দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দ্রুত বিকাশমান অর্থনীতির আলোচনায় একসময় বাংলাদেশ ও ভিয়েতনামের নাম উচ্চারিত হতো একই শ্বাসে। তৈরি পোশাক রফতানি, ধারাবাহিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, দারিদ্র্য হ্রাস এবং উন্নয়নের বিভিন্ন সূচকে বাংলাদেশকে সম্ভাবনাময় অর্থনীতি হিসেবে বিবেচনা করা হতো। তবে সাম্প্রতিক কয়েক বছরে সেই চিত্রে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা, মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার সংকট এবং বিনিয়োগের ধীরগতির মধ্যে ভিয়েতনাম, ফিলিপাইন ও শ্রীলঙ্কার মতো দেশগুলো দ্রুত এগিয়ে গেছে। সর্বশেষ বিশ্বব্যাংকের আয়ভিত্তিক শ্রেণিবিন্যাসও সেই পরিবর্তনের বাস্তব চিত্র তুলে ধরেছে।
বর্তমানে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান প্রতিযোগী ভিয়েতনাম শুধু তৈরি পোশাক রফতানিতেই সীমাবদ্ধ নেই। দেশটি ইলেকট্রনিকস, সেমিকন্ডাক্টর, মোবাইল ফোন, যন্ত্রাংশ এবং উচ্চপ্রযুক্তি পণ্যের বৈশ্বিক উৎপাদনকেন্দ্র হিসেবে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে।
বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ভিয়েতনামের মাথাপিছু মোট জাতীয় আয় (জিএনআই) বেড়ে ৪ হাজার ৯৭০ মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। ফলে দেশটি উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশের জন্য নির্ধারিত ৪ হাজার ৬৩৬ ডলারের সীমা অতিক্রম করে নতুন অর্থনৈতিক মাইলফলক অর্জন করেছে।
গত কয়েক বছরে ভিয়েতনামের অর্থনীতি ধারাবাহিকভাবে শক্তিশালী অবস্থান ধরে রেখেছে। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে দেশটির রফতানি ১৫ শতাংশেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সময়ে জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয়েছে যথাক্রমে ৭ এবং ৮ শতাংশ।
এছাড়া ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত দেশটির মোট জাতীয় আয় গড়ে প্রতি বছর প্রায় ১০ শতাংশ হারে বেড়েছে। এই ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি এশিয়ার অন্যতম সফল অর্থনৈতিক উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
শুধু ভিয়েতনাম নয়, ফিলিপাইনও অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে বিস্তৃত উন্নয়নের মাধ্যমে উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশের তালিকায় স্থান করে নিয়েছে। উৎপাদন, সেবা, তথ্যপ্রযুক্তি এবং ভোক্তা অর্থনীতির সম্প্রসারণ দেশটির প্রবৃদ্ধিকে আরও শক্তিশালী করেছে।
অন্যদিকে, ২০২২ সালের নজিরবিহীন অর্থনৈতিক সংকট কাটিয়ে মাত্র তিন বছরের ব্যবধানে ঘুরে দাঁড়িয়েছে শ্রীলঙ্কা। আর্থিক সংস্কার, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের মাধ্যমে দেশটি আবারও উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশের কাতারে ফিরে এসেছে।
এছাড়া জর্ডান জাতীয় হিসাব পুনর্মূল্যায়নের মাধ্যমে এবং মাইক্রোনেশিয়া স্থিতিশীল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ফলে নতুন আয়ের শ্রেণিতে উন্নীত হয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এসব দেশের সাফল্যের পেছনে কয়েকটি সাধারণ বিষয় কাজ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত ধারাবাহিকতা, রফতানি পণ্যের বৈচিত্র্য বৃদ্ধি, বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ আকর্ষণ, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর কার্যকর উদ্যোগ।
বিশেষ করে তারা শুধু একটি শিল্পের ওপর নির্ভর না করে একাধিক খাতকে সমান গুরুত্ব দিয়েছে। ফলে বৈশ্বিক বাজারে পরিবর্তন এলেও তাদের অর্থনীতি তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল থেকেছে।
বাংলাদেশ এখনও মূলত তৈরি পোশাক শিল্পের ওপর নির্ভরশীল। যদিও এই খাত দেশের রফতানি আয়ের প্রধান উৎস, তবুও ইলেকট্রনিকস, প্রযুক্তিপণ্য, প্রকৌশল শিল্প কিংবা উচ্চমূল্য সংযোজনকারী উৎপাদন খাতে প্রত্যাশিত অগ্রগতি এখনও দেখা যায়নি।
এর ফলে রফতানির বহুমুখীকরণ সীমিত রয়ে গেছে। একই সঙ্গে বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণ, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন এবং দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির ক্ষেত্রেও আরও কার্যকর উদ্যোগের প্রয়োজন রয়েছে।
বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেলের মতে, ভিয়েতনামের উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়া বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। তিনি মনে করেন, ধারাবাহিক অর্থনৈতিক সংস্কার, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ, দক্ষ জনশক্তি, উন্নত অবকাঠামো এবং রফতানির বহুমুখীকরণ নিশ্চিত করা গেলে তুলনামূলক কম সময়ের মধ্যেও উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক অগ্রগতি সম্ভব।
তার মতে, ভিয়েতনাম কেবল পোশাক রফতানির ওপর নির্ভর করেনি। বরং তারা ইলেকট্রনিকস, প্রযুক্তিপণ্য এবং উচ্চমূল্য সংযোজিত শিল্পে ব্যাপক বিনিয়োগ করেছে। পাশাপাশি বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ আকর্ষণ, আধুনিক বন্দর নির্মাণ, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ, প্রযুক্তি শিক্ষা সম্প্রসারণ এবং দক্ষ শ্রমশক্তি গড়ে তুলতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো রফতানির বৈচিত্র্য বাড়ানো এবং উৎপাদনশীলতা উন্নত করা। তৈরি পোশাক শিল্পের পাশাপাশি ওষুধ, ইলেকট্রনিকস, প্রকৌশল পণ্য, রাসায়নিক শিল্প এবং উচ্চমূল্য সংযোজিত পোশাক উৎপাদনে বিশেষ প্রণোদনা দেওয়া জরুরি।
একই সঙ্গে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে নীতিগত স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের কার্যকারিতা বাড়ানো, কাস্টমস ও প্রশাসনিক জটিলতা কমানো এবং বন্দর, জ্বালানি ও পরিবহন অবকাঠামোতে দ্রুত বিনিয়োগ নিশ্চিত করাও সময়ের দাবি।
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশ এখনও উন্নয়নের প্রতিযোগিতা থেকে পিছিয়ে পড়েনি। তবে প্রতিযোগী দেশগুলো যখন দ্রুত উচ্চতর আয়ের স্তরে পৌঁছে যাচ্ছে, তখন অর্থনৈতিক সংস্কার বাস্তবায়নে বিলম্ব করলে সেই ব্যবধান আরও বাড়তে পারে।
আগামী দশকে উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশের কাতারে পৌঁছাতে হলে অর্থনীতির কাঠামোগত সংস্কার, রফতানির বহুমুখীকরণ, প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পায়ন, দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং বৈশ্বিক বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রে আরও কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ নিতে হবে।
বাংলাদেশের সামনে সম্ভাবনা এখনও উজ্জ্বল। তবে সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে এখনই দ্রুত, পরিকল্পিত এবং টেকসই অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিকল্প নেই।

