রাহুল রাহা,এনবি সংবাদ, আর্ন্তজাতিক ডেস্ক : আন্তর্জাতিক মঞ্চে ভারতের কূটনৈতিক গুরুত্ব যেমন বাড়ছে, তেমনই বিশ্বের সামনে দেশের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও দেশীয় পণ্য তুলে ধরার ক্ষেত্রেও নতুন উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে। নয়াদিল্লিতে আয়োজিত ব্রিকস সম্মেলনকে ঘিরে তারই এক অভিনব উদাহরণ সামনে এসেছে। সম্মেলনের খবর সংগ্রহ করতে আসা দেশি-বিদেশি সাংবাদিকদের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে বিশেষ ‘ব্রিকস ব্যাগ’। আর সেই ব্যাগ খুললেই মিলছে ভারতের বিভিন্ন প্রান্তের পরিচিত ও ঐতিহ্যবাহী সামগ্রীর ছোঁয়া।
শনিবার থেকে নয়াদিল্লির ভারত মণ্ডপমে শুরু হচ্ছে দু’দিনের ব্রিকস সম্মেলন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধান ও প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে এই আন্তর্জাতিক সম্মেলন ঘিরে রাজধানীতে সাজ সাজ রব। অতিথি আপ্যায়ন থেকে নিরাপত্তা, সংবাদমাধ্যমের কাজের পরিকাঠামো—সব ক্ষেত্রেই নেওয়া হয়েছে বিশেষ প্রস্তুতি।
এই বিশাল আয়োজনের অন্যতম আকর্ষণ হয়ে উঠেছে সাংবাদিকদের জন্য তৈরি করা বিশেষ ব্রিকস ব্যাগ।
ব্রিকস সম্মেলনের খবরাখবর সংগ্রহ করতে ভারত মণ্ডপমে ভিড় করেছেন দেশি-বিদেশি প্রায় ১২০০ থেকে ১৩০০ সাংবাদিক। তাঁদের কাজের সুবিধার পাশাপাশি ভারতীয় সংস্কৃতি ও দেশীয় পণ্যের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে বিশেষ উপহারের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
ব্রিকসের পদ্ম-লোগো দেওয়া ব্যাগটি শুধু সাধারণ সম্মেলন সামগ্রীতে ভরা নয়। এর মধ্যে রাখা হয়েছে ভারতের বিভিন্ন রাজ্য ও অঞ্চলের জনপ্রিয় সামগ্রী। অর্থাৎ একজন বিদেশি সাংবাদিক ব্যাগটি খুললেই একসঙ্গে ভারতের বিভিন্ন প্রান্তের স্বাদ, শিল্প ও সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন।
ব্রিকস ব্যাগে রয়েছে বিহারের ছাতু ও মাখানা। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে জনপ্রিয় এই খাবারগুলি বিদেশি সাংবাদিকদের ভারতীয় খাদ্যসংস্কৃতির সঙ্গে পরিচয় করানোর অন্যতম মাধ্যম হয়ে উঠেছে।
মাখানা বর্তমানে ভারতীয় খাদ্যপণ্যের আন্তর্জাতিক বাজারেও পরিচিত নাম। অন্যদিকে ছাতু ভারতের ঐতিহ্যবাহী খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। ফলে সাংবাদিকদের হাতে এই ধরনের দেশীয় খাবার তুলে দেওয়ার মাধ্যমে ভারতের আঞ্চলিক স্বাদের বৈচিত্র্যও তুলে ধরা হচ্ছে।
খাবারের পাশাপাশি পানীয়ের ক্ষেত্রেও রয়েছে বিশেষ চমক। ব্যাগে রাখা হয়েছে ওড়িশার পাহাড়ি এলাকায় উৎপাদিত আদিবাসীদের হাতে তৈরি ১০০ শতাংশ খাঁটি আরাবিকা কফি।
ভারতের কফি উৎপাদনের মানচিত্রে ওড়িশার পাহাড়ি অঞ্চল হয়তো এখনও তুলনামূলক কম পরিচিত। কিন্তু সেখানকার আদিবাসী সম্প্রদায়ের হাতে তৈরি কফি নিজস্ব বৈশিষ্ট্যের জন্য বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
বিদেশি সাংবাদিকদের কাছে এই কফি পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যমে দেশের তুলনামূলক কম পরিচিত অঞ্চলগুলির পণ্যকেও আন্তর্জাতিক মঞ্চে তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
