সর্বাধিক পঠিত

spot_img

সর্বশেষ আপডেট...

Homeজাতীয়প্রবাসীদের অর্থ ও সম্পত্তি বিরোধ মেটাতে আসছে বিশেষ আদালত ?

প্রবাসীদের অর্থ ও সম্পত্তি বিরোধ মেটাতে আসছে বিশেষ আদালত ?

প্রবাসীদের জন্য বিশেষায়িত আদালত গঠনের পরিকল্পনা করছে সরকার। আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামানের বক্তব্য অনুযায়ী, এসব আদালতের মাধ্যমে প্রবাসীদের বিভিন্ন ধরনের আইনি বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

নিজস্ব প্রতিবেদক, নিউজ বাংলা : প্রবাসীদের বিভিন্ন আইনি সমস্যা দ্রুত সমাধানের লক্ষ্যে বিশেষায়িত আদালত গঠনের পরিকল্পনা করছে সরকার। বিদেশে উপার্জিত অর্থ দেশে পাঠানোর পর পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে অর্থ ও সম্পত্তি নিয়ে বিরোধে জড়িয়ে পড়েন অনেক প্রবাসী। এসব বিরোধের মামলা দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকায় আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি নানা ধরনের ভোগান্তির মুখে পড়তে হয় তাঁদের। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রবাসীদের জন্য বিশেষ আদালত গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশের আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান।

মঙ্গলবার রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে শরণার্থী ও অভিবাসন আন্দোলন বিষয়ক গবেষণা ইউনিটের ৩০ বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা জানান। আইনমন্ত্রী বলেন, প্রবাসীদের আইনি জটিলতা কমানো এবং তাঁদের বিভিন্ন ধরনের মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করতে সরকার কাজ করছে। এ বিষয়ে একটি আইনের খসড়া তৈরির কাজও চলছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রবাসীদের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিদেশে কঠোর পরিশ্রম করে উপার্জিত অর্থ তাঁরা নিয়মিত দেশে পাঠান। এই অর্থ দিয়ে অনেক পরিবার সংসার চালায়, সন্তানের পড়াশোনার খরচ মেটায়, জমি ও বাড়ি কেনে এবং ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয় গড়ে তোলে। কিন্তু কখনও কখনও সেই অর্থ বা সম্পত্তি ঘিরেই পরিবারের মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়।

এ ধরনের বিরোধ আদালত পর্যন্ত গড়ালে প্রবাসীদের জন্য পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। বিদেশে কর্মরত থাকার কারণে নিয়মিত আদালতে হাজির হওয়া, আইনজীবীর সঙ্গে যোগাযোগ রাখা এবং মামলার অগ্রগতি সম্পর্কে খোঁজ নেওয়া তাঁদের পক্ষে কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক ক্ষেত্রে দীর্ঘ সময় ধরে মামলা চলার কারণে অর্থ ও সময় দুটিই ব্যয় হয়।

এই সমস্যাগুলো বিবেচনায় নিয়ে প্রবাসীদের জন্য বিশেষায়িত আদালত গঠনের পরিকল্পনা করছে সরকার। আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামানের বক্তব্য অনুযায়ী, এসব আদালতের মাধ্যমে প্রবাসীদের বিভিন্ন ধরনের আইনি বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

তবে বিশেষ আদালত কবে থেকে কার্যক্রম শুরু করবে, কোন কোন ধরনের মামলা সেখানে বিচার করা হবে এবং কীভাবে প্রবাসীরা এই আদালতের সুবিধা পাবেন, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য এখনও জানানো হয়নি।

প্রবাসীদের একটি বড় অংশ বিদেশে কাজ করে নিজেদের পরিবারের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার চেষ্টা করেন। কেউ মাসে মাসে টাকা পাঠান, কেউ আবার দীর্ঘদিনের সঞ্চয় দিয়ে দেশে জমি কেনেন বা বাড়ি নির্মাণ করেন। অনেক সময় পরিবারের সদস্যদের নামে সম্পত্তি কেনা কিংবা অন্যের কাছে অর্থ জমা রাখার মতো সিদ্ধান্তও নেন তাঁরা।

কিন্তু পরবর্তী সময়ে এসব অর্থ ও সম্পত্তির মালিকানা নিয়ে মতবিরোধ দেখা দিতে পারে। পরিবারের সদস্যদের মধ্যে সম্পত্তির ভাগ-বাঁটোয়ারা, টাকা ফেরত পাওয়া, জমির মালিকানা কিংবা আর্থিক লেনদেনের হিসাব নিয়ে বিরোধ তৈরি হলে তা আইনি জটিলতায় রূপ নিতে পারে।

এ ধরনের পরিস্থিতিতে বিদেশে থাকা ব্যক্তির পক্ষে নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা সহজ নয়। দেশের আদালতে মামলা পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ, আইনজীবী নিয়োগ এবং মামলার শুনানিতে অংশ নেওয়ার ক্ষেত্রে নানা বাধার মুখে পড়তে হয় তাঁকে।

আইনমন্ত্রী জানিয়েছেন, প্রবাসীদের এসব সমস্যা সমাধানে বিশেষ আদালত গঠনের পরিকল্পনা রয়েছে। সরকারের এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে প্রবাসীদের অর্থ ও সম্পত্তি সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।

তবে বিশেষ আদালতের মাধ্যমে ঠিক কোন ধরনের পারিবারিক ও সম্পত্তি সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তি করা হবে, তা আইনের খসড়া ও পরবর্তী সরকারি সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে।

