খবর পান সবার আগে

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। আমাদের নিউজলেটারে সাবস্ক্রাইব করুন এবং দেশ-বিদেশের গুরুত্বপূর্ণ সংবাদগুলো প্রতিদিন আপনার ইমেইলে পান।

― Advertisement ―

spot_imgspot_img

যৌন হয়রানি ঠেকাতে আসছে নতুন আইন ২০২৬

কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি বন্ধ এবং নারীসহ সব নাগরিকের জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে নতুন একটি আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। প্রস্তাবিত ‘কর্মক্ষেত্র...
Homeবাংলা নিউজ স্পেশালজাতীয়যৌন হয়রানি ঠেকাতে আসছে নতুন আইন ২০২৬

যৌন হয়রানি ঠেকাতে আসছে নতুন আইন ২০২৬

বর্তমান সময়ে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে হয়রানির ঘটনাও বেড়েছে

কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি বন্ধ এবং নারীসহ সব নাগরিকের জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে নতুন একটি আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। প্রস্তাবিত ‘কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ আইন, ২০২৬’এ প্রচলিত শারীরিক বা মৌখিক হয়রানির পাশাপাশি অনলাইন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আচরণকেও অপরাধ হিসেবে বিবেচনার সুযোগ রাখা হয়েছে।

বর্তমান সময়ে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে হয়রানির ঘটনাও বেড়েছে। তাই নতুন আইনে ফেসবুক, মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপ, ই-মেইলসহ বিভিন্ন অনলাইন মাধ্যমে আপত্তিকর বার্তা, ছবি, মন্তব্য বা আচরণকে যৌন হয়রানির আওতায় আনার প্রস্তাব করা হয়েছে।

মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে আইনটির চূড়ান্ত খসড়া প্রস্তুত করেছে। উচ্চ আদালতের ২০০৮ সালের নির্দেশনার আলোকে তৈরি এই আইনে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ, অভিযোগ গ্রহণ, তদন্ত এবং ভুক্তভোগীর সুরক্ষার বিষয়ে বিস্তারিত বিধান রাখা হয়েছে।

বাংলাদেশের সংবিধানে সব নাগরিকের সমান অধিকার ও আইনি সুরক্ষার কথা বলা হয়েছে। নারী, পুরুষ কিংবা অন্য যেকোনো নাগরিক যেন কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিরাপদ পরিবেশ পান, সেই লক্ষ্যেই দীর্ঘদিন ধরে একটি পূর্ণাঙ্গ আইনের দাবি ছিল।

২০০৮ সালে হাইকোর্ট কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে বেশ কিছু নির্দেশনা দিয়েছিল। তবে দীর্ঘ সময় পার হলেও আলাদা কোনো আইন না থাকায় এসব নির্দেশনা পুরোপুরি কার্যকর করা সম্ভব হয়নি।

নতুন আইন হলে প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য অভিযোগ গ্রহণ, তদন্ত এবং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া বাধ্যতামূলক হবে।

প্রস্তাবিত আইনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনগুলোর একটি হলো ডিজিটাল আচরণকে অপরাধ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা।

বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রে অনলাইনে অশালীন বার্তা পাঠানো, ব্যক্তিগত ছবি ছড়িয়ে দেওয়া, অপমানজনক মন্তব্য করা কিংবা ডিজিটাল মাধ্যমে চাপ সৃষ্টি করার মতো ঘটনা ঘটে। নতুন আইনে এসব বিষয়কে যৌন হয়রানির অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হবে।

শুধু শারীরিক স্পর্শ বা সরাসরি মন্তব্য নয়, বরং অনলাইন প্ল্যাটফর্মে যেকোনো আপত্তিকর যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ আচরণও আইনের আওতায় আসবে।

প্রস্তাবিত আইনে প্রতিটি কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অভিযোগ গ্রহণের জন্য বিশেষ কমিটি গঠনের কথা বলা হয়েছে। এই কমিটিতে নারীর নেতৃত্ব নিশ্চিত করার বিষয়টি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

অভিযোগকারী মৌখিক, লিখিত কিংবা অনলাইন মাধ্যমেও অভিযোগ জানাতে পারবেন। অভিযোগ পাওয়ার পর সর্বোচ্চ ৯০ দিনের মধ্যে তদন্ত শেষ করার বিধান রাখা হয়েছে।

তদন্ত প্রক্রিয়ায় অভিযোগকারীর নিরাপত্তা এবং ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা বজায় রাখা বাধ্যতামূলক হবে।

