নিউজ বাংলা অনলাইন : নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে বাংলাদেশের রোহিঙ্গা সংকটকে গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের নিরাপদে নিজ দেশে ফিরিয়ে নিতে জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃঢ় এবং কার্যকর সহযোগিতা চেয়েছেন তিনি।
২৪ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে সাধারণ বিতর্কে দেওয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গা সংকটের উৎপত্তি মিয়ানমারে। তাই এর স্থায়ী সমাধানও সেখানেই নিহিত। তাঁর বক্তব্যে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসনের পাশাপাশি প্রত্যাবাসন না হওয়া পর্যন্ত মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখার প্রয়োজনীয়তাও উঠে আসে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশ দীর্ঘ নয় বছরেরও বেশি সময় ধরে মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে আসছে। দীর্ঘদিনের এই পরিস্থিতি বাংলাদেশের সম্পদ, পরিবেশ, নিরাপত্তা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করেছে।
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ ঘনবসতিপূর্ণ একটি দেশ। ফলে বিপুলসংখ্যক বাস্তুচ্যুত মানুষকে দীর্ঘ সময় আশ্রয় দেওয়ার কারণে অর্থনৈতিক ও সামাজিক চাপ ক্রমেই বাড়ছে। এই বাস্তবতায় রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও টেকসই প্রত্যাবাসনকে সংকট সমাধানের মূল পথ হিসেবে তুলে ধরেছেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে প্রত্যাবাসনের জন্য কার্যকর সহযোগিতা চেয়েছেন। একই সঙ্গে রোহিঙ্গারা মিয়ানমারে ফিরে না যাওয়া পর্যন্ত তাদের জন্য জীবনরক্ষাকারী মানবিক সহায়তা কর্মসূচি চালু রাখার আহ্বান জানিয়েছেন।
রোহিঙ্গা সংকট দীর্ঘস্থায়ী হওয়ায় আন্তর্জাতিক সহায়তার ধারাবাহিকতা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্যে মানবিক সহায়তার পাশাপাশি সংকটের মূল কারণ মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক উদ্যোগ জোরদারের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।
তিনি আরো বলেন, বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের ন্যায়বিচার ও স্থায়ী সমাধান নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ব্যর্থ হলে সংকটটি ভবিষ্যতে আরও বড় মানবিক সমস্যায় রূপ নিতে পারে।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ৮১তম অধিবেশনের সময় রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে উচ্চপর্যায়ের আলোচনাও অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেখানে সংকটের মূল কারণ মোকাবিলা এবং রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবর্তনের পরিবেশ তৈরির জন্য আন্তর্জাতিক মনোযোগ অব্যাহত রাখার প্রয়োজনীয়তার কথা উঠে এসেছে।
জাতিসংঘের ভাষণে শুধু রোহিঙ্গা সংকট নয়, বিশ্বজুড়ে চলমান সংঘাত নিয়েও বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক বিরোধ ও সংঘাতের সমাধান আলোচনা, কূটনীতি এবং পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে হওয়া উচিত।
বাংলাদেশ জাতিসংঘকে এমন একটি সমঝোতামূলক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার কেন্দ্র হিসেবে দেখতে চায়, যেখানে রাষ্ট্রগুলো একে অন্যের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে সম্মান করবে।
বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে সংঘাতের কারণে অর্থনীতি, জ্বালানি সরবরাহ এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় যে চাপ তৈরি হচ্ছে, ভাষণে সেটিও তুলে ধরেন তিনি। একই সঙ্গে পারস্পরিক সম্মান ও সমতার ভিত্তিতে রাষ্ট্রগুলোর সম্পর্ক গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে উন্নয়ন ব্যয়ের পরিবর্তে সামরিক খাতে বেশি অর্থ ব্যয়ের প্রবণতা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তারেক রহমান। তিনি নিরস্ত্রীকরণ, পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার রোধ এবং অস্ত্র নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশের অঙ্গীকারের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন।
বাংলাদেশের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমের কথাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের অংশগ্রহণকে আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তায় দেশের অবদানের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে উপস্থাপন করেন তিনি।
বিশেষ করে শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশি নারীদের অংশগ্রহণের বিষয়টি উল্লেখ করে নারী, শান্তি ও নিরাপত্তা কর্মসূচিতে বাংলাদেশের অঙ্গীকারের কথাও জানান।
জাতিসংঘের সাধারণ বিতর্কে ফিলিস্তিন প্রসঙ্গও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। ফিলিস্তিনি জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার এবং স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবির প্রতি বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের সমর্থনের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি।
বিশ্বের বিভিন্ন সংঘাত ও মানবিক সংকটের মধ্যে ফিলিস্তিন প্রশ্নকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আলোচনায় রাখার গুরুত্বও তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে।
জাতিসংঘের মঞ্চে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ উন্নয়ন পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন তারেক রহমান। তিনি সরকারের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার পরিকল্পনাকে ‘রিকভারি, রেস্টোরেশন অ্যান্ড রিকনস্ট্রাকশন’ বা ৩-আর নীতি হিসেবে বর্ণনা করেন।
এই নীতির মাধ্যমে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন এবং দেশের উন্নয়নকে এগিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনার কথা জানান তিনি। তরুণ উদ্যোক্তা ও উদ্ভাবকদের জন্য চলতি অর্থবছরে ৫০ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দের কথাও ভাষণে উল্লেখ করেন। পাশাপাশি বাংলাদেশকে উৎপাদন ও শিল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথা জানান।
সরকারের সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির বিভিন্ন উদ্যোগও জাতিসংঘের মঞ্চে তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। নারী ও পরিবারকেন্দ্রিক সহায়তার পাশাপাশি কৃষক, খেলাধুলা এবং ই-হেলথভিত্তিক বিভিন্ন কার্ড চালুর পরিকল্পনার কথা তিনি জানান।
ভবিষ্যতে এসব উদ্যোগকে সমন্বিত করে একটি ‘ইউনিভার্সাল কার্ড’ চালুর পরিকল্পনার কথাও উল্লেখ করেন তিনি। এর মাধ্যমে নাগরিকদের বিভিন্ন সামাজিক ও সরকারি সুবিধা আরও সমন্বিতভাবে দেওয়ার লক্ষ্য তুলে ধরা হয়েছে।
শিক্ষাকে সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার হিসেবে উল্লেখ করেন তারেক রহমান। তাঁর বক্তব্যে শিক্ষা খাতে বাজেট বাড়ানোর পাশাপাশি আগামী কয়েক বছরে এ খাতে সরকারি ব্যয়ের অংশ আরও বাড়ানোর পরিকল্পনার কথা উঠে আসে।
প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের জন্য বিনামূল্যে ইউনিফর্ম ও দুপুরের খাবারের ব্যবস্থা করার পরিকল্পনার কথাও জানান প্রধানমন্ত্রী। পাশাপাশি শিক্ষাক্রমে খেলাধুলাকে আরও গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেন তিনি।
তরুণদের দক্ষ করে গড়ে তোলা এবং দেশের কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীকে মানবসম্পদে পরিণত করার বিষয়টিও তাঁর বক্তব্যে গুরুত্ব পেয়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় বাংলাদেশের অবস্থানও জাতিসংঘের সামনে তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণে বাংলাদেশের অবদান তুলনামূলকভাবে কম হলেও জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবের ঝুঁকি বাংলাদেশকে বহন করতে হচ্ছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
আগামী পাঁচ বছরে দেশজুড়ে ২৫ কোটি গাছ লাগানোর পরিকল্পনার কথা জানান প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে বন্যা ও খরার ঝুঁকি কমাতে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননের কর্মসূচির কথাও তুলে ধরেন।
সুন্দরবনে মিঠা পানির প্রবাহ বাড়ানোর লক্ষ্যে তিস্তা মহাপরিকল্পনা ও পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রসঙ্গও তাঁর বক্তব্যে আসে। আসন্ন জলবায়ু সম্মেলনে জলবায়ু অর্থায়ন এবং অভিযোজন সহায়তা বাড়ানোর জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
ডিজিটাল প্রযুক্তির সুবিধা থেকে উন্নয়নশীল দেশগুলো পিছিয়ে পড়লে ভবিষ্যতে নতুন ধরনের বৈষম্য তৈরি হতে পারে বলে সতর্ক করেন প্রধানমন্ত্রী। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির ক্ষেত্রে উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে ব্যবধান যেন আরও বড় না হয়, সে বিষয়ে গুরুত্ব দেন তিনি।
উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং সাশ্রয়ী প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ নিশ্চিত করার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধিতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা প্রয়োজন বলেও উল্লেখ করেন।
স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ প্রক্রিয়াকে টেকসই করতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন তারেক রহমান।
তিনি বলেন, উত্তরণ প্রক্রিয়ায় অর্থায়ন, বাজারে প্রবেশাধিকার, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং সক্ষমতা বৃদ্ধির মতো ক্ষেত্রে ধারাবাহিক সহযোগিতা প্রয়োজন। বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর জন্য আন্তর্জাতিক সহায়তার ধারাবাহিকতা বজায় রাখার ওপর তিনি গুরুত্ব দেন।
ভাষণের শেষাংশে প্রধানমন্ত্রী এমন একটি বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন, যেখানে তরুণরা স্বাধীনভাবে নিজেদের স্বপ্ন বাস্তবায়নের সুযোগ পাবে এবং নাগরিকরা সমান অধিকার ও মর্যাদা নিয়ে বসবাস করতে পারবে।
জাতিসংঘের ৮১তম অধিবেশনে তারেক রহমানের প্রথম ভাষণে তাই রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন, বৈশ্বিক শান্তি, জলবায়ু পরিবর্তন, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, শিক্ষা, প্রযুক্তি এবং এলডিসি উত্তরণ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে এসেছে।
এর মধ্যে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বিষয়টি বাংলাদেশের জন্য অন্যতম প্রধান আন্তর্জাতিক অগ্রাধিকার হিসেবে গুরুত্ব পেয়েছে। প্রধানমন্ত্রী স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, সংকটের উৎস যেহেতু মিয়ানমারে, তাই দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের পথও মিয়ানমারেই খুঁজতে হবে। এ লক্ষ্য অর্জনে জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃঢ় এবং কার্যকর সহযোগিতার ওপর জোর দিয়েছেন তিনি।


