সর্বাধিক পঠিত

spot_img

সর্বশেষ আপডেট...

Homeজাতীয়সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা মোকাবিলায় বৈশ্বিক সহযোগিতা চান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা মোকাবিলায় বৈশ্বিক সহযোগিতা চান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

বাংলাদেশের মতো জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশের পক্ষে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ভয়াবহ প্রভাব একা মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। এ জন্য প্রয়োজন আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, অর্থায়ন, প্রযুক্তি এবং সমন্বিত উদ্যোগ।

স্টাফ রিপোর্টার, নিউজ বাংলা ডেস্ক : সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ক্রমেই বাড়ছে। এর প্রভাব শুধু উপকূলীