নিউজ বাংলা, আন্তর্জাতিক ডেক্স : সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ফ্লাইট ওঠানামার ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের ধারাবাহিক হামলার আশঙ্কায় দেশটির সরকার এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বিমানবন্দরে কোনো উড়োজাহাজ অবতরণ বা উড্ডয়ন করতে চাইলে আগাম অনুমতি নিতে হবে। একই সঙ্গে জরুরি পরিস্থিতিতে বিকল্প বিমানবন্দর হিসেবেও এটি ব্যবহার করা যাবে না।
এই সিদ্ধান্তের ফলে সৌদি আরবের রাজধানীতে সরাসরি আকাশপথে যাতায়াত কার্যত কঠিন হয়ে পড়েছে। আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থাগুলো ইতোমধ্যে রিয়াদগামী ফ্লাইট কমিয়েছে বা সাময়িকভাবে বন্ধ রেখেছে। এতে বিদেশি পর্যটক, ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের যাতায়াত নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
বিমান চলাচলসংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন বিমান সংস্থাকে নতুন বিধিনিষেধের কথা জানিয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, বিমানবন্দরে অবতরণ কিংবা উড্ডয়নের আগে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিতে হবে। পাশাপাশি জরুরি পরিস্থিতিতে বিকল্প অবতরণস্থল হিসেবেও বিমানবন্দরটি ব্যবহার করা যাবে না।
সাধারণত কোনো উড়োজাহাজ যান্ত্রিক ত্রুটি, প্রতিকূল আবহাওয়া কিংবা অন্য কোনো জরুরি পরিস্থিতিতে নির্ধারিত গন্তব্যে অবতরণ করতে না পারলে বিকল্প বিমানবন্দরের সাহায্য নেয়। কিন্তু রিয়াদ বিমানবন্দরে এই সুবিধা সীমিত হয়ে পড়ায় বিমান সংস্থাগুলোর জন্য পরিচালনাগত জটিলতা বাড়তে পারে।
বিমানবন্দরটির কার্যক্রম কবে স্বাভাবিক হবে, সে বিষয়ে কর্তৃপক্ষ নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা জানায়নি। ফলে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনাকারী সংস্থাগুলোকে অনিশ্চিত পরিস্থিতির মধ্যে নিজেদের সূচি ও রুট পরিকল্পনা করতে হচ্ছে।
গত কয়েক সপ্তাহে রিয়াদের বিমান চলাচলব্যবস্থা নিরাপত্তাজনিত চাপের মুখে পড়েছে। হামলায় বিভিন্ন স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি অন্তত একটি উড়োজাহাজ ধ্বংস হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব ঘটনার পর একাধিক আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থা রিয়াদে তাদের কার্যক্রম সীমিত করেছে।
কাতার এয়ারওয়েজ সোমবার রিয়াদে ফ্লাইট পরিচালনা ২৪ অক্টোবর পর্যন্ত স্থগিত রাখার ঘোষণা দিয়েছে। একই সঙ্গে জেদ্দাগামী ফ্লাইটের সংখ্যাও কমিয়েছে সংস্থাটি।
এ ছাড়া সংযুক্ত আরব আমিরাতের ইতিহাদ এয়ারওয়েজ এবং ভারতের আকাসা এয়ার ও এয়ার ইন্ডিয়াও রিয়াদগামী ফ্লাইট পরিচালনায় পরিবর্তন এনেছে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থাগুলোর এমন সিদ্ধান্তে সৌদি আরবে যাতায়াতকারী যাত্রীদের বিকল্প রুট খুঁজতে হতে পারে। বিশেষ করে যাঁরা সরাসরি রিয়াদে যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন, তাঁদের ভ্রমণের আগে সংশ্লিষ্ট বিমান সংস্থার কাছ থেকে সর্বশেষ তথ্য জেনে নেওয়া জরুরি।
সৌদি আরবের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ এবং কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের প্রতিনিধিরা সোমবার পর্যন্ত বিমানবন্দরটির কার্যক্রম বন্ধ থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে পুনরায় ফ্লাইট চালুর বিষয়ে সুস্পষ্ট কোনো পরিকল্পনা জানানো হয়নি।
বিমান চলাচলসংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তিতে বিধিনিষেধের শেষ তারিখও উল্লেখ করা হয়নি। অর্থাৎ, পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত এই সীমাবদ্ধতা বহাল থাকতে পারে।
এ পরিস্থিতিতে বিমান সংস্থাগুলোর জন্য যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, ফ্লাইটের সময়সূচি পুনর্নির্ধারণ এবং বিকল্প রুটের ব্যবস্থা করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে যাত্রীদের টিকিট পরিবর্তন, ফ্লাইট বাতিল এবং অতিরিক্ত ভ্রমণ ব্যয়ের মতো সমস্যার মুখোমুখি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ইয়েমেনে সৌদি নেতৃত্বাধীন বাহিনী ও ইরান-সমর্থিত হুথি গোষ্ঠীর মধ্যে চলমান সংঘাতের প্রভাব এখন সৌদি আরবের বিমান চলাচলব্যবস্থার ওপরও পড়ছে। দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা প্রশমনের সুস্পষ্ট লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সপ্তাহান্তেও সংঘাত অব্যাহত ছিল। রিয়াদে একাধিকবার বিমান হামলার সতর্কতা জারি করা হয়। একই সময়ে ইয়েমেন সীমান্তবর্তী এলাকাতেও প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে।
