সর্বাধিক পঠিত

spot_img

সর্বশেষ আপডেট...

Homeবিশ্ব সংবাদইন্ডিয়া নিউজশেখ হাসিনা প্রসঙ্গে ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী কী বোঝাতে চাইলেন

শেখ হাসিনা প্রসঙ্গে ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী কী বোঝাতে চাইলেন

শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের বিষয়ে ভারত সরকার আগেও দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্রের মাধ্যমে অবস্থান জানিয়েছে। বিষয়টি একটি নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে এবং এর সঙ্গে আইনি বিষয়ও জড়িত।

স্টাফ রিপোর্টার, নিউজ বাংলা ডেস্ক : বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ভারত থেকে ফেরত পাঠানো বা প্রত্যর্পণের বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই ঢাকা ও দিল্লির মধ্যে আলোচনা চলছে। এর মধ্যেই ঢাকায় ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর সাম্প্রতিক কিছু মন্তব্য নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

বিশেষ করে শেখ হাসিনা কীভাবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ভারতে গেলেন, সেই সময় ভারতের ভূমিকা কী ছিল এবং বর্তমানে তার প্রত্যর্পণ নিয়ে ভারতের অবস্থান কী—এসব বিষয়ে হাইকমিশনারের বক্তব্যকে বিভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করছেন কূটনৈতিক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা।

একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের আয়োজিত সম্মেলনে প্রশ্নোত্তর পর্বে শেখ হাসিনাকে কবে বাংলাদেশে ফেরত দেওয়া হবে এমন প্রশ্নের জবাব দেন দীনেশ ত্রিবেদী। তার বক্তব্যে তিনি ভারতের চলমান আইনি প্রক্রিয়া এবং ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পরিস্থিতির কথা তুলে ধরেন।

দীনেশ ত্রিবেদী বলেন, শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের বিষয়ে ভারত সরকার আগেও দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্রের মাধ্যমে অবস্থান জানিয়েছে। বিষয়টি একটি নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে এবং এর সঙ্গে আইনি বিষয়ও জড়িত।

তার বক্তব্য অনুযায়ী, যেহেতু আদালত ও আইনি প্রক্রিয়া বিষয়টির সঙ্গে যুক্ত, তাই এ ব্যাপারে নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।

অর্থাৎ, শেখ হাসিনাকে দ্রুত বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে ঢাকার পক্ষ থেকে বারবার যে দাবি জানানো হচ্ছে, তার বিপরীতে ভারত বিষয়টিকে একটি আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে দেখছে হাইকমিশনারের বক্তব্যে এমন অবস্থানই প্রকাশ পেয়েছে।

শেখ হাসিনা ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে সরে যাওয়ার পর সামরিক বিমানে করে ভারতে যান। সেই সময় বাংলাদেশে ব্যাপক রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সহিংস পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল।

দীনেশ ত্রিবেদী তার বক্তব্যে বলেন, শেখ হাসিনাকে ভারতীয় বিমানবাহিনী বা সেনাবাহিনী বাংলাদেশ থেকে নিয়ে যায়নি। বরং বাংলাদেশের তৎকালীন পরিস্থিতির কারণে তিনি ভারতে এসেছিলেন।

হাইকমিশনার আরও বলেন, ওই সময় নিরপরাধ মানুষের প্রাণহানির ঘটনা দুঃখজনক ছিল এবং এমন ঘটনা পৃথিবীর কোথাও যেন আর না ঘটে ভারত এমনটাই আশা করে।

তার এই বক্তব্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, শেখ হাসিনার ভারতে যাওয়ার সিদ্ধান্তের সঙ্গে ভারতীয় সামরিক বাহিনীর সরাসরি সম্পৃক্ততার ধারণা তিনি নাকচ করেছেন।

দীনেশ ত্রিবেদীর বক্তব্যে আরও একটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে। তিনি দাবি করেন, শেখ হাসিনাকে বহনকারী সামরিক বিমান ভারতে আসার সময় ভারত এ ধরনের পরিস্থিতির জন্য আগে থেকে প্রস্তুত ছিল না।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি তখন টেলিভিশনে এমন খবর দেখছিলেন যে শেখ হাসিনা অন্য কোনো দেশে যাচ্ছেন। সেই সময় শেখ হাসিনা বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন।