কফির সঙ্গে দেওয়া হয়েছে একটি বিশেষ কফি মাগও। ফলে ব্রিকস সম্মেলনের স্মারক হিসেবে এটি সাংবাদিকদের কাছে বেশ আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে।
ব্রিকস ব্যাগে শুধু খাবার বা পানীয়ই নেই। রয়েছে ভারতের ঐতিহ্যবাহী বস্ত্রশিল্পের নিদর্শনও। ব্যাগ খুললে পাওয়া যাচ্ছে গুজরাটি ব্লক প্রিন্ট বা আজরাখ প্রিন্টের স্টোল।
আজরাখ প্রিন্ট ভারতের ঐতিহ্যবাহী হস্তশিল্পের অন্যতম পরিচিত নাম। নকশা, রং এবং হাতে তৈরি প্রক্রিয়ার কারণে এই ধরনের বস্ত্রের আলাদা পরিচিতি রয়েছে।
আন্তর্জাতিক সম্মেলনে অংশ নেওয়া সাংবাদিকদের হাতে এমন একটি স্টোল তুলে দেওয়া নিছক উপহার নয়। এর মাধ্যমে ভারতের কারুশিল্প ও স্থানীয় শিল্পীদের কাজকেও বিশ্বের সামনে তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
ব্রিকস ব্যাগের পরিকল্পনায় শুধু সংস্কৃতি বা ঐতিহ্যের কথা ভাবা হয়নি। সাংবাদিকদের বাস্তব প্রয়োজনের কথাও মাথায় রাখা হয়েছে।
ব্যাগে রয়েছে ইন-বিল্ট চার্জিং পোর্ট। ফলে সাংবাদিকরা প্রয়োজনের সময় মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ বা অন্যান্য ইলেকট্রনিক ডিভাইস চার্জ করার সুবিধা পাবেন।
আন্তর্জাতিক সম্মেলনে সাংবাদিকদের কাজের একটি বড় অংশই এখন নির্ভর করে স্মার্টফোন, ল্যাপটপ এবং অন্যান্য ডিজিটাল ডিভাইসের উপর। তাই এই চার্জিং সুবিধা তাঁদের জন্য বাস্তবিকভাবেই কাজে লাগতে পারে।
ব্যাগটির নকশাতেও রয়েছে আন্তর্জাতিক সম্মেলনের সঙ্গে ভারতীয় সংস্কৃতির সমন্বয়। ব্রিকসের পদ্ম-লোগো দেওয়া টোট ব্যাগটি একদিকে যেমন সাংবাদিকদের প্রয়োজনীয় সামগ্রী বহনের কাজে লাগবে, তেমনই সম্মেলনের স্মারক হিসেবেও থেকে যাবে।
একটি ব্যাগের মধ্যে খাবার, কফি, বস্ত্র, প্রযুক্তিগত সুবিধা—সবকিছু একসঙ্গে রাখার পরিকল্পনাটি তাই বেশ অভিনব।
ব্রিকস সম্মেলনের সংবাদ সংগ্রহের জন্য ভারত মণ্ডপমে আলাদা করে ইন্টারন্যাশনাল মিডিয়া সেন্টার তৈরি করা হয়েছে। দেশ-বিদেশের সাংবাদিকরা এখান থেকেই সম্মেলনের বিভিন্ন খবর সংগ্রহ ও প্রতিবেদন তৈরির সুযোগ পাবেন।
বিপুল সংখ্যক সাংবাদিকের উপস্থিতি মাথায় রেখে তাঁদের কাজের সুবিধার জন্য বিভিন্ন ব্যবস্থা করা হয়েছে। সেই ব্যবস্থারই একটি অংশ হিসেবে দেওয়া হচ্ছে বিশেষ ব্রিকস ব্যাগ।
তবে ব্যাগটির তাৎপর্য শুধুমাত্র সাংবাদিকদের সুবিধার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর মধ্যে দিয়ে ভারতের বিভিন্ন প্রান্তের পণ্য ও সংস্কৃতিকে আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিদের কাছে তুলে ধরার একটি সুযোগও তৈরি হয়েছে।
ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের নিজস্ব পণ্য ও হস্তশিল্প রয়েছে। কিন্তু দেশের বাইরে সব পণ্যের সমান পরিচিতি নেই। আন্তর্জাতিক সম্মেলনের মতো বড় মঞ্চে সেগুলিকে তুলে ধরলে বিদেশি অতিথি ও সাংবাদিকদের মধ্যে সেই পণ্যগুলির বিষয়ে আগ্রহ তৈরি হতে পারে।
বিহারের মাখানা ও ছাতু থেকে ওড়িশার আরাবিকা কফি, আবার গুজরাট