এই পরিস্থিতিতে রাজধানীর প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিধিনিষেধ আরোপ সৌদি আরবের নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। তবে এর প্রভাব শুধু বিমান চলাচলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। ব্যবসা-বাণিজ্য, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের যাতায়াতেও এর প্রভাব পড়তে পারে।
রিয়াদ বিমানবন্দরে দীর্ঘ সময় বিধিনিষেধ বহাল থাকলে সৌদি আরবের অর্থনৈতিক কার্যক্রমেও চাপ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে দেশটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ সম্মেলন ‘ফিউচার ইনভেস্টমেন্ট ইনিশিয়েটিভ’ বা এফআইআই আয়োজন নিয়ে নতুন করে ভাবতে হচ্ছে আয়োজকদের।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী সপ্তাহে রাজধানী রিয়াদে বিদেশি বিনিয়োগকারী ও আন্তর্জাতিক অতিথিদের স্বাগত জানানোর কথা রয়েছে। সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের জন্যও এই আয়োজন গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, সম্মেলনটি আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছে সৌদি আরবের অর্থনৈতিক পরিকল্পনা ও বিনিয়োগের সুযোগ তুলে ধরার বড় একটি মঞ্চ।
ব্লুমবার্গের প্রতিবেদনের বরাতে জানা গেছে, সম্মেলন আয়োজকেরা অনুষ্ঠানটি নির্ধারিত সময়ে সম্পন্ন করতে বিভিন্ন বিকল্প পরিকল্পনা বিবেচনা করছেন। এর মধ্যে সরাসরি উপস্থিতির পাশাপাশি অনলাইনে অংশগ্রহণের সুযোগ রেখে সম্মেলনটি হাইব্রিড পদ্ধতিতে আয়োজনের বিষয়টিও রয়েছে।
বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সরাসরি রিয়াদে পৌঁছাতে সমস্যা হলে সম্মেলনে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা ও কার্যক্রমের ওপর প্রভাব পড়তে পারে। সে কারণে বিমানবন্দরের কার্যক্রম স্বাভাবিক হওয়ার বিষয়টি সৌদি আরবের অর্থনৈতিক কূটনীতি ও বিনিয়োগ প্রচারের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
ইয়েমেনে সৌদি নেতৃত্বাধীন বাহিনী ও হুথিদের মধ্যে উত্তেজনা গত জুলাইয়ে নতুন করে বাড়তে শুরু করে। ওই সময় সৌদি যুদ্ধবিমান ইয়েমেনের রাজধানী সানার বিমানবন্দরের রানওয়েতে হামলা চালায়। ইরান সফর শেষে হুথি প্রতিনিধিদলের দেশে ফেরার পথ বন্ধ করার উদ্দেশ্যে এ হামলা চালানো হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এরপর চলতি মাসের শুরুতে সংঘাত আরও তীব্র হয়। সৌদি নেতৃত্বাধীন বাহিনী হুথি গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরু করে। তাদের ঘোষিত লক্ষ্য ছিল গোষ্ঠীটির সামরিক সক্ষমতা ও কার্যক্রম নির্মূল করা।
তবে সামরিক অভিযান শুরু হওয়ার পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। সংঘাতের প্রভাব এখন ইয়েমেনের ভেতরে সীমাবদ্ধ না থেকে সৌদি আরবের নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলব্যবস্থায়ও পড়ছে।
রিয়াদ বিমানবন্দরে বিধিনিষেধ আরোপ সেই বৃহত্তর নিরাপত্তা পরিস্থিতিরই একটি অংশ। সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে আঞ্চলিক বিমান চলাচল, আন্তর্জাতিক ব্যবসা এবং সৌদি আরবের বিনিয়োগ কার্যক্রম আরও অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে পারে।
রিয়াদ বিমানবন্দরে ফ্লাইট চলাচল সীমিত থাকায় বিদেশি যাত্রীদের ভ্রমণ পরিকল্পনায় পরিবর্তন আনতে হতে পারে। সরাসরি ফ্লাইট বন্ধ থাকলে বিকল্প বিমানবন্দর হয়ে গন্তব্যে যাওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। এ ক্ষেত্রে যাত্রার আগে সংশ্লিষ্ট বিমান সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করে ফ্লাইটের সর্বশেষ অবস্থা, টিকিট পরিবর্তনের নিয়ম এবং বিকল্প রুট সম্পর্কে জেনে নেওয়া জরুরি। পাশাপাশি ট্রানজিট ভিসা ও গন্তব্য দেশে প্রবেশের শর্ত যাচাই করে ভ্রমণ পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা উচিত।
ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের ক্ষেত্রেও একই ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্মেলন, ব্যবসায়িক বৈঠক কিংবা বিনিয়োগসংক্রান্ত আলোচনায় অংশ নিতে যাঁদের রিয়াদে যাওয়ার কথা, তাঁদের ভ্রমণসূচি পুনর্বিবেচনা করতে হতে পারে।



