সর্বাধিক পঠিত

spot_img

সর্বশেষ আপডেট...

Homeইতিহাস ও ঐতিহ্যলালবাগ কেল্লার নির্মাণকাজ কেন শেষ হয়নি, জানুন ইতিহাস

লালবাগ কেল্লার নির্মাণকাজ কেন শেষ হয়নি, জানুন ইতিহাস

শুরুর অল্প সময়ের মধ্যেই যুবরাজ আযমকে ঢাকা ছেড়ে দিল্লিতে ফিরে যেতে হয়। এরপর দুর্গটির নির্মাণ আর আগের গতিতে এগোয়নি। শেষ পর্যন্ত অসমাপ্তই থেকে যায় লালবাগ কেল্লা।

স্টাফ রিপোর্টার, নিউজ বাংলা ডেস্ক : ঢাকার বুকে দাঁড়িয়ে থাকা লালবাগ কেল্লা শুধু একটি পুরোনো দুর্গ নয়, এটি মুঘল আমলের ঢাকার ইতিহাস, স্থাপত্য ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের এক গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী। প্রায় সাড়ে তিনশো বছর ধরে অসমাপ্ত অবস্থায় থাকা এই স্থাপনাটি আজ বাংলাদেশের অন্যতম পরিচিত প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন।

একসময় এই দুর্গের নাম ছিল ‘কিল্লা আওরঙ্গবাদ’ বা ‘ফোর্ট আওরঙ্গবাদ’। ১৬৭৮ সালে মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের তৃতীয় ছেলে যুবরাজ মুহাম্মদ আযম ঢাকার সুবাদার থাকাকালে এর নির্মাণকাজ শুরু করেন। উদ্দেশ্য ছিল বুড়িগঙ্গার তীরে একটি আকর্ষণীয় প্রাসাদ-দুর্গ গড়ে তোলা।

কিন্তু নির্মাণ শুরুর অল্প সময়ের মধ্যেই যুবরাজ আযমকে ঢাকা ছেড়ে দিল্লিতে ফিরে যেতে হয়। এরপর দুর্গটির নির্মাণ আর আগের গতিতে এগোয়নি। শেষ পর্যন্ত অসমাপ্তই থেকে যায় লালবাগ কেল্লা।

সাধারণভাবে দুর্গ বলতে সামরিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কথা মনে আসে। কিন্তু লালবাগ কেল্লার পরিকল্পনা ছিল কিছুটা আলাদা।

ইতিহাসবিদদের মতে, যুবরাজ মুহাম্মদ আযম বুড়িগঙ্গার তীরে একটি মনোরম প্রাসাদ নির্মাণের পরিকল্পনা করেছিলেন। প্রাসাদটির নিরাপত্তার জন্য তিনি সেখানে প্রাচীরঘেরা একটি দুর্গ নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন।

অর্থাৎ, এটি শুধু যুদ্ধের সময় প্রতিরক্ষার জন্য তৈরি কোনো সামরিক স্থাপনা ছিল না। বরং রাজপরিবারের বসবাস ও প্রশাসনিক ব্যবহারের বিষয়টিও পরিকল্পনায় ছিল।

অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন তার ‘স্মৃতি বিস্মৃতির নগরী’ বইয়ে উল্লেখ করেছেন, যুবরাজ আযম ঢাকায় অবস্থানকালে বুড়িগঙ্গার তীরে দুর্গ নির্মাণ শুরু করেন। তিনি এর নাম দেন ‘কিল্লা আওরঙ্গবাদ’।

১৬৭৮ সালে নির্মাণকাজ শুরু হওয়ার সময় বাংলার রাজধানী ছিল ঢাকা। মুঘল প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে শহরটির গুরুত্ব তখন যথেষ্ট ছিল।

মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের শাসনামলে যুবরাজ মুহাম্মদ আযম অল্প সময়ের জন্য বাংলার সুবাদারের দায়িত্ব পালন করেন। সেই সময়েই তিনি এই বিশাল স্থাপনা নির্মাণের উদ্যোগ নেন।

পরিকল্পনাটি ছিল বেশ বড়। দুর্গের ভেতরে প্রাসাদ, মসজিদ, প্রশাসনিক স্থাপনা এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় ভবন নির্মাণের কথা ছিল।

তবে সেই পরিকল্পনা পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি।

লালবাগ কেল্লার নির্মাণকাজ বন্ধ হয়ে যাওয়ার পেছনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে উঠে আসে যুবরাজ আযমের ঢাকা ত্যাগের ঘটনা।

নির্মাণকাজ চলার সময় মুঘল সাম্রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে বিদ্রোহ ও রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখা দেয়। এর মধ্যে মারাঠা বিদ্রোহও ছিল গুরুত্বপূর্ণ। পরিস্থিতি সামাল দিতে সম্রাট আওরঙ্গজেব যুবরাজ আযমকে দিল্লিতে ডেকে পাঠান।

ফলে ঢাকায় শুরু করা দুর্গের কাজ আর তার সরাসরি তত্ত্বাবধানে চলতে পারেনি।

১৬৭৯ সালে দ্বিতীয়বারের মতো বাংলার সুবাদার হিসেবে ঢাকায় ফিরে আসেন শায়েস্তা খান। ইতিহাসের বিভিন্ন বর্ণনা অনুযায়ী, যুবরাজ আযম তাকে দুর্গটির নির্মাণকাজ সম্পন্ন করার অনুরোধ জানিয়েছিলেন।

কিন্তু শায়েস্তা খান শেষ পর্যন্ত সেই কাজ এগিয়ে নেননি।

লালবাগ কেল্লা অসমাপ্ত থাকার কারণ নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে একাধিক ব্যাখ্যা রয়েছে।

একটি প্রচলিত ধারণা হলো, শায়েস্তা খান ব্যক্তিগতভাবে এই দুর্গের প্রতি আগ্রহী ছিলেন না। যুবরাজ আযমের উদ্যোগে নির্মিত এই স্থাপনা তিনি পছন্দ করতেন না বলেও কিছু গবেষণায় উল্লেখ পাওয়া যায়।

অধ্যাপক গোলাম রাব্বানীর ব্যাখ্যায়, যুবরাজ আযম ছিলেন শায়েস্তা খানের জামাতা। তার নিজের মেয়ের স্বামী যে দুর্গ নির্মাণ শুরু করেছিলেন, সেটির প্রতি শায়েস্তা খানের বিশেষ আগ্রহ না থাকাও নির্মাণকাজ বন্ধ থাকার একটি কারণ হতে পারে।

তবে এটিই একমাত্র ব্যাখ্যা নয়।

লালবাগ কেল্লার অসমাপ্ত থাকার সঙ্গে সবচেয়ে বেশি যে গল্পটি জড়িয়ে আছে, সেটি শায়েস্তা খানের মেয়ে পরীবিবিকে ঘিরে।

পরীবিবির প্রকৃত নাম ছিল ইরান দুখত। তিনি যুবরাজ মুহাম্মদ আযমের স্ত্রী ছিলেন।

ইতিহাসের কিছু বর্ণনা অনুযায়ী, ১৬৮৪ সালে পরীবিবির অকালমৃত্যুর পর শায়েস্তা খান দুর্গটিকে অশুভ মনে করতে শুরু করেন। সেই কারণেই তিনি এর নির্মাণকাজ আর এগিয়ে নেননি বলে প্রচলিত রয়েছে।

তবে এই গল্পের ঐতিহাসিক সত্যতা নিয়ে গবেষকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।

অনেক ইতিহাসবিদ মনে করেন, পরীবিবির মৃত্যুকে দুর্গ নির্মাণ বন্ধের একমাত্র কারণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং শায়েস্তা খানের ব্যক্তিগত অনাগ্রহ, রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং দুর্গটির প্রয়োজনীয়তা সবকিছু মিলিয়েই নির্মাণকাজ থেমে যেতে পারে।

পরীবিবির মৃত্যুর পর তাকে লালবাগ কেল্লার ভেতরেই সমাহিত করা হয়। পরে তার সমাধির ওপর একটি দৃষ্টিনন্দন সৌধ নির্মাণ করেন শায়েস্তা খান।

বর্তমানে পরীবিবির সমাধি লালবাগ কেল্লার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোর একটি।

বর্গাকার এই সমাধিসৌধের কেন্দ্রে রয়েছে মূল কবর। চার কোণে রয়েছে অষ্টভুজাকৃতির মিনার। সমাধির চারপাশে রয়েছে একাধিক কক্ষ।

নির্মাণশৈলী, উপকরণ এবং অলংকরণের কারণে এটি মুঘল স্থাপত্যের একটি উল্লেখযোগ্য নিদর্শন হিসেবে বিবেচিত হয়।

বর্তমানে লালবাগ কেল্লার ভেতরে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা টিকে আছে। এর মধ্যে রয়েছে পরীবিবির সমাধি, লালবাগ মসজিদ, হাম্মামখানা, দরবার হল, দক্ষিণ ফটক, দুর্গের প্রাচীর ও বুরুজ।

দক্ষিণ ফটকটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। মুঘল স্থাপত্যের বৈশিষ্ট্য ফুটে উঠেছে এর নকশায়। এটি একটি বৃহৎ প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিকল্পনা করা হয়েছিল।

স্থাপনাটির উপরের অংশ পুরোপুরি সম্পন্ন হয়নি। ভেতর থেকে ওপরের তলায় ওঠার জন্য প্রয়োজনীয় সিঁড়িও তৈরি করা হয়নি। এসব অসম্পূর্ণতা থেকেই বোঝা যায়, দুর্গটির মূল নির্মাণ পরিকল্পনা শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়নি।

শায়েস্তা খান ১৬৮৮ সালে অবসর নিয়ে ঢাকা ছেড়ে যাওয়ার পর লালবাগ কেল্লার গুরুত্ব ধীরে ধীরে কমতে থাকে।

একসময় দুর্গটি অনেকটা পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে ছিল। ভবঘুরে ও গৃহহীন মানুষও সেখানে বসবাস করতে শুরু করেন।

সময়ের সঙ্গে দুর্গের প্রাচীর ও বিভিন্ন স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকে। ভেতরের পরিবেশও নষ্ট হয়ে যায়। একসময় কেল্লার ভেতরের পুকুর ও আশপাশের এলাকা অপরিচ্ছন্ন হয়ে পড়ে।

একটি সময় মনে হচ্ছিল, ঢাকার এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটিও হয়তো কালের গর্ভে হারিয়ে যাবে।

ব্রিটিশ শাসনামলে লালবাগ কেল্লাকে বিভিন্ন প্রশাসনিক কাজে ব্যবহার করা হয়। একসময় সেখানে সেনাবাহিনীর ব্যারাক স্থাপন করা হয়েছিল।

১৮৫৩ সালে পুরানা পল্টন থেকে সেনানিবাস লালবাগে স্থানান্তর করা হয়। তবে ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহের পর সেখানে থাকা সেনাবাহিনী সরিয়ে নেওয়া হয়। পরে পুলিশ রিজার্ভ ফোর্সও সেখানে অবস্থান করে।

ব্রিটিশ আমলের শেষ দিকে এবং পাকিস্তান আমলের শুরুতেও দুর্গের বিভিন্ন অংশ প্রশাসনিক ও আবাসিক কাজে ব্যবহৃত হয়েছে।

উনিশ শতকে ঢাকার উন্নয়ন নিয়ে নতুন করে চিন্তাভাবনা শুরু হয়। ১৮৪৪ সালে ঢাকা কমিটি নামে একটি আধা-সরকারি প্রতিষ্ঠান লালবাগ দুর্গের উন্নয়ন ও সংস্কারের উদ্যোগ নেয়।

দুর্গের প্রাচীর ও বিভিন্ন স্থাপনা মেরামতের কাজ করা হয়। ভেতরে বাগানও তৈরি করা হয়। পরিত্যক্ত অবস্থায় থাকা মানুষদের ক্ষতিপূরণ দিয়ে সেখান থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়।

১৮৪৪ থেকে ১৮৪৭ সাল পর্যন্ত সংস্কার ও উন্নয়নের কাজ চলে। এই সময় থেকেই স্থাপনাটি ‘লালবাগ দুর্গ’ নামে বেশি পরিচিত হয়ে ওঠে।

সময় গড়ানোর সঙ্গে লালবাগ কেল্লার ঐতিহাসিক গুরুত্ব নতুন করে সামনে আসে। এটিকে সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয় এবং শেষ পর্যন্ত প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনা হিসেবে এর মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হয়।

১৯১০ সালে লালবাগ দুর্গের প্রাচীর সংরক্ষিত স্থাপত্য হিসেবে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধীনে আনা হয়। পরে বিভিন্ন সময়ে এর সংস্কার ও সংরক্ষণকাজ পরিচালিত হয়েছে।

বিশেষ করে গত শতকের আশির দশকে কেল্লার বিভিন্ন অংশ সংস্কার করে যতটা সম্ভব পুরোনো রূপ ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হয়। এরপর দর্শনার্থীদের জন্য এটি উন্মুক্ত করা হয়।

লালবাগ কেল্লার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য সম্ভবত এর অসম্পূর্ণতাই। একটি বিশাল মুঘল স্থাপনা কীভাবে রাজনৈতিক পরিবর্তন, ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ, পারিবারিক ঘটনা এবং সময়ের প্রবাহে অসমাপ্ত থেকে গেল এই দুর্গ তারই জীবন্ত উদাহরণ।

সাড়ে তিনশো বছর পরও কেল্লার দেয়াল, মসজিদ, সমাধিসৌধ, হাম্মামখানা ও প্রবেশদ্বার ঢাকার মুঘল অতীতের কথা মনে করিয়েদেয়।পরীবিবির মৃত্যু নিয়ে প্রচলিত গল্প হোক কিংবা শায়েস্তা খানের ব্যক্তিগত অনাগ্রহ লালবাগ কেল্লার নির্মাণকাজ কেন শেষ হয়নি, তার পুরো উত্তর আজও একক কোনো ব্যাখ্যায় সীমাবদ্ধ নয়।

তবে একটি বিষয়ে সন্দেহ নেই অসমাপ্ত হয়েও লালবাগ কেল্লা বাংলাদেশের ইতিহাস ও স্থাপত্যের অন্যতম মূল্যবান নিদর্শন। ঢাকার ব্যস্ত নগরজীবনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা এই দুর্গ আজও কয়েক শতাব্দী আগের এক সময়ের গল্প বলে যায়।

আর সেই কারণেই লালবাগ কেল্লা শুধু ইট-পাথরের একটি পুরোনো স্থাপনা নয়; এটি ঢাকার ইতিহাসের এক জীবন্ত স্মারক।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

জনপ্রিয় সংবাদ