খবর পান সবার আগে

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। আমাদের নিউজলেটারে সাবস্ক্রাইব করুন এবং দেশ-বিদেশের গুরুত্বপূর্ণ সংবাদগুলো প্রতিদিন আপনার ইমেইলে পান।

― Advertisement ―

spot_imgspot_img

ইরানের আবিস্কার বিশ্ব প্রযুক্তিতে এক বড় আলোচনার জন্ম দিয়েছে

প্রযুক্তির অগ্রগতিতে কৃত্রিম হৃদযন্ত্র, বায়োনিক হাত-পা কিংবা উন্নত কৃত্রিম অঙ্গ এখন আর বিস্ময়ের বিষয় নয়। আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের হাত ধরে মানবদেহের বহু গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের...
Homeবিজ্ঞান ও প্রযুক্তিইরানের আবিস্কার বিশ্ব প্রযুক্তিতে এক বড় আলোচনার জন্ম দিয়েছে

ইরানের আবিস্কার বিশ্ব প্রযুক্তিতে এক বড় আলোচনার জন্ম দিয়েছে

এটি মূলত মানুষের মস্তিষ্কের গঠন ও কাজের ধরন অনুকরণে তৈরি একটি ত্রিমাত্রিক জৈবিক কাঠামো।

প্রযুক্তির অগ্রগতিতে কৃত্রিম হৃদযন্ত্র, বায়োনিক হাত-পা কিংবা উন্নত কৃত্রিম অঙ্গ এখন আর বিস্ময়ের বিষয় নয়। আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের হাত ধরে মানবদেহের বহু গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের বিকল্প তৈরি সম্ভব হয়েছে। কিন্তু মানুষের শরীরের সবচেয়ে জটিল ও রহস্যময় অঙ্গ মস্তিষ্কের কৃত্রিম প্রতিরূপ তৈরি দীর্ঘদিন ধরেই বিজ্ঞানীদের কাছে ছিল এক বিশাল চ্যালেঞ্জ। এবার সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বড় ধরনের অগ্রগতির দাবি করেছে ইরান।

ইরানের গবেষকরা জানিয়েছেন, তারা প্রথমবারের মতো মানব কোষ ব্যবহার করে গবেষণাগারে তৈরি করেছেন কৃত্রিম মস্তিষ্কের একটি জৈবিক মডেল, যাকে বলা হচ্ছে ব্রেন অর্গানয়েড। এই প্রযুক্তি ভবিষ্যতে চিকিৎসা বিজ্ঞান, স্নায়ুবিজ্ঞান এবং বায়ো-কম্পিউটিংয়ের জগতে বড় পরিবর্তন আনতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

‘ব্রেন অর্গানয়েড’ নাম শুনলে অনেকেই ভাবতে পারেন এটি হয়তো মানুষের মস্তিষ্কের পুরোপুরি বিকল্প কোনো কৃত্রিম অঙ্গ। বাস্তবে বিষয়টি তা নয়। এটি মূলত মানুষের মস্তিষ্কের গঠন ও কাজের ধরন অনুকরণে তৈরি একটি ত্রিমাত্রিক জৈবিক কাঠামো।

এই মডেল তৈরিতে ব্যবহার করা হয় জীবন্ত স্নায়ুকোষ বা নিউরন। এসব নিউরন নিজেদের মধ্যে সংযোগ স্থাপন করে একটি নিউরাল নেটওয়ার্ক গড়ে তোলে। ফলে এটি সীমিত পরিসরে তথ্য গ্রহণ, সংরক্ষণ, বিশ্লেষণ এবং প্রতিক্রিয়া দেওয়ার ক্ষমতা অর্জন করে।

সহজভাবে বললে, এটি মানুষের মস্তিষ্কের ক্ষুদ্র সংস্করণ, যা গবেষণার কাজে ব্যবহার করা যায়।

ইরানের Royan Research Institute-এর বিজ্ঞানীরা এই উদ্ভাবনকে অর্গানয়েড ইন্টেলিজেন্স (OI) প্রযুক্তির বড় অগ্রগতি হিসেবে দেখছেন। গবেষকদের মতে, এই প্রযুক্তি ভবিষ্যতের জৈবভিত্তিক কম্পিউটিংয়ের ভিত্তি হতে পারে।

অর্গানয়েড ইন্টেলিজেন্স এমন একটি ধারণা, যেখানে জীবন্ত নিউরনের শেখার ক্ষমতা এবং তথ্য প্রক্রিয়াকরণের বৈশিষ্ট্যকে ব্যবহার করে নতুন ধরনের কম্পিউটিং সিস্টেম তৈরি করা হয়।

এটি শুধু চিকিৎসা বিজ্ঞানে নয়, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও উন্নত কম্পিউটিং প্রযুক্তির ক্ষেত্রেও বিপ্লব ঘটাতে পারে।