দেশের আদালতে মামলা নিষ্পত্তিতে দীর্ঘ সময় লাগলে তার প্রভাব শুধু মামলার দুই পক্ষের ওপরই পড়ে না, পরিবারের অন্যান্য সদস্যরাও নানা সমস্যার মুখে পড়েন। বিশেষ করে প্রবাসীদের ক্ষেত্রে এই ভোগান্তি আরও বেশি হতে পারে।

বিদেশে কাজ করার পাশাপাশি তাঁদের দেশের মামলার খোঁজখবর রাখতে হয়। প্রয়োজনীয় নথি সংগ্রহ, আইনজীবীর সঙ্গে যোগাযোগ এবং শুনানির প্রস্তুতি নিতে অতিরিক্ত সময় ও অর্থ ব্যয় করতে হয়। কখনও কখনও মামলা পরিচালনার জন্য দেশে আসার প্রয়োজনও দেখা দিতে পারে।

এর ফলে কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকার ঝুঁকি তৈরি হয়। আবার দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ নিষ্পত্তি না হলে সংশ্লিষ্ট অর্থ বা সম্পত্তি ব্যবহার করাও কঠিন হয়ে পড়ে।

আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান তাঁর বক্তব্যে প্রবাসীদের এমন ভোগান্তির বিষয়টি তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে, এসব বিরোধের মামলা বছরের পর বছর চলতে থাকায় প্রবাসীদের অর্থ ও সময় নষ্ট হয়।

বিশেষায়িত আদালত গঠনের পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য হলো, প্রবাসীদের আইনি সমস্যাগুলো আরও কার্যকরভাবে মোকাবিলা করা এবং মামলা নিষ্পত্তির প্রক্রিয়াকে সহজ করা। তবে এই লক্ষ্য কতটা সফল হবে, তা নির্ভর করবে আদালতের কাঠামো, বিচারক নিয়োগ, মামলার ধরন নির্ধারণ এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার ব্যবস্থার ওপর।

বিশেষ আদালত গঠনের পরিকল্পনার পাশাপাশি এ বিষয়ে একটি আইনের খসড়া তৈরির কাজ চলছে বলে জানিয়েছেন আইনমন্ত্রী। অর্থাৎ, প্রবাসীদের আইনি সমস্যা সমাধানে উদ্যোগটি বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় আইনি কাঠামো তৈরির বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে।

একটি কার্যকর আইন প্রণয়ন করা গেলে বিশেষ আদালতের এখতিয়ার, বিচারপ্রক্রিয়া এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অধিকার ও দায়িত্ব নির্ধারণের সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে কোন ধরনের মামলা এই আদালতে যাবে এবং কীভাবে সেগুলোর নিষ্পত্তি হবে, তা স্পষ্ট করা সম্ভব হতে পারে।

প্রবাসীদের জন্য বিশেষায়িত আদালত গঠনের ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় বিশেষ গুরুত্ব পেতে পারে। যেমন, বিদেশে অবস্থানরত ব্যক্তিদের পক্ষে মামলা পরিচালনার সুযোগ, দূর থেকে প্রয়োজনীয় নথি জমা দেওয়ার ব্যবস্থা, শুনানিতে অংশ নেওয়ার সহজ পদ্ধতি এবং মামলা নিষ্পত্তিতে অযথা বিলম্ব কমানো।

তবে এসব ব্যবস্থা চূড়ান্তভাবে গ্রহণ করা হবে কি না, সে বিষয়ে সরকার এখনও বিস্তারিত ঘোষণা দেয়নি। বর্তমানে যে আইনের খসড়া তৈরির কথা জানানো হয়েছে, তার বিষয়বস্তু ও বাস্তবায়ন পরিকল্পনা প্রকাশিত হলে এ বিষয়ে আরও পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যাবে।

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ বা রেমিট্যান্স গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই অর্থ দেশের বৈদেশিক মুদ্রার জোগান বাড়ানোর পাশাপাশি অসংখ্য পরিবারের দৈনন্দিন ব্যয় মেটাতে সাহায্য করে। গ্রামাঞ্চলে বাড়ি নির্মাণ, শিক্ষা, চিকিৎসা এবং ব্যবসা গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও প্রবাসীদের সঞ্চয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

কিন্তু বিদেশে কঠোর পরিশ্রম করে উপার্জিত অর্থ দেশে বিনিয়োগ করার পর যদি তাঁরা নিজেদের অধিকার রক্ষায় দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের মুখে পড়েন, তাহলে তা তাঁদের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

এ কারণে প্রবাসীদের আইনি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং তাঁদের অভিযোগের দ্রুত নিষ্পত্তির ব্যবস্থা গড়ে তোলা গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষায়িত আদালত গঠনের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে এই ক্ষেত্রে ইতিবাচক পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

বিশেষ করে অর্থ ও সম্পত্তি নিয়ে বিরোধের ক্ষেত্রে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা গেলে প্রবাসীদের হয়রানি কমতে পারে। একই সঙ্গে আইনি প্রক্রিয়া সহজ হলে দেশের বিচারব্যবস্থার ওপর তাঁদের আস্থা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।

তবে পরিকল্পনাটির প্রকৃত সুফল পেতে হলে শুধু আদালত গঠন করাই যথেষ্ট হবে না। প্রয়োজন হবে দক্ষ বিচারক, পর্যাপ্ত জনবল, সহজ মামলা পরিচালনা পদ্ধতি এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে মামলা নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থা।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

জনপ্রিয় সংবাদ