রুপক মূখার্জী,আর্ন্তজাতিক ডেস্ক : একসময় এই খাবার ছিল রাজদরবারের সঙ্গে জড়িত। মোগল বাদশাহদের বিলাসী খাবারের টেবিলে এর ব্যবহার ছিল বেশ অদ্ভুত। আজকের মতো তখন খাবারের পাশে আলাদা ন্যাপকিন রাখার ব্যবস্থা ছিল না। তেল, ঘি ও মশলায় ভরা কাবাব-কোরমা খাওয়ার পর হাত পরিষ্কার করার জন্য প্রয়োজন হতো পাতলা এক ধরনের রুটির।
সেই রুটিই সময়ের সঙ্গে বদলে যায়। হাত মোছার কাজে ব্যবহৃত সেই ফিনফিনে রুটি একসময় রাজকীয় খাবারের অংশ হয়ে ওঠে। পরে রাজদরবারের সীমানা পেরিয়ে পৌঁছে যায় সাধারণ মানুষের রান্নাঘরে।
আজ কষা মাংস, ডিম তড়কা, চিকেন কষা কিংবা নানা ধরনের মাংসের ঝোলের সঙ্গে রুমালি রুটি বাঙালির অত্যন্ত পরিচিত একটি খাবার। কলকাতা থেকে ঢাকার রেস্তরাঁ—দুই বাংলাতেই এর জনপ্রিয়তা চোখে পড়ার মতো।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, হাত মোছার জন্য তৈরি হওয়া একটি পাতলা রুটি কীভাবে হয়ে উঠল প্রিয় খাবার?
রুমালি রুটির নামের পেছনে ‘রুমাল’
রুমালি রুটির নাম শুনলেই প্রথমে মনে আসে রুমালের কথা। নামটির সঙ্গে এর ব্যবহারের ইতিহাসেরও একটি সম্পর্ক রয়েছে।
‘রুমাল’ শব্দটি ফার্সি ও উর্দু ভাষায় হাত মোছার কাপড় বোঝাতে ব্যবহৃত হয়। রুমালি রুটিও এতটাই পাতলা ও নরম যে সেটি অনেকটা কাপড়ের মতো দেখায়। ফলে এর সঙ্গে ‘রুমাল’ শব্দটির সম্পর্ক তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়।
কথিত আছে, মোগল দরবারে অতিরিক্ত তেল-ঘি ও মশলাদার খাবার খাওয়ার পর হাত পরিষ্কার করতে এই পাতলা রুটি ব্যবহার করা হতো। তবে সময়ের সঙ্গে খাবার হিসেবে এর ব্যবহারই বেশি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
রাজদরবারের বাবুর্চিরা বুঝতে পারেন, পাতলা রুটিটি শুধু হাত মোছার জন্য নয়, বরং ঝোলযুক্ত খাবারের সঙ্গেও দারুণ মানিয়ে যায়। বিশেষ করে মাংসের ঘন ঝোল বা কোরমার সঙ্গে রুটি ডুবিয়ে খেলে তা সহজেই ঝোল শুষে নেয়। সেখান থেকেই রুমালি রুটির নতুন পরিচয় তৈরি হতে শুরু করে।
মোগল দরবারে কীভাবে বদলে গেল রুটির পরিচয়?
রুমালি রুটির ইতিহাসকে শুধু মোগল আমলের সঙ্গে আটকে দেখলে পুরো গল্পটি পাওয়া যায় না। পাতলা রুটি তৈরির ঐতিহ্য আরও পুরোনো বলে মনে করা হয়।
পারস্য এবং মধ্য এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে অতিপাতলা রুটির প্রচলন ছিল। মধ্য এশিয়ার কিছু রুটি এবং পারস্যের ‘থিরি’ ধরনের রুটির সঙ্গে রুমালি রুটির মিলের কথা খাদ্য ইতিহাসে উল্লেখ করা হয়।
রেশমপথ ধরে ব্যবসায়ী, পর্যটক ও যোদ্ধাদের চলাচলের মাধ্যমে নানা ধরনের খাবার ও রান্নার কৌশল এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছিল। পাতলা রুটি তৈরির কৌশলও সেই সাংস্কৃতিক আদান-প্রদানের অংশ হয়ে থাকতে পারে।
শুষ্ক ও মরুভূমি অঞ্চলে দীর্ঘ যাত্রার সময় দ্রুত তৈরি করা যায়, এমন খাবারের প্রয়োজন ছিল। পাতলা রুটি সেই প্রয়োজন মেটাতে পারত। পরে ভারতীয় উপমহাদেশে এসে স্থানীয় উপকরণ, রান্নার কৌশল এবং রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতার কারণে এই ধরনের রুটি নতুন রূপ পায়।
হাতের মুঠোয় নয়, বাতাসে ঘুরিয়ে তৈরি রুমালি রুটি
রুমালি রুটির সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় হলো এর তৈরির কৌশল।
সাধারণ রুটির মতো মোটা করে বেলে তাওয়ায় সেঁকে নিলেই রুমালি রুটি তৈরি হয় না। বরং এর মণ্ডকে অত্যন্ত পাতলা করে ছড়িয়ে দিতে হয়।
অভিজ্ঞ রাঁধুনিরা মণ্ডের লেচি হাতে নিয়ে বাতাসে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ছড়িয়ে দেন। এতে রুটির আকার বড় হয় এবং পুরুত্ব কমতে থাকে। যত বেশি দক্ষতার সঙ্গে মণ্ড ছড়ানো যায়, রুটি ততই পাতলা ও মসৃণ হয়।
রেস্তরাঁয় অনেক সময় দেখা যায়, বাবুর্চি মণ্ড হাতে নিয়ে এক ধরনের ছন্দে বাতাসে ঘুরিয়ে নিচ্ছেন। মুহূর্তের মধ্যেই ছোট একটি লেচি বিশাল পাতলা রুটির আকার নেয়। এই দৃশ্য রুমালি রুটিকে শুধু খাবার নয়, এক ধরনের রান্নার শিল্পেও পরিণত করেছে।
তবে বাড়িতে এই কৌশল আয়ত্ত করা কঠিন হতে পারে। তাই ঘরোয়া পদ্ধতিতে বেলন ব্যবহার করেও খুব পাতলা করে রুটি তৈরি করা যায়।
অওধ থেকে কলকাতা, রুমালি রুটির নতুন যাত্রা
রুমালি রুটির সঙ্গে বাংলার সম্পর্কের কথা বলতে গেলে অওধের শেষ নবাব ওয়াজিদ আলি শাহের কলকাতায় আগমনের ইতিহাস গুরুত্বপূর্ণ।
১৮৫৬ সালে ব্রিটিশদের হাতে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর ওয়াজিদ আলি শাহকে কলকাতার মেটিয়াবুরুজে নির্বাসিত জীবন কাটাতে হয়। তাঁর সঙ্গে এসেছিলেন রাজদরবারের বহু কর্মী, বাবুর্চি ও খানসামা।
তাঁদের হাত ধরে অওধের নানা রাজকীয় রান্না কলকাতার খাদ্য সংস্কৃতিতে প্রবেশ করে। বিরিয়ানি থেকে শুরু করে বিভিন্ন মাংসের পদ—অনেক খাবারের মতো রুমালি রুটিও এই সাংস্কৃতিক আদান-প্রদায়ের মাধ্যমে বাংলায় পরিচিতি পায় বলে মনে করা হয়।
মেটিয়াবুরুজ ধীরে ধীরে অওধি খাদ্যসংস্কৃতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে ওঠে। এখানকার রান্নার প্রভাব কলকাতার অন্য এলাকাতেও ছড়িয়ে পড়ে।
বাঙালির হেঁশেলে কীভাবে ঢুকে গেল রুমালি রুটি?
রাজদরবারের খাবার সাধারণ মানুষের খাবারে পরিণত হতে সময় লাগে। রুমালি রুটির ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি।
বিশ শতকের মাঝামাঝি সময় থেকে কলকাতার বিভিন্ন রেস্তরাঁ ও খাবারের দোকানে রুমালি রুটির জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে। বিশেষ করে কাবাব, কষা মাংস, মুঘলাই রান্না এবং নানা ধরনের ঝোলযুক্ত খাবারের সঙ্গে এটি পরিবেশন করা শুরু হয়।
ধীরে ধীরে রেস্তরাঁর গণ্ডি পেরিয়ে এটি পৌঁছে যায় সাধারণ পরিবারের খাবারের তালিকায়।
বাংলার মানুষের খাবারের অভ্যাসের সঙ্গেও রুমালি রুটি সহজেই মানিয়ে যায়। ভাতের পাশাপাশি রুটি বাঙালির কাছে নতুন কিছু নয়। কিন্তু সাধারণ রুটির তুলনায় রুমালি রুটি অনেক বেশি নরম, পাতলা ও হালকা। ফলে মাংসের ঝোল বা ডিমের তরকারির সঙ্গে এটি বেশ উপভোগ্য হয়ে ওঠে।
আজ কষা মাংসের প্লেটে রুমালি রুটি দেখলে অনেকেরই আর অবাক লাগে না।
শুধু মাংস নয়, নানা পদের সঙ্গেও রুমালি রুটি
রুমালি রুটির জনপ্রিয়তার অন্যতম কারণ হলো এর বহুমুখী ব্যবহার।
ঘন মাংসের ঝোলের সঙ্গে যেমন এটি ভালো মানায়, তেমনই ডিম তড়কা, চিকেন কষা, পনিরের পদ কিংবা বিভিন্ন নিরামিষ তরকারির সঙ্গেও খাওয়া যায়।
রুটিটি অত্যন্ত পাতলা হওয়ায় খাবারের মূল স্বাদকে ঢেকে দেয় না। বরং তরকারির ঝোল ও মশলার স্বাদ নিজের সঙ্গে নিয়ে মুখে পৌঁছে দেয়।
এ কারণেই রেস্তরাঁয় অনেক সময় বিরিয়ানি বা ভারী খাবারের পাশাপাশি মাংসের পদ খাওয়ার সময় রুমালি রুটিও বেছে নেন অনেকে।
বাড়িতেই কীভাবে বানাবেন রুমালি রুটি?
রেস্তরাঁর বাবুর্চিদের মতো বাতাসে ঘুরিয়ে রুমালি রুটি তৈরি করতে না পারলেও বাড়িতে সহজ পদ্ধতিতে এটি বানানো সম্ভব।
প্রয়োজনীয় উপকরণ
২ কাপ ময়দা
আধা কাপ আটা
১ চা-চামচ লবণ
২ টেবিল-চামচ তেল
প্রায় ১ কাপ দুধ
রুমালি রুটি তৈরির পদ্ধতি
প্রথমে একটি বড় পাত্রে ময়দা, আটা ও লবণ ভালোভাবে মিশিয়ে নিন। চাইলে শুধু ময়দা দিয়েও রুটি তৈরি করতে পারেন।
এরপর অল্প অল্প করে দুধ দিয়ে মণ্ড তৈরি করুন। মণ্ডটি শক্ত হবে না। বরং নরম ও কিছুটা আঠালো রাখতে হবে।
মণ্ডে তেল দিয়ে অন্তত পাঁচ মিনিট ভালোভাবে মেখে নিন। যত ভালো করে মণ্ড মাখবেন, রুটির গঠন তত নরম হবে।
এরপর মণ্ডের গায়ে সামান্য তেল মাখিয়ে পাত্রটি ঢেকে রাখুন। অন্তত চার ঘণ্টা বিশ্রাম দিলে মণ্ড আরও নমনীয় হবে।
বিশ্রাম নেওয়া মণ্ড থেকে ছোট ছোট লেচি কেটে নিন। সামান্য ময়দা ছড়িয়ে প্রতিটি লেচি যতটা সম্ভব পাতলা করে বেলে নিন।
এবার একটি কড়াই বা তাওয়া উল্টো করে চুলার ওপর বসিয়ে ভালোভাবে গরম করুন। আঁচ মাঝারি থেকে বেশি রাখতে পারেন।
রুটিটি হাতে নিয়ে আরও একটু টেনে পাতলা করে গরম উল্টো কড়াইয়ের ওপর দিন। অল্প সময়ের মধ্যেই রুটির গায়ে ছোট ছোট বুদবুদ দেখা যাবে। তখন সেটি উল্টে দিন।
একটি পরিষ্কার কাপড় দিয়ে হালকা চাপ দিয়ে চারপাশ সেঁকে নিন। বেশি সময় ধরে রাখবেন না। তাহলে রুটি শক্ত হয়ে যেতে পারে।
রুটি তৈরি হয়ে গেলে সেটিকে রুমালের মতো ভাঁজ করে গরম গরম পরিবেশন করুন।
রাজদরবারের খাবার থেকে সাধারণ মানুষের প্লেটে
রুমালি রুটির গল্প আসলে শুধু একটি খাবারের ইতিহাস নয়। এটি ভারতীয় উপমহাদেশের খাদ্যসংস্কৃতির পরিবর্তনেরও একটি চমৎকার উদাহরণ।
একসময় যে খাবার রাজদরবারের সঙ্গে যুক্ত ছিল, সেটিই পরে সাধারণ মানুষের রেস্তরাঁর টেবিলে জায়গা করে নিয়েছে। আরও পরে সেই খাবার পৌঁছে গেছে ঘরের রান্নাঘরে।
খাবারের ইতিহাসে এমন ঘটনা নতুন নয়। রাজা-বাদশাহদের রান্নাঘরের অনেক পদই সময়ের সঙ্গে সাধারণ মানুষের খাবারে পরিণত হয়েছে। রুমালি রুটিও সেই ধারার একটি সুস্বাদু উদাহরণ।
আজ তাই কষা মাংসের সঙ্গে নরম রুমালি রুটি দেখলে তার পেছনের দীর্ঘ ইতিহাসের কথা আমাদের মনে নাও পড়তে পারে। কিন্তু প্রতিটি পাতলা রুটির ভাঁজে যেন লুকিয়ে আছে মোগল দরবার, অওধের রাজকীয় রান্নাঘর, মেটিয়াবুরুজের খাদ্যসংস্কৃতি এবং শেষ পর্যন্ত বাঙালির নিজের হেঁশেলের গল্প।
হাত মোছার ‘কাপড়’ থেকে পছন্দের খাবার—রুমালি রুটির এই যাত্রাই তাকে দিয়েছে আলাদা পরিচয়।



