ইংল্যান্ড জাতীয় ফুটবল দল যেন শেষ মুহূর্তে এসে বাঁচল এক ভয়াবহ বিপর্যয় থেকে। ম্যাচের বড় একটা সময় পিছিয়ে থাকার পর অধিনায়ক হ্যারি কেইনের অসাধারণ জোড়া গোলেই ২-১ ব্যবধানে ডিআর কঙ্গোকে হারিয়ে মেক্সিকোর বিপক্ষে গুরুত্বপূর্ণ লড়াইয়ের টিকিট নিশ্চিত করেছে থ্রি লায়ন্স। এই ম্যাচ শুধু জয় নয়, বরং ইংল্যান্ডের জন্য এক ধরনের সতর্কবার্তা হিসেবেও ধরা যাচ্ছে।
খেলা শুরু হতেই বোঝা যাচ্ছিল, ডিআর কঙ্গো কোনোভাবেই সহজ প্রতিপক্ষ নয়। মাত্র ৭ মিনিটেই ব্রায়ান সিপেঙ্গার গোলে এগিয়ে যায় কঙ্গো। ইংল্যান্ডের ডিফেন্স তখন পুরোপুরি অগোছালো, আর গোলরক্ষক জর্ডান পিকফোর্ডও খুব একটা ভালো প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারেননি।
ডিফেন্সে ভুল বোঝাবুঝি, মিডফিল্ডে ধীর গতি আর আক্রমণে ছন্দহীনতা—সব মিলিয়ে প্রথম ৩০ মিনিটে ইংল্যান্ড যেন নিজেদের চিনতেই পারছিল না। এমনকি কঙ্গো দ্বিতীয় গোলের খুব কাছাকাছি চলে গিয়েছিল, যখন উইসা খুব কাছ থেকে শট নিয়ে পোস্টে মেরে বসেন।
ডিআর কঙ্গোর গোলরক্ষক লিওনেল এমপাসি-এনজাউ ছিলেন এই ম্যাচের অন্যতম নায়ক। একের পর এক অবিশ্বাস্য সেভ করে তিনি ইংল্যান্ডকে হতাশ করে দেন।
জুড বেলিংহ্যামের শক্তিশালী শট, মার্কাস রাশফোর্ডের সুযোগ—সবকিছুই ঠেকিয়ে দেন তিনি। এমনকি একবার তো বল গোললাইন পার হওয়ার আগেই ক্লিয়ার করা হয়, যা ইংল্যান্ডের জন্য ছিল বড় হতাশার মুহূর্ত।
প্রথমার্ধের এক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে হ্যারি কেইন বক্সে ফাউলের শিকার হন বলে মনে হয়। কিন্তু রেফারি কোনো পেনাল্টি দেননি। VAR চেক করার পরও সিদ্ধান্ত বদলায়নি।
এই সিদ্ধান্তে হতাশ হন ইংল্যান্ডের খেলোয়াড়রা, বিশেষ করে কেইন নিজেই। এই সুযোগ পেলে ম্যাচের চিত্র হয়তো অনেক আগেই বদলে যেতে পারত।
দ্বিতীয়ার্ধে মাঠে নামে একদম ভিন্ন এক ইংল্যান্ড দল। আক্রমণের ধার বাড়ে, বলের দখল বাড়ে, আর সুযোগ তৈরি হতে থাকে একের পর এক।
মার্কাস রাশফোর্ড ভালো কিছু মুভ তৈরি করলেও শেষ মুহূর্তে সফল হতে পারেননি। এরপর কোচ থমাস টুখেল পরিবর্তন আনেন—অ্যান্থনি গর্ডন ও বুকায়ো সাকাকে নামানো হয়, যা ম্যাচের গতি বদলে দেয়।
যখন মনে হচ্ছিল ইংল্যান্ড হেরে যাবে, তখনই সামনে আসেন অধিনায়ক হ্যারি কেইন। ম্যাচের শেষের দিকে গর্ডনের ক্রস থেকে দারুণ হেডে গোল করে সমতা ফেরান তিনি।
এই গোল যেন পুরো দলের আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে দেয়। এরপর মাত্র পাঁচ মিনিট বাকি থাকতে আবারও গর্ডনের পাস থেকে বল পেয়ে দুর্দান্ত শটে দ্বিতীয় গোলটি করেন কেইন।
এই দুটি গোলই ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। কেইন শুধু দলকে জেতাননি, বরং দেখিয়ে দিয়েছেন কেন তিনি দলের সবচেয়ে ভরসার নাম।
এই ম্যাচে গোল করে কেইন তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে আরও একটি মাইলফলক স্পর্শ করেন। এটি ছিল তার টুর্নামেন্টে পঞ্চম গোল, বিশ্বকাপে ১৩তম গোল এবং ইংল্যান্ডের হয়ে মোট ৮৪তম গোল।
এই পরিসংখ্যানই বলে দেয়, কেন অনেকেই ইংল্যান্ডকে “হ্যারি কেইনের দল” বলে ডাকেন।
যদিও ইংল্যান্ড ম্যাচটি জিতেছে, কিন্তু এই পারফরম্যান্স অনেক প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। ডিফেন্সের দুর্বলতা, মিডফিল্ডের ধীর গতি এবং প্রথমার্ধের বিশৃঙ্খলা—সবকিছুই কোচ টুখেলের জন্য চিন্তার কারণ।
আগামী ম্যাচে শক্তিশালী প্রতিপক্ষ মেক্সিকোর বিপক্ষে খেলতে হলে এই ভুলগুলো দ্রুত ঠিক করতে হবে। না হলে এই ধরনের পারফরম্যান্স বড় বিপদ ডেকে আনতে পারে।
এই জয়ের ফলে ইংল্যান্ড এখন মেক্সিকোর বিপক্ষে খেলবে। ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হবে বিখ্যাত অ্যাজটেকা স্টেডিয়ামে, যা সবসময়ই প্রতিপক্ষ দলের জন্য কঠিন জায়গা।
বর্তমান ফর্ম বিবেচনায় ইংল্যান্ডকে আন্ডারডগ হিসেবেই দেখা হচ্ছে। তবে হ্যারি কেইনের মতো একজন ম্যাচ উইনার থাকলে যে কোনো কিছুই সম্ভব—এই ম্যাচ তারই প্রমাণ।
এই ম্যাচটি ছিল একেবারে নাটকীয়। একদিকে ভয়াবহ শুরুর পর বিপদের মুখে পড়া, অন্যদিকে শেষ মুহূর্তে ঘুরে দাঁড়িয়ে জয় ছিনিয়ে নেওয়া—সবকিছু মিলিয়ে এটি ছিল ফুটবলের এক রোমাঞ্চকর গল্প।
ইংল্যান্ডের জন্য এটি শুধু একটি জয় নয়, বরং একটি শিক্ষা। আর হ্যারি কেইন আবারও প্রমাণ করলেন—দল যখন সবচেয়ে বেশি বিপদে, তখন তিনিই সবচেয়ে বড় ভরসা।