বর্তমানে আমরা যে কম্পিউটার ব্যবহার করি, তা মূলত সিলিকনভিত্তিক ট্রানজিস্টরের মাধ্যমে কাজ করে। এই ট্রানজিস্টর তথ্য বিশ্লেষণ ও প্রক্রিয়াকরণ করে।

অন্যদিকে ব্রেন অর্গানয়েড বা অর্গানয়েড ইন্টেলিজেন্স সম্পূর্ণ আলাদা পদ্ধতিতে কাজ করে। এখানে জীবন্ত নিউরনের বৈদ্যুতিক সংকেত, সিন্যাপটিক সংযোগ এবং অভিযোজনক্ষমতা ব্যবহার করা হয়।

এর সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো—

  • কম শক্তি খরচ
  • দ্রুত তথ্য বিশ্লেষণ
  • জটিল সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা
  • শেখার সক্ষমতা

গবেষকরা মনে করছেন, এই প্রযুক্তি ভবিষ্যতের কম্পিউটিং ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর ও শক্তি-সাশ্রয়ী করে তুলবে।

এই প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত গবেষক Mohammad Pour-Abbasi জানিয়েছেন, ভবিষ্যতে মানুষের মস্তিষ্কের কোষ দিয়ে তৈরি হতে পারে জীবন্ত কম্পিউটার প্রসেসর।

তিনি বলেন, এই ধরনের ব্রেইন-সেল বেইসড প্রসেসর প্রচলিত সিলিকনভিত্তিক প্রসেসরের তুলনায় অনেক দ্রুত তথ্য প্রক্রিয়াকরণ করতে পারবে।

সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, এই প্রযুক্তি শক্তি খরচ প্রায় ১০ লাখ গুণ পর্যন্ত কমিয়ে আনতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

যদি এই দাবি বাস্তবে প্রমাণিত হয়, তাহলে এটি প্রযুক্তি জগতে বিশাল পরিবর্তনের সূচনা করবে।

ব্রেন অর্গানয়েড প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা চিকিৎসা গবেষণায়। কারণ এটি ব্যবহার করে বিজ্ঞানীরা মানব মস্তিষ্কের বিভিন্ন জটিল রোগ আরও কাছ থেকে বিশ্লেষণ করতে পারবেন।

বিশেষ করে—

  • Alzheimer’s disease
  • Parkinson’s disease
  • মৃগী
  • স্নায়বিক বিকলতা

এসব রোগের কারণ, অগ্রগতি এবং সম্ভাব্য চিকিৎসা আবিষ্কারে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

এছাড়া নতুন ওষুধ পরীক্ষার ক্ষেত্রেও এটি নিরাপদ এবং কার্যকর বিকল্প হতে পারে।

বিশ্বজুড়ে এখন বায়ো-কম্পিউটিং নিয়ে আগ্রহ বাড়ছে। কারণ প্রচলিত প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতা ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে উঠছে। শক্তি খরচ, তাপ উৎপাদন এবং জটিল ডেটা বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে নতুন সমাধানের প্রয়োজন হচ্ছে।

এই জায়গায় ব্রেন অর্গানয়েড প্রযুক্তি হতে পারে ভবিষ্যতের উত্তর।

গবেষকদের মতে, আগামী কয়েক দশকের মধ্যে জীবন্ত কোষভিত্তিক প্রসেসর বাস্তব জীবনে ব্যবহার শুরু হতে পারে। যদিও বর্তমানে এটি গবেষণার প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে, তবুও এর সম্ভাবনা ইতোমধ্যেই প্রযুক্তি বিশ্বে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে।

এখনও এই প্রযুক্তি পুরোপুরি প্রস্তুত নয়। আরও বহু পরীক্ষা-নিরীক্ষা, উন্নয়ন এবং নিরাপত্তা যাচাইয়ের প্রয়োজন রয়েছে। তবে বিজ্ঞানীরা আশাবাদী, ধারাবাহিক গবেষণার মাধ্যমে এটি ভবিষ্যতে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন, কম শক্তি খরচের এবং আরও স্মার্ট কম্পিউটিং সিস্টেম তৈরি করতে সাহায্য করবে।

মানব কোষ থেকে কৃত্রিম মস্তিষ্ক তৈরির এই উদ্যোগ শুধু প্রযুক্তির নতুন অধ্যায়ই নয়, এটি মানব সভ্যতার ভবিষ্যৎ কম্পিউটিং ব্যবস্থার ভিত্তিও গড়ে দিতে পারে। ইরানের এই উদ্ভাবন তাই নিঃসন্দেহে বিশ্ব প্রযুক্তি অঙ্গনে এক বড় আলোচনার জন্ম দিয়েছে।