নিজস্ব প্রতিবেদক, তরিকুল ইসলাম, ৭ সেপ্টেম্বর : দীর্ঘদিন আগে অবসরে যাওয়া এবং তুলনামূলক কম পেনশন পাওয়া অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারীদের জন্য বড় ধরনের স্বস্তির খবর এসেছে। সরকার নিট পেনশন সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে এই বৃদ্ধি সবার জন্য একই হারে কার্যকর হবে না। বর্তমানে যে পরিমাণ নিট পেনশন পাওয়া যাচ্ছে, তার ওপর ভিত্তি করে পাঁচটি স্তরে বাড়ানোর হার নির্ধারণ করা হয়েছে।
কম পেনশন পাওয়া ব্যক্তিরা তুলনামূলক বেশি হারে সুবিধা পাবেন। অন্যদিকে, যাদের বর্তমান নিট পেনশনের পরিমাণ বেশি, তাদের ক্ষেত্রে বৃদ্ধির হার কিছুটা কম হবে। এর ফলে নিম্ন পেনশনধারীদের আর্থিক চাপ কমানোর পাশাপাশি অবসর-পরবর্তী জীবনে তাদের জীবনযাত্রার ব্যয় সামলানো কিছুটা সহজ হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
অবসরের পর অনেক সরকারি কর্মচারীর আয়ের প্রধান উৎস হয়ে দাঁড়ায় মাসিক পেনশন। দীর্ঘ সময় আগে অবসরে যাওয়া ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে বর্তমান বাজারদর ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে পুরোনো পেনশনের সামঞ্জস্য অনেক সময় থাকে না। বিশেষ করে কম পেনশন পাওয়া অবসরপ্রাপ্তদের জন্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, চিকিৎসা ও অন্যান্য ব্যয় বহন করা কঠিন হয়ে পড়ে।
এ বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সরকার পেনশন বৃদ্ধির ক্ষেত্রে একটি স্তরভিত্তিক পদ্ধতি গ্রহণ করেছে। অর্থাৎ যার পেনশন যত কম, তার বৃদ্ধির হার তত বেশি রাখা হয়েছে। এতে অপেক্ষাকৃত কম আয়ের পেনশনভোগীরা বেশি সুবিধা পাবেন।
মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বর্তমানে একজন পেনশনভোগী যে নিট পেনশন পাচ্ছেন, সেটিকে ভিত্তি ধরে পাঁচটি শ্রেণিতে বৃদ্ধির হার নির্ধারণ করা হয়েছে।
এই শ্রেণির পেনশনভোগীদের নিট পেনশন ১০০ শতাংশ বাড়বে। অর্থাৎ বর্তমানে ৯ হাজার টাকা পেনশন পাওয়া ব্যক্তি বৃদ্ধি পাওয়ার পর ১৮ হাজার টাকা পাবেন।
এই স্তরে পেনশন বাড়বে ৭৫ শতাংশ। উদাহরণ হিসেবে, কারও বর্তমান নিট পেনশন ২০ হাজার টাকা হলে ৭৫ শতাংশ বৃদ্ধির পর তা দাঁড়াবে ৩৫ হাজার টাকা।
এই শ্রেণিতে বৃদ্ধির হার নির্ধারণ করা হয়েছে ৬৫ শতাংশ। ফলে ৩০ হাজার টাকা নিট পেনশন পাওয়া ব্যক্তির নতুন পেনশন হবে ৪৯ হাজার ৫০০ টাকা।
এই স্তরে পেনশন বাড়বে ৬০ শতাংশ। ফলে ৪০ হাজার টাকা নিট পেনশন পাওয়া ব্যক্তির মাসিক পেনশন দাঁড়াবে ৬৪ হাজার টাকা।
সবচেয়ে বেশি পেনশন পাওয়া এই শ্রেণির জন্য বৃদ্ধির হার নির্ধারণ করা হয়েছে ৫৫ শতাংশ। অর্থাৎ বর্তমান নিট পেনশনের সঙ্গে ৫৫ শতাংশ যোগ হয়ে নতুন পরিমাণ নির্ধারিত হবে।
পেনশন বৃদ্ধির বিষয়টি আরও সহজভাবে বুঝতে কয়েকটি উদাহরণ দেখা যাক। ধরুন, কোনো অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী বর্তমানে মাসে ৯ হাজার টাকা নিট পেনশন পান। ১০০ শতাংশ বৃদ্ধির পর তিনি পাবেন ১৮ হাজার টাকা।
আবার কারও বর্তমান নিট পেনশন যদি ২০ হাজার টাকা হয়, তাহলে ৭৫ শতাংশ বৃদ্ধিতে অতিরিক্ত ১৫ হাজার টাকা যোগ হবে। ফলে নতুন পেনশন হবে ৩৫ হাজার টাকা।
একইভাবে ৩০ হাজার টাকা পেনশন পাওয়া ব্যক্তির ক্ষেত্রে ৬৫ শতাংশ বৃদ্ধি অর্থাৎ ১৯ হাজার ৫০০ টাকা যোগ হবে। এতে মোট পেনশন দাঁড়াবে ৪৯ হাজার ৫০০ টাকা।
৪০ হাজার টাকা নিট পেনশন পাওয়া ব্যক্তির ক্ষেত্রে ৬০ শতাংশ বৃদ্ধি হিসেবে অতিরিক্ত ২৪ হাজার টাকা যুক্ত হবে। ফলে নতুন পেনশনের পরিমাণ হবে ৬৪ হাজার টাকা।
আর ৪০ হাজার ১ টাকা বা তার বেশি নিট পেনশন পাওয়া ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে ৫৫ শতাংশ হারে বৃদ্ধি কার্যকর হবে।
সরকারের নির্ধারিত কাঠামোটি মূলত পেনশনের পরিমাণ অনুযায়ী সুবিধা দেওয়ার একটি পদ্ধতি। এখানে কম পেনশন পাওয়া ব্যক্তিদের জন্য বেশি শতাংশ বৃদ্ধি রাখা হয়েছে। ফলে তুলনামূলক কম আয়ের পেনশনভোগীরা তাদের বর্তমান আয়ের তুলনায় বড় ধরনের আর্থিক সুবিধা পাবেন।
অন্যদিকে, বেশি পেনশন পাওয়া ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে শতাংশের হার কম হলেও মোট টাকার হিসাবে তাদের পেনশন বৃদ্ধির পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হতে পারে। যেমন ৪০ হাজার টাকা পেনশনে ৬০ শতাংশ বৃদ্ধি হলে ২৪ হাজার টাকা যোগ হচ্ছে। অর্থাৎ শতাংশ কম-বেশি হলেও প্রত্যেক স্তরে বর্তমান পেনশনের ভিত্তিতে নতুন অঙ্ক নির্ধারিত হবে।
পেনশন বৃদ্ধির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বর্তমানে একজন পেনশনভোগী যে নিট পেনশন পাচ্ছেন, সেটিকেই ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হবে। তাই শুধু মূল পেনশনের অঙ্ক দেখলে নতুন পেনশনের প্রকৃত পরিমাণ বোঝা যাবে না।
একজন পেনশনভোগীর হাতে বর্তমানে যে নিট অর্থ যাচ্ছে, তার ওপর নির্ধারিত শতাংশ অনুযায়ী বৃদ্ধি হিসাব করা হবে। তবে চূড়ান্ত হিসাবের ক্ষেত্রে সরকারি নিয়ম ও সংশ্লিষ্ট বিধান অনুসরণ করতে হবে।
পেনশন বৃদ্ধির হার নির্ধারণ করা হলেও প্রত্যেক ব্যক্তির হাতে ঠিক কত টাকা যাবে, তা নির্ধারণের ক্ষেত্রে অর্থ বিভাগের প্রজ্ঞাপনে থাকা নিয়ম অনুসরণ করা হবে। সংশ্লিষ্ট সীমা, অবসর-পরবর্তী বিভিন্ন সুবিধা এবং প্রযোজ্য অন্যান্য বিধানও হিসাবের মধ্যে আসতে পারে।
এ কারণে শুধু শতাংশের ভিত্তিতে নিজের নতুন পেনশন চূড়ান্ত ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। সরকারি প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ চূড়ান্ত অঙ্ক নির্ধারণ করবে।
নতুন সিদ্ধান্তের সবচেয়ে বড় দিক হলো, কম পেনশন পাওয়া অবসরপ্রাপ্তরা তুলনামূলক বেশি হারে সুবিধা পাবেন। বিশেষ করে ৯ হাজার টাকা বা তার কম নিট পেনশন পাওয়া ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে ১০০ শতাংশ বৃদ্ধি তাদের মাসিক আয়ে বড় পরিবর্তন আনতে পারে।



