নিউজ বাংলা, আন্তর্জাতিক ডেক্স : ইয়েমেনে আবারও তীব্র হয়েছে সংঘাত। কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মান্দাব প্রণালির আশপাশের এলাকা পুনর্দখলকে কেন্দ্র করে সরকারি বাহিনী ও ইরান-সমর্থিত হুথি যোদ্ধাদের মধ্যে নতুন করে লড়াই শুরু হয়েছে। সংঘাতের এই নতুন পর্যায়ে সরকারি বাহিনী কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার দাবি করেছে।
সোমবার ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীর প্রকাশ করা ভিডিও ও বিভিন্ন প্রতিবেদনে অভিযানের কিছু দৃশ্য সামনে আসে। এতে সাঁজোয়া যান নিয়ে সরকারি বাহিনীর অগ্রসর হওয়ার চিত্র দেখা যায়। তবে যুদ্ধের সহিংস ও ক্ষয়ক্ষতির দৃশ্য নিয়ে বিস্তারিত না গিয়ে বলা যায়, সাম্প্রতিক লড়াইটি ওই অঞ্চলে ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দীর্ঘদিনের সংঘাতকে আরও জটিল করে তুলেছে।
বাব আল-মান্দাব প্রণালি লাল সাগর ও এডেন উপসাগরের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ হিসেবে পরিচিত। এশিয়া, ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের ক্ষেত্রে এই জলপথের বড় কৌশলগত গুরুত্ব রয়েছে।
বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানি ও অন্যান্য পণ্য পরিবহনে লাল সাগর ও এর আশপাশের নৌপথ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ফলে এই অঞ্চলে সামরিক সংঘাত তৈরি হলে শুধু ইয়েমেন নয়, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি বাজারেও তার প্রভাব পড়তে পারে।
এ কারণেই বাব আল-মান্দাব প্রণালির আশপাশে কোনো পক্ষের সামরিক অগ্রগতি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উদ্বেগ তৈরি করে।
সম্প্রতি হুথি বাহিনী প্রণালির কাছাকাছি কয়েকটি এলাকায় নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করার চেষ্টা করে। এর ফলে ওই অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়ে ওঠে।
হুথিদের অগ্রযাত্রা ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও সামরিক সংকটের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথ নিয়েও নতুন উদ্বেগ তৈরি করে। গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের কাছাকাছি সংঘাত ছড়িয়ে পড়ায় বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান পরিস্থিতির ওপর নজর রাখতে শুরু করে।
সরকারি বাহিনীর পাল্টা অভিযানের মূল লক্ষ্য ছিল হারানো এলাকাগুলো পুনরুদ্ধার করা এবং কৌশলগত অবস্থানগুলোতে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা।
ইয়েমেনের যুদ্ধ দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে বিভক্ত অবস্থায় চলছে। কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে হুথিদের বিরোধের পাশাপাশি আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সম্পৃক্ততা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।
সাম্প্রতিক অভিযানকে সেই দীর্ঘ সংঘাতের নতুন একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায় হিসেবে দেখা হচ্ছে। সরকারি বাহিনী সাঁজোয়া যান ও অন্যান্য সামরিক সরঞ্জাম ব্যবহার করে কয়েকটি এলাকায় অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করেছে।
প্রকাশিত ভিডিওতে ওই এলাকায় তীব্র সংঘর্ষের চিত্র দেখা গেছে। তবে ভিডিওতে থাকা সব দৃশ্য ও তথ্যের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। যুদ্ধের সময় প্রকাশিত ভিডিওতে অনেক ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য বা প্রচারণার প্রভাবের সম্ভরনা থাকতে পারে। এসব ভিডিও যাচাই প্রয়োজন রয়েছে।
বাব আল-মান্দাব প্রণালির নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়লে তার প্রভাব সরাসরি আন্তর্জাতিক নৌবাণিজ্যে পড়তে পারে। কারণ এই অঞ্চল দিয়ে বিপুল পরিমাণ বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল করে।
কোনো কারণে জাহাজ চলাচলে ঝুঁকি বেড়ে গেলে জাহাজ কোম্পানিগুলো বিকল্প দীর্ঘ পথ ব্যবহার করতে পারে। এতে পরিবহন সময় ও খরচ বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। শেষ পর্যন্ত এর প্রভাব পণ্য পরিবহন, আমদানি-রপ্তানি এবং বিভিন্ন দেশের বাজারে দেখা দিতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের ক্ষেত্রে জ্বালানি বাজার সবচেয়ে বেশি সংবেদনশীল। কারণ তেল ও গ্যাস পরিবহনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নৌপথে নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হলে বাজারে সরবরাহ নিয়ে আশঙ্কা দেখা দিতে পারে।
ইয়েমেনে হুথিদের সামরিক অগ্রযাত্রার খবর আন্তর্জাতিক তেলবাজারেও উদ্বেগ তৈরি করেছিল। সংঘাতের কারণে গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথে জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হলে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ভবিষ্যৎ সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়তে পারে।
এর প্রভাব শুধু অপরিশোধিত তেলের দামেই সীমাবদ্ধ থাকে না। পরিবহন ব্যয় বাড়লে পেট্রোল, ডিজেলসহ বিভিন্ন জ্বালানির মূল্যেও চাপ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে জ্বালানি নির্ভর শিল্প ও পরিবহন খাতেও অতিরিক্ত খরচের প্রভাব পড়তে পারে।
তবে বাজারে জ্বালানির দামের পরিবর্তন শুধু ইয়েমেনের পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে না। বিশ্ববাজারের সরবরাহ, চাহিদা, উৎপাদন, ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং বিভিন্ন দেশের নীতিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
ইয়েমেনের সংঘাতের পেছনে রয়েছে দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতা ও ক্ষমতার দ্বন্দ্ব। বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে মতবিরোধের পাশাপাশি আঞ্চলিক শক্তিগুলোর প্রভাবও দেশটির পরিস্থিতিকে জটিল করেছে।
ফলে একেক সময় একেক এলাকায় সংঘাত তীব্র হয়। কোনো পক্ষ সামরিকভাবে কিছু এলাকা নিয়ন্ত্রণে নিলেও দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সমাধান ছাড়া স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা কঠিন হয়ে পড়ে।
বর্তমান পরিস্থিতিতেও সামরিক সাফল্যের পাশাপাশি রাজনৈতিক সমঝোতার প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় দীর্ঘদিন ধরে ইয়েমেনে সংঘাত কমানো এবং রাজনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে সংকট সমাধানের ওপর গুরুত্ব দিয়ে আসছে।
বাব আল-মান্দাবের আশপাশে সংঘাত আরও বাড়লে এর প্রভাব ইয়েমেনের সীমানা ছাড়িয়ে যেতে পারে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল ও মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিতে পারে।
সরকারি বাহিনী সম্প্রতি দখলে নেওয়া এলাকাগুলো নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারলে ওই অঞ্চলে হুথিদের প্রভাব কিছুটা কমতে পারে। তবে হুথিরা এসব এলাকা পুনর্দখলের চেষ্টা করলে সেখানে আবারও সংঘাত বাড়তে পারে। এতে ইয়েমেনের চলমান যুদ্ধ আরও দীর্ঘ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এ অবস্থায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সামরিক উত্তেজনার পাশাপাশি রাজনৈতিক সমাধানের পথ খোলা রাখা। কারণ ইয়েমেনের সংঘাত যত দীর্ঘ হবে, দেশটির সাধারণ মানুষের পাশাপাশি আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ওপরও তত বেশি চাপ তৈরি হতে পারে।
বাব আল-মান্দাব প্রণালির কৌশলগত গুরুত্বের কারণে ইয়েমেনের সাম্প্রতিক সংঘাত এখন শুধু একটি দেশের অভ্যন্তরীণ যুদ্ধ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। লাল সাগরের এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং জ্বালানি বাজার সবকিছুর ওপরই এর সম্ভাব্য প্রভাব রয়েছে।
তথ্য সূত্র: দি জেরুজালেম পোষ্ট


