চলতি বছরে বর্ষার শুরুটাই যেন একটু অস্বস্তির। জুন মাসে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক কম বৃষ্টি হয়েছে, আর সেই ধারাই জুলাই মাসেও বজায় থাকতে পারে—এমনটাই বলছে আবহাওয়া দপ্তরের পূর্বাভাস। পরিস্থিতি যদি একই রকম থাকে, তাহলে কৃষি, জল সংরক্ষণ এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে এর প্রভাব পড়তে বাধ্য।
এই বছর জুন মাসে দেশের গড় বৃষ্টিপাত স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় ৩৯ শতাংশ কম ছিল। দীর্ঘ দিনের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ১৯০১ সাল থেকে এখন পর্যন্ত যতগুলো জুন মাসে বৃষ্টির ঘাটতি দেখা গেছে, তার মধ্যে এই বছর পঞ্চম স্থানে রয়েছে। অর্থাৎ, এটা কোনও ছোটখাটো বিচ্যুতি নয়—বরং একটা বড় ধরনের সংকেত।
এই কম বৃষ্টির কারণে ইতিমধ্যেই কৃষিক্ষেত্রে প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। বিশেষ করে যেসব এলাকায় বর্ষার উপর নির্ভর করে চাষাবাদ হয়, সেখানে বীজ বপন দেরিতে হচ্ছে কিংবা অনেক জায়গায় এখনও শুরুই হয়নি।
আবহাওয়াবিদদের মতে, জুলাই মাসেও পরিস্থিতি খুব একটা ভালো হবে না। বরং কিছু জায়গায় স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় ৯৪ শতাংশ পর্যন্ত কম বৃষ্টি হতে পারে। সাধারণত ১৯৭১ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে জুলাই মাসে গড়ে ২৮০.৪ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়। কিন্তু এই বছর সেই পরিমাণের অনেকটাই ঘাটতি থাকতে পারে।
মধ্য, পশ্চিম এবং উত্তর ভারতের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে বৃষ্টির অভাব বেশি দেখা যেতে পারে। এতে করে কৃষিজমি শুকিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়বে, আর জলাধারগুলোও দ্রুত ফাঁকা হয়ে যেতে পারে।
যদিও সব জায়গায় একই চিত্র নয়। কিছু অঞ্চলে আবার স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বৃষ্টির সম্ভাবনাও রয়েছে। বিশেষ করে উত্তর-পশ্চিম ভারত, পূর্ব-মধ্য অঞ্চল এবং পূর্ব উপদ্বীপীয় এলাকায় বৃষ্টিপাত তুলনামূলক বেশি হতে পারে। উত্তর-পূর্ব ভারতেও ভালো বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে।
এই ধরনের অসম বণ্টন অনেক সময় সমস্যাকে আরও জটিল করে তোলে। কারণ একদিকে যেখানে খরা, অন্যদিকে সেখানে বন্যার পরিস্থিতিও তৈরি হতে পারে।
এই অস্বাভাবিক আবহাওয়ার পেছনে মূল কারণ হিসেবে ধরা হচ্ছে ‘এল নিনো’ নামের একটি প্রাকৃতিক ঘটনা। সহজভাবে বললে, এটি প্রশান্ত মহাসাগরের একটি উষ্ণ স্রোত, যা কয়েক বছর অন্তর দেখা দেয়।
সাধারণত পূর্ব থেকে পশ্চিমমুখী বাতাস উষ্ণ জলকে ইন্দোনেশিয়া ও অস্ট্রেলিয়ার দিকে ঠেলে দেয়। কিন্তু এল নিনোর সময় সেই বাতাস দুর্বল হয়ে যায়। ফলে উষ্ণ জল পূর্ব দিকে ফিরে এসে দক্ষিণ আমেরিকার উপকূলের দিকে ছড়িয়ে পড়ে। এর ফলে সমুদ্রের তাপমাত্রা বেড়ে যায় এবং তা বিশ্বব্যাপী আবহাওয়ায় প্রভাব ফেলে।
ভারতীয় উপমহাদেশের ক্ষেত্রে, এল নিনো মেঘ তৈরির প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করে। ফলে বর্ষা দুর্বল হয়ে পড়ে এবং বৃষ্টিপাত কমে যায়।
বৃষ্টির ঘাটতি মানেই কৃষিতে বড় ধাক্কা। ইতিমধ্যেই দেখা গেছে, গত বছরের তুলনায় এই বছর খারিফ ফসলের বপন প্রায় ২৩ শতাংশ কম হয়েছে। ডাল, তুলো, সয়াবিন এবং ধানের মতো গুরুত্বপূর্ণ ফসল এতে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
যদি জুলাইয়েও বৃষ্টি না বাড়ে, তাহলে এই ঘাটতি আরও বাড়বে। এতে খাদ্য উৎপাদন কমে যেতে পারে, যার প্রভাব পড়বে বাজারদরেও।
কম বৃষ্টি মানে শুধু কৃষিই নয়, পানীয় জলের উপরও প্রভাব পড়ে। জলাধার, নদী এবং ভূগর্ভস্থ জলের স্তর কমে যেতে পারে। শহরাঞ্চলেও জলসংকট দেখা দিতে পারে, বিশেষ করে যেসব জায়গা বর্ষার উপর নির্ভরশীল।
তবে পুরো পরিস্থিতি যে একেবারে হতাশাজনক, তা নয়। আবহাওয়াবিদরা জানিয়েছেন, বঙ্গোপসাগরে একটি নিম্নচাপ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এর ফলে কিছু অঞ্চলে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাত হতে পারে।
এছাড়া মরসুমি অক্ষরেখা কিছুটা দক্ষিণে সরে যাওয়ায় উত্তর ও মধ্য ভারতে বৃষ্টির পরিমাণ কিছুটা বাড়তে পারে। যদিও এটি স্থায়ী সমাধান নয়, তবুও সাময়িক স্বস্তি দিতে পারে।
অস্ট্রেলিয়ার আবহাওয়া দপ্তরের মতে, বর্ষার দ্বিতীয় ভাগে—অগস্ট ও সেপ্টেম্বরে—বৃষ্টির পরিমাণ বাড়তে পারে। এর পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে ভারত মহাসাগরের একটি প্রক্রিয়া, যাকে বলা হয় ‘ইন্ডিয়ান ওশান ডাইপোল’ (IOD)।
এই প্রক্রিয়া ইতিবাচক হলে, তা বর্ষাকে শক্তিশালী করতে সাহায্য করতে পারে। ফলে বর্ষার শেষ দিকে কিছুটা ঘাটতি পূরণ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, এই বছরের বর্ষা শুরু থেকেই অনিশ্চয়তায় ভরা। জুনে কম বৃষ্টির পর জুলাইয়েও যদি একই পরিস্থিতি থাকে, তাহলে তার প্রভাব অনেক ক্ষেত্রেই পড়বে। তবে প্রাকৃতিক কিছু পরিবর্তন পরিস্থিতি কিছুটা সামাল দিতে পারে।
এখন সব নজর আকাশের দিকে—কখন মেঘ জমবে, আর কখন নামবে সেই কাঙ্ক্ষিত বৃষ্টি।