নতুন আইনে শুধু অভিযোগ গ্রহণ নয়, অভিযোগকারীর সুরক্ষার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

যৌন হয়রানির অভিযোগের পর অনেক ভুক্তভোগী সামাজিক চাপ, মানসিক কষ্ট কিংবা প্রতিশোধের আশঙ্কায় ভোগেন। তাই আইনে অভিযোগকারীকে নিরাপত্তা এবং প্রয়োজনীয় মানসিক সহায়তা দেওয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

শিশু ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য বিশেষ সুরক্ষা ব্যবস্থার কথাও খসড়ায় উল্লেখ করা হয়েছে।

আইনের অপব্যবহার ঠেকাতে মিথ্যা অভিযোগের বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে।

যদি তদন্তে প্রমাণিত হয় যে কোনো ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা অভিযোগ করেছেন এবং কাউকে হয়রানি করার উদ্দেশ্যে অভিযোগ দায়ের করেছেন, তাহলে তার বিরুদ্ধেও আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে।

সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আইনটি এমনভাবে তৈরি করা হচ্ছে যাতে প্রকৃত ভুক্তভোগীরা ন্যায়বিচার পান এবং একই সঙ্গে নির্দোষ কেউ হয়রানির শিকার না হন।

২০০৮ সালে হাইকোর্ট কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দিয়েছিল।

সেই নির্দেশনায় যৌন হয়রানির মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল:

অনাকাঙ্ক্ষিত শারীরিক স্পর্শ, যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য, অশালীন আচরণ, যৌন সুবিধা দাবি, অশ্লীল ছবি বা ভিডিও প্রদর্শন, ফোন বা এসএমএসের মাধ্যমে হয়রানি এবং পিছু নেওয়ার মতো ঘটনা।

এ ছাড়া প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে অভিযোগ কমিটি গঠনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। কমিটির প্রধান হিসেবে একজন নারী সদস্য থাকার বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছিল।

তবে আইনগত বাধ্যবাধকতা না থাকায় অনেক প্রতিষ্ঠান এসব নির্দেশনা যথাযথভাবে পালন করেনি।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সরকারি বিভিন্ন দপ্তরে হাইকোর্টের নির্দেশনা বাস্তবায়নের চেষ্টা করা হলেও স্থায়ী আইন না থাকায় অনেক ক্ষেত্রে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন হয়েছে।

অনেক প্রতিষ্ঠানে অভিযোগ কমিটি থাকলেও সেগুলো সক্রিয় ছিল না। কোথাও অভিযোগ জানানোর নির্দিষ্ট ব্যবস্থা ছিল না, আবার কোথাও ভুক্তভোগীরা সামাজিক কারণে অভিযোগ করতে ভয় পেয়েছেন।

নতুন আইন এসব সমস্যা দূর করার লক্ষ্যেই তৈরি করা হচ্ছে।

খসড়া আইনে শুধু প্রতিষ্ঠানভিত্তিক অভিযোগ কমিটি নয়, জাতীয়, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে মনিটরিং কমিটি গঠনের প্রস্তাবও রাখা হয়েছে।

এই কমিটিগুলো আইন বাস্তবায়ন, অভিযোগ ব্যবস্থাপনা এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করবে।

আইন পাস হওয়ার পর ৯০ কার্যদিবসের মধ্যে এর বিস্তারিত বিধিমালা তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে।

মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন অংশীজনের মতামত নিয়ে খসড়াটি প্রস্তুত করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলোর মতামত বিবেচনা করে আইনটি চূড়ান্ত করা হবে।

খসড়াটি মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হবে। সেখানে রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ, সাংবাদিক এবং সাধারণ মানুষ মতামত বা সংশোধনী প্রস্তাব দিতে পারবেন।

এসব মতামতের যৌক্তিকতা যাচাই করে আইনটি চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য মন্ত্রিসভায় উপস্থাপন করা হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, যৌন হয়রানি প্রতিরোধে শুধু আইন করলেই হবে না, এর কার্যকর প্রয়োগও নিশ্চিত করতে হবে। প্রতিষ্ঠানগুলোতে সচেতনতা বাড়ানো, অভিযোগকারীর আস্থা তৈরি এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করাই হবে বড় চ্যালেঞ্জ।

তবে প্রস্তাবিত এই আইন কার্যকর হলে কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিরাপদ পরিবেশ তৈরির পথে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে।