ভারতের শেয়ারবাজারে হঠাৎ করেই এক অদ্ভুত উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে, আর এর মূল কারণ ফুটবল। বিশেষ করে ফিফা বিশ্বকাপের সম্প্রচার অধিকার ঘিরে। সম্প্রতি ঘোষণা এসেছে যে, আসন্ন ২০২৬ সালের পুরুষদের ফুটবল বিশ্বকাপের ম্যাচ ভারতে সম্প্রচার করবে জ়ি এন্টারটেনমেন্ট এন্টারপ্রাইজ় লিমিটেড। এই একটি খবরই যেন বাজারের চেহারা বদলে দিয়েছে। বিনিয়োগকারীরা যেন নতুন করে সুযোগ খুঁজে পেয়েছেন, আর তার সরাসরি প্রভাব পড়েছে কোম্পানিটির শেয়ারের দামে।
ফুটবল বিশ্বকাপ শুধু একটি খেলা নয়, এটি একটি বৈশ্বিক উৎসব। কোটি কোটি মানুষ একসঙ্গে বসে খেলা দেখে, আলোচনা করে, উচ্ছ্বাস ভাগ করে। এই বিশাল দর্শকসংখ্যা মানে বিজ্ঞাপন আয়, সাবস্ক্রিপশন বৃদ্ধি এবং ব্র্যান্ড ভ্যালু বেড়ে যাওয়া। ফলে যে সংস্থা এই সম্প্রচারের অধিকার পায়, তাদের ব্যবসায়িক সম্ভাবনা হঠাৎ করেই অনেকগুণ বেড়ে যায়।
জ়ি এন্টারটেনমেন্ট ঠিক এই সুযোগটাই কাজে লাগাতে চাইছে। ফিফার সঙ্গে তাদের চুক্তির খবর প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই বাজারে তাদের শেয়ারের চাহিদা দ্রুত বাড়তে শুরু করে।
১ জুন, সোমবার বাজার খোলার পর থেকেই দেখা যায় জ়ি এন্টারটেনমেন্টের শেয়ার দামে অস্বাভাবিক ওঠানামা। দিনের শুরুতে শেয়ারের দাম ছিল প্রায় ৯৪.১০ টাকা। কিছু সময়ের মধ্যে তা বেড়ে গিয়ে প্রায় ৯৯.৮০ টাকায় পৌঁছে যায়। অর্থাৎ, এক সময়ে প্রায় ৭ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি দেখা যায়।
যদিও দিনের শেষে দাম কিছুটা কমে ৯৩.৯৭ টাকায় স্থির হয়, তবুও বিনিয়োগকারীদের জন্য এটি ছিল একটি লাভজনক দিন। কারণ দিনের মাঝামাঝি সময়ে যারা শেয়ার বিক্রি করেছেন, তারা ভালো মুনাফা তুলতে পেরেছেন।
গত পাঁচ দিনের হিসেবে জ়ি এন্টারটেনমেন্টের শেয়ার প্রায় ১১.৬৮ শতাংশ লাভ দিয়েছে। এক মাসে বৃদ্ধি হয়েছে ৩.৪৭ শতাংশ। বছরের শুরু থেকে হিসেব করলে প্রায় ৩.৮৬ শতাংশ লাভ হয়েছে।
তবে সবটাই যে ইতিবাচক, তা নয়। গত ছয় মাসে শেয়ারের দাম ৬.১৪ শতাংশ কমেছে। আর এক বছরের হিসেবে বিনিয়োগকারীদের প্রায় ২৭ শতাংশ পর্যন্ত লোকসান হয়েছে। অর্থাৎ, দীর্ঘমেয়াদে কিছুটা চাপ থাকলেও সাম্প্রতিক ঘটনায় স্বল্পমেয়াদে লাভের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
জ়ি এন্টারটেনমেন্ট শুধু সম্প্রচার অধিকারেই থেমে থাকেনি। তারা ইতিমধ্যে চারটি নতুন স্পোর্টস চ্যানেল চালু করেছে—
- ইউনাইট৮ স্পোর্টস ১
- ইউনাইট৮ স্পোর্টস ১ এইচডি
- ইউনাইট৮ স্পোর্টস ২
- ইউনাইট৮ স্পোর্টস ২ এইচডি
এর পাশাপাশি ডিজিটাল দর্শকদের জন্য রয়েছে জ়ি-ফাইভ অ্যাপ। মানে আপনি টিভি বা মোবাইল—যেখানেই থাকুন, বিশ্বকাপের প্রতিটি মুহূর্ত উপভোগ করতে পারবেন।
যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে চুক্তির অঙ্ক প্রকাশ করা হয়নি, তবে বাজার সূত্রে জানা যাচ্ছে, এই চুক্তির মূল্য প্রায় ৩৩২ কোটি টাকা হতে পারে। এই বিনিয়োগ শুধু ২০২৬ বিশ্বকাপের জন্য নয়। এর আওতায় আরও বড় পরিকল্পনা রয়েছে।
জ়ি এন্টারটেনমেন্ট ২০২৭ সালের মহিলাদের ফুটবল বিশ্বকাপ, ২০৩০ সালের পুরুষদের বিশ্বকাপসহ মোট ৩৯টি আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট সম্প্রচার করবে। অর্থাৎ, এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি কৌশল, যা কোম্পানির ভবিষ্যৎ আয়কে স্থিতিশীল করতে সাহায্য করবে।
আর্থিক বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের বড় স্পোর্টস ইভেন্টের সম্প্রচার অধিকার পাওয়া মানেই শেয়ার দামে স্বল্পমেয়াদি উত্থান। কারণ বিনিয়োগকারীরা ভবিষ্যতের সম্ভাবনা দেখেই সিদ্ধান্ত নেন।
অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, আগামী কয়েক দিন এই ইতিবাচক প্রবণতা বজায় থাকতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদে লাভ নির্ভর করবে কোম্পানির বাস্তব আয় এবং বিজ্ঞাপন থেকে কতটা রাজস্ব আসে তার উপর।
এই ঘটনাটি থেকে একটা বিষয় পরিষ্কার—বাজারে খবরের প্রভাব অনেক বড়। ধরুন, আপনি হঠাৎ শুনলেন কোনো কোম্পানি বড় একটি চুক্তি পেয়েছে। তখন অনেকেই সেই শেয়ার কিনতে ঝুঁকে পড়েন। কিন্তু সব সময় সেটা লাভজনক নাও হতে পারে।
যেমন, কেউ যদি শেয়ারটি খুব দামের সময় কিনে ফেলেন, পরে দাম কমলে তিনি ক্ষতির মুখে পড়তে পারেন। তাই শুধু খবর দেখে নয়, একটু ভেবে-চিন্তে, বিশ্লেষণ করে বিনিয়োগ করা সব সময় ভালো।
আগে আমরা ভাবতাম ফুটবল মানেই খেলা, বিনোদন। কিন্তু এখন এটি একটি বিশাল ব্যবসা। সম্প্রচার অধিকার, স্পনসরশিপ, ডিজিটাল ভিউয়ারশিপ—সব মিলিয়ে এটি একটি বিলিয়ন ডলারের ইন্ডাস্ট্রি।
জ়ি এন্টারটেনমেন্টের এই পদক্ষেপ দেখিয়ে দিল, সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিলে একটি মিডিয়া কোম্পানি কীভাবে বাজারে নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে পারে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, ফিফা বিশ্বকাপের সম্প্রচার অধিকার পাওয়া জ়ি এন্টারটেনমেন্টের জন্য একটি বড় মাইলস্টোন। এটি তাদের ব্র্যান্ড ভ্যালু বাড়াবে, নতুন দর্শক টানবে এবং বিজ্ঞাপন আয় বাড়াতে সাহায্য করবে।
তবে বিনিয়োগকারীদের জন্য এটি একদিকে যেমন সুযোগ, অন্যদিকে তেমনই ঝুঁকিও রয়েছে। তাই সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সব দিক ভালোভাবে বোঝা জরুরি।
এক কথায়, ফুটবল মাঠের উত্তেজনা এবার শেয়ারবাজারেও ছড়িয়ে পড়েছে—আর সেই ঢেউয়ে ভেসে অনেকেই ইতিমধ্যেই পকেট ভরেছেন।

