্যটন রপ্তানি নির্ভরতা।
আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আয়োজন, ব্যবসায়িক ভ্রমণ, উন্নত বিমান যোগাযোগ এবং আধুনিক অবকাঠামো কাতারের পর্যটন খাতের সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন সরকার এখন পর্যটনকে শুধু ভ্রমণ শিল্প হিসেবে দেখছে না। অর্থনীতিকে আরও বহুমুখী করার কৌশলের অংশ হিসেবেও খাতটিকে ব্যবহার করা হচ্ছে।
এ কারণে হোটেল, বিমানবন্দর, সড়ক যোগাযোগ, বিনোদনকেন্দ্র, সাংস্কৃতিক গন্তব্য এবং পর্যটন অবকাঠামোয় বড় ধরনের বিনিয়োগ করা হচ্ছে। পাশাপাশি পর্যটকদের অভিজ্ঞতা উন্নয়ন, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ বাড়ানো এবং নতুন পর্যটন গন্তব্য তৈরির ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
সৌদি আরবের Vision 2030 এ পরিবর্তনের একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।
WTTC-এর মতে, অতীতের বিভিন্ন সংঘাত ও বৈশ্বিক সংকটের অভিজ্ঞতা পর্যটন খাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য তুলে ধরে। সঠিক নীতি, সমন্বয় ও বিনিয়োগ থাকলে সংকটের পর পর্যটন খাত আবার দ্রুত ঘুরে দাঁড়াতে পারে।
সংকটের সময় মানুষ সাধারণত ভ্রমণ কমিয়ে দেয়। বিমান চলাচলে বিঘ্ন ঘটে এবং পর্যটন ব্যবসাগুলো অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে। কিন্তু পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে ভ্রমণের চাহিদা আবারও বাড়তে পারে।
এ কারণে সরকারি প্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি পর্যটন ব্যবসার মধ্যে সমন্বয়কে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছে WTTC।
মধ্যপ্রাচ্যের পর্যটন খাতের পুনরুদ্ধারে শুধু সরকারি উদ্যোগ যথেষ্ট নয় বলে মনে করছে WTTC। বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণও প্রয়োজন।
বিমান সংস্থা, হোটেল, পর্যটন প্রতিষ্ঠান, প্রযুক্তি কোম্পানি, বিমানবন্দর এবং গন্তব্য ব্যবস্থাপনা সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ পর্যটন খাতকে দ্রুত স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে সহায়তা করতে পারে।
একই সঙ্গে পর্যটকদের কাছে নির্ভুল তথ্য পৌঁছে দেওয়া এবং ভ্রমণ নিরাপত্তা সম্পর্কে পরিষ্কার যোগাযোগ করাও গুরুত্বপূর্ণ।
WTTC-এর প্রেসিডেন্ট ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা গ্লোরিয়া গুয়েভারা মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতিকে চ্যালেঞ্জিং হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ভূরাজনৈতিক
অস্থিরতার প্রভাব পর্যটন খাতে দ্রুত পড়ে। তবে অতীতের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, পর্যটন খাত সংকট কাটিয়ে উঠতে সক্ষম।
WTTC-এর পূর্বাভাসে মধ্যপ্রাচ্যের পর্যটন খাতের জন্য স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি দুটি ভিন্ন চিত্র পাওয়া যাচ্ছে।
স্বল্পমেয়াদে সংঘাত ও আকাশপথে বিঘ্নের কারণে ২০২৬ সালে বড় ধরনের অর্থনৈতিক সংকোচনের আশঙ্কা রয়েছে। অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদে অবকাঠামো বিনিয়োগ, নতুন পর্যটন গন্তব্য, উন্নত যোগাযোগ এবং অর্থনৈতিক বৈচিত্র্যকরণের উদ্যোগ এই খাতকে আবার প্রবৃদ্ধির পথে নিয়ে যেতে পারে।
সৌদি আরব, UAE, ওমান ও কাতারের মতো দেশগুলো ইতোমধ্যে পর্যটনকে তাদের অর্থনৈতিক পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ করেছে। ফলে বর্তমান সংকটকে দীর্ঘমেয়াদিপরিকল্পনার প্রেক্ষাপটে দেখলেমধ্যপ্রাচ্যের পর্যটন খাতের সামনে বড় সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে।
WTTC-এর পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩৬ সালের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের Travel & Tourism GDP প্রায় ৬০৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে।
World Travel & Tourism Council বা WTTC বিশ্বব্যাপী বেসরকারি Travel & Tourism খাতের প্রতিনিধিত্বকারী একটি সংস্থা। হোটেল, বিমান সংস্থা, বিমানবন্দর, ক্রুজ কোম্পানি, ট্যুর অপারেটর, প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্ম ও পর্যটন গন্তব্যসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তারা এর সঙ্গে যুক্ত।
WTTC পর্যটন খাতের টেকসই প্রবৃদ্ধি, সরকারি-বেসরকারি সহযোগিতা এবং নীতিনির্ধারণে কাজ করে। পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে Travel & Tourism খাতের অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব নিয়ে গবেষণা প্রকাশ করে।
অন্যদিকে Chase Travel Group হলো JPMorganChase-এর অধীন একটি বৈশ্বিক ভ্রমণসেবা প্রতিষ্ঠান। ব্যক্তিগত ভ্রমণ পরিকল্পনা, অবকাশ ও ব্যবসায়িক বুকিং, B2B ট্রাভেল সলিউশন, ইভেন্ট সেবা এবং করপোরেট ট্রাভেল কনসালটিংসহ বিভিন্ন সেবা দিয়ে থাকে প্রতিষ্ঠানটি।