কিন্তু পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তিত হওয়ায় প্রতিবেশী দেশ হিসেবে ভারতকে বাস্তবতা মেনে নিতে হয় বলে জানান হাইকমিশনার।

তার বক্তব্যের সারকথা হলো, বাংলাদেশের তৎকালীন পরিস্থিতি এত দ্রুত পরিবর্তিত হয়েছিল যে শেখ হাসিনার ভারতে প্রবেশের বিষয়টি নিয়ে ভারত আগে থেকে কোনো পরিকল্পনা করেনি। পরিস্থিতির কারণে তাকে ভারতে প্রবেশের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল।

হাইকমিশনারের বক্তব্য নিয়ে কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে একাধিক ব্যাখ্যা সামনে এসেছে।

একটি ব্যাখ্যা হলো, ভারত স্পষ্ট করতে চাইছে যে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে বাংলাদেশের যে অভিযোগ বা আইনি প্রক্রিয়া রয়েছে, সেটি মূলত বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়। ভারত এ বিষয়ে নিজের ওপর অতিরিক্ত দায় নিতে চাইছে না।

অন্য একটি ব্যাখ্যা হলো, শেখ হাসিনা ভারতীয় সেনাবাহিনী বা বিমানবাহিনীর মাধ্যমে ভারতে যাননি—এই বিষয়টি জোর দিয়ে উল্লেখ করার মাধ্যমে ভারত নিজের ভূমিকা ব্যাখ্যা করতে চাইছে।

আবার কেউ কেউ মনে করছেন, এর মাধ্যমে ভারত বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার আগ্রহও প্রকাশ করছে। কারণ, দীর্ঘদিন ধরে শেখ হাসিনা ইস্যুটি ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের অন্যতম বড় অমীমাংসিত বিষয় হয়ে আছে।

২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বাংলাদেশে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়। এরপর ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্কের মধ্যে নানা ধরনের টানাপোড়েন তৈরি হয়।

শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান, তাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর দাবি এবং দুই দেশের বিভিন্ন দ্বিপাক্ষিক ইস্যু নিয়ে সম্পর্ক আরও জটিল হয়ে ওঠে।

তবে চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর বিএনপি নেতা তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন রাজনৈতিক সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ঢাকা ও দিল্লির সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা নতুন গতি পেয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

দুই দেশের পক্ষ থেকেই যোগাযোগ বাড়ানোর বিভিন্ন উদ্যোগ দেখা গেছে। এর মধ্যেই তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে।

২৯ সেপ্টেম্বর পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবিরের সঙ্গে ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর বৈঠকের পর তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফরের বিষয়টি আবারও সামনে আসে।

তবে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ প্রশ্নটি এই সফরের সম্ভাব্য রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে যে দ্বিপাক্ষিক প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় শেখ হাসিনা এবং অন্য পলাতক আসামিদের ফেরত পাঠানোর বিষয়ে ভারতের সহযোগিতা চায় ঢাকা।

ফলে একদিকে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা, অন্যদিকে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের দাবি এই দুই বিষয়কে কীভাবে একসঙ্গে এগিয়ে নেওয়া যায়, সেটিই এখন বড় কূটনৈতিক প্রশ্ন।

দীনেশ ত্রিবেদীর সাম্প্রতিক বক্তব্যের সঙ্গে ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের দেওয়া বক্তব্যেরও মিল খুঁজে পাচ্ছেন বিশ্লেষকরা।

ভারতের রাজ্যসভায় দেওয়া বক্তব্যে জয়শঙ্কর বলেছিলেন, ৫ আগস্ট বাংলাদেশের পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তিত হয়। বিক্ষোভকারীরা ঢাকায় জড়ো হওয়ার পর নিরাপত্তা-সংক্রান্ত শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করে শেখ হাসিনা পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নেন।

এরপর খুব অল্প সময়ের নোটিশে তিনি ভারতে সাময়িকভাবে আসার অনুমতি চান। বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকেও ফ্লাইট ক্লিয়ারেন্সের অনুরোধ করা হয়েছিল বলে জানিয়েছিলেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী।

অর্থাৎ, ভারতের সরকারি বক্তব্যের সঙ্গে দীনেশ ত্রিবেদীর সাম্প্রতিক বক্তব্যের মৌলিক পার্থক্য খুব বেশি নেই বলেই মনে করছেন কয়েকজন কূটনৈতিক বিশ্লেষক।

বাংলাদেশের কয়েকজন বিশ্লেষকের মতে, দীনেশ ত্রিবেদীর বক্তব্যে ভারত নিজের অবস্থান আরও স্পষ্ট করেছে।

সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবিরের মতে, ভারতীয় হাইকমিশনার বোঝাতে চেয়েছেন যে শেখ হাসিনা ইস্যুটি বাংলাদেশের নিজস্ব বিষয়। এ কারণে পুরো বিষয়টির দায় একতরফাভাবে ভারতের ওপর চাপানোর সুযোগ নেই।

তবে একই সঙ্গে ভারত যেহেতু শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দিয়েছে, তাই বিষয়টির সমাধানে আইনি প্রক্রিয়াকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে এমন বার্তাও বক্তব্যে রয়েছে বলে মনে করেন তিনি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক লাইলুফার ইয়াসমীনের মতে, দীনেশ ত্রিবেদীর বক্তব্যে দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার আগ্রহের ইঙ্গিতও থাকতে পারে।

তার মতে, একটি বিষয়ে দীর্ঘদিন আটকে না থেকে দুই দেশের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে সম্পর্ককে এগিয়ে নেওয়া প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে দুই দেশের শীর্ষ পর্যায়ের বৈঠক গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

অর্থাৎ, শেখ হাসিনা ইস্যুটি গুরুত্বপূর্ণ হলেও এটি যেন বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের অন্য সব ক্ষেত্রকে আটকে না দেয় হাইকমিশনারের বক্তব্যে এমন একটি বার্তা থাকতে পারে।

ভারতের ওপি জিন্দাল গ্লোবাল ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক ও বাংলাদেশবিষয়ক গবেষক শ্রীরাধা দত্ত মনে করেন, দীনেশ ত্রিবেদী মূলত ভারতের আগের অবস্থানই পুনর্ব্যক্ত করেছেন।

তার মতে, বক্তব্যের মাধ্যমে ভারতের সরকারি অবস্থানে নতুন কোনো পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যায় না। আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে আয়োজিত অনুষ্ঠানে হাইকমিশনার হয়তো ভারতের অবস্থান আরও পরিষ্কারভাবে তুলে ধরেছেন।

তবে বাংলাদেশি বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করেন, এবারের বক্তব্যে আগের তুলনায় কিছু বিষয় বেশি জোর দিয়ে বলা হয়েছে। বিশেষ করে শেখ হাসিনা কীভাবে ভারতে গেলেন এবং সে সময় তিনি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন এই বিষয়গুলো সামনে আনা হয়েছে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ এবং বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক দুটি বিষয় পরস্পরেরসঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত।

বাংলাদেশ চাইছে প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে এনে তার বিরুদ্ধে চলমান আইনি প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে। অন্যদিকে ভারত বলছে, বিষয়টি আইনি কাঠামোর মধ্যে রয়েছে এবং আদালতের সংশ্লিষ্টতার কারণে নির্দিষ্ট সময়সীমা দেওয়া সম্ভব নয়।

এর পাশাপাশি দুই দেশের বাণিজ্য, সীমান্ত, নিরাপত্তা, পানি ও রাজনৈতিক যোগাযোগের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও রয়েছে। ফলে সম্পর্ককে এগিয়ে নিতে হলে শুধু একটি ইস্যু নয়, সামগ্রিক দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের দিকেও নজর দিতে হবে।

দীনেশ ত্রিবেদীর বক্তব্য থেকে অন্তত এটুকু বোঝা যায় যে ভারত শেখ হাসিনা ইস্যুতে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে চাইছে এবং একই সঙ্গে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ককে পুরোপুরি এই একটি প্রশ্নের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে আগ্রহী নয়।

তথ্য সূত্র: বিবিসি বাংলা

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

জনপ্রিয় সংবাদ