নিজস্ব প্রতিবেদক, নিউজ বাংলা : সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক নিয়োগ-২০২৫ ঘিরে নতুন করে জটিলতা তৈরি হয়েছে। লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে চূড়ান্তভাবে সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়ার পরও ভেরিফিকেশন বা প্রশাসনিক যাচাইয়ে বাদ পড়েছেন ৬১ জেলার ২ হাজার ৩৮৫ জন প্রার্থী। তাঁদের অনেকেই এখনো নিয়োগপত্র হাতে পাননি।
প্রার্থীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি প্রার্থী বাদ পড়েছেন সুনামগঞ্জ জেলায়। এ জেলায় বাদ পড়ার সংখ্যা ১২০ জন। বিভাগভিত্তিক হিসাবে সবচেয়ে বেশি বাদ পড়েছেন রংপুর বিভাগে, ৫০৪ জন।
চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত প্রার্থীদের পক্ষ থেকে দ্রুত বিষয়টির সমাধান এবং পুনরায় যাচাইয়ের দাবি জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে ২৮ সেপ্টেম্বরের মধ্যে ইতিবাচক পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা।
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক নিয়োগ-২০২৫ প্রক্রিয়ায় মোট ১৪ হাজার ৩৮৪ জন প্রার্থীকে সহকারী শিক্ষক পদে চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত করা হয়েছিল। লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার ধাপ পেরিয়ে তাঁরা নিয়োগের জন্য সুপারিশপ্রাপ্ত হন।
তবে পরবর্তী সময়ে শুরু হওয়া ভেরিফিকেশন প্রক্রিয়ায় অনেকের নিয়োগ আটকে যায়। প্রার্থীদের দাবি, প্রশাসনিক যাচাই-বাছাইয়ের সময় বিভিন্ন ধরনের অসংগতি ও ভুলের কারণে যোগ্য প্রার্থীদেরও বাদ দেওয়া হয়েছে।
তাঁদের অভিযোগ, বাদ দেওয়ার ক্ষেত্রে অনেক সময় সুস্পষ্ট কারণ জানানো হয়নি। ফলে চূড়ান্ত সুপারিশ পাওয়ার পরও নিয়োগপত্র না পাওয়ায় তাঁদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
প্রার্থীদের দেওয়া জেলাভিত্তিক হিসাব অনুযায়ী, দেশের ৬১ জেলায় মোট ২ হাজার ৩৮৫ জন প্রার্থী ভেরিফিকেশনে বাদ পড়েছেন।
জেলাগুলোর মধ্যে সুনামগঞ্জে সর্বোচ্চ ১২০ জন বাদ পড়েছেন। এরপর দিনাজপুরে ১১৪ জন, যশোরে ১০৬ জন, কুমিল্লায় ১০২ জন এবং ভোলায় ৮৪ জন প্রার্থী বাদ পড়েছেন।
এই সংখ্যা নিয়ে প্রার্থীদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। তাঁদের বক্তব্য, দীর্ঘ একটি নিয়োগপ্রক্রিয়ার সব ধাপ সফলভাবে সম্পন্ন করার পর প্রশাসনিক যাচাইয়ে বাদ পড়ার বিষয়টি স্বচ্ছভাবে ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন।
বিভাগভিত্তিক হিসাবেও ভেরিফিকেশনে বাদ পড়া প্রার্থীর সংখ্যায় বড় পার্থক্য দেখা যাচ্ছে।
রংপুর বিভাগে ৫০৪ জন প্রার্থী বাদ পড়েছেন। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে খুলনা বিভাগ, যেখানে বাদ পড়েছেন ৪২০ জন। চট্টগ্রাম বিভাগে এ সংখ্যা ৩১২ জন।
এ ছাড়া ঢাকা বিভাগে ২৬৮ জন, সিলেট বিভাগে ২৬০ জন, রাজশাহী বিভাগে ২৫৫ জন, বরিশাল বিভাগে ২৫২ জন এবং ময়মনসিংহ বিভাগে ১১৪ জন প্রার্থী বাদ পড়েছেন।
প্রার্থীদের দাবি, এতসংখ্যক সুপারিশপ্রাপ্ত প্রার্থীর নিয়োগ আটকে যাওয়ার কারণ জনসমক্ষে স্পষ্ট করা দরকার।
নিয়োগপত্র নিয়ে তৈরি হওয়া জটিলতার বিষয়ে শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বক্তব্য দিয়েছেন।
তিনি জানিয়েছেন, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক নিয়োগ-২০২৫ নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো হচ্ছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ১ অক্টোবর ২০২৬ পর্যন্ত উত্তীর্ণ কোনো প্রার্থী নিয়োগপত্র না পেলে বিষয়টি পরবর্তী সময়ে যথাযথভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হবে।
পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর দ্রুততম সময়ে পর্যায়ক্রমে নিয়োগপত্র পাঠানোর কথাও জানিয়েছেন তিনি।
মন্ত্রী আরও বলেছেন, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগের ক্ষেত্রে ভেরিফিকেশন বা ভেটিং একটি নিয়মিত প্রশাসনিক প্রক্রিয়া। ফলে নিয়োগের আগে প্রার্থীদের বিভিন্ন তথ্য যাচাই করা হয়।
ভেরিফিকেশনে বাদ পড়া প্রার্থীরা তাঁদের নিয়োগের বিষয়ে পাঁচ দফা দাবি জানিয়েছেন। তাঁদের প্রধান দাবি হলো, যেসব প্রার্থীকে বাদ দেওয়া হয়েছে, তাঁদের নথি নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় আবার যাচাই করতে হবে।
এর পাশাপাশি আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ এবং প্রশাসনিক আপিলের ব্যবস্থা করার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা। কোনো প্রশাসনিক ভুল বা অসংগতি থাকলে তা সংশোধনের কথাও বলা হয়েছে।
চূড়ান্তভাবে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েও যারা নিয়োগপত্র পাননি, তাঁদের বিষয়ে ২৮ সেপ্টেম্বরের মধ্যে কার্যকর ও ইতিবাচক পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি রয়েছে।
এ ছাড়া পুরো নিয়োগপ্রক্রিয়ায় এমন পরিস্থিতি কেন তৈরি হলো, কী কারণে এতসংখ্যক সুপারিশপ্রাপ্ত প্রার্থী বাদ পড়লেন এবং কোথায় প্রশাসনিক অসংগতি হয়েছে—এসব বিষয়ে সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা জনসমক্ষে প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন প্রার্থীরা।
নিয়োগপত্র না পাওয়ায় দেশের বিভিন্ন জেলায় প্রার্থীরা অবস্থান কর্মসূচি ও বিক্ষোভ করেছেন। খুলনা, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও যশোরে নিয়োগের দাবিতে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস এবং জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে কর্মসূচি পালন করা হয়েছে।
প্রার্থীরা বলছেন, লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে চূড়ান্ত সুপারিশ পাওয়ার পরও নিয়োগপত্র না পাওয়া তাঁদের জন্য বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। তাই দ্রুত প্রশাসনিক জটিলতা নিরসনের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
খুলনায় সহকারী শিক্ষক পদে ২৭৫ জনকে নিয়োগের জন্য সুপারিশ করা হয়েছিল। তাঁদের মধ্যে ২৬৫ জন প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেন।
তবে তাঁদের সবাই এখনো নিয়োগপত্র পাননি। তথ্য অনুযায়ী, ১৯৬ জন নিয়োগপত্র পেয়েছেন। বাকি ৬৯ জন এখনো নিয়োগপত্র পাননি।
এ নিয়ে খুলনায় প্রার্থীরা নিয়োগের দাবিতে কর্মসূচি পালন করেছেন।
সুনামগঞ্জে ৬১৭ জন প্রার্থীর নিয়োগপ্রক্রিয়া সম্পন্ন করার জন্য সুপারিশ পাঠানো হয়েছিল। পরবর্তী যাচাই-বাছাইয়ে তাঁদের মধ্যে ১২০ জন বাদ পড়েছেন।
জেলাটিতেই সবচেয়ে বেশি প্রার্থী বাদ পড়ার বিষয়টি সামনে এসেছে। ফলে সেখানে নিয়োগপ্রত্যাশীদের মধ্যে উদ্বেগ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।
মৌলভীবাজারে ৩৪৭ জন প্রার্থী সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে ৬৭ জন এখনো নিয়োগপত্র পাননি।
অন্যদিকে যশোরে ২৯০ জন প্রার্থীকে নিয়োগের জন্য সুপারিশ করা হয়েছিল। তাঁদের মধ্যে ১০৬ জন নিয়োগপত্র পাননি।
প্রার্থীদের অভিযোগ, চূড়ান্ত সুপারিশের পর নিয়োগপত্র পাওয়ার ক্ষেত্রে এমন অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় তাঁরা মানসিক ও আর্থিকভাবে সমস্যায় পড়ছেন।
প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগের এই জটিলতা এখন প্রার্থীদের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। একদিকে প্রার্থীরা ভেরিফিকেশনে বাদ পড়ার কারণ জানতে এবং পুনরায় যাচাইয়ের দাবি জানাচ্ছেন। অন্যদিকে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নিয়োগপত্র না পাওয়া প্রার্থীদের বিষয়টি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে পর্যায়ক্রমে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ অবস্থায় বাদ পড়া প্রার্থীদের দাবি, পুরো প্রক্রিয়াটি স্বচ্ছভাবে পর্যালোচনা করতে হবে। প্রশাসনিক ভুল থাকলে তা সংশোধনের পাশাপাশি যোগ্য প্রার্থীদের নিয়োগের বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে।



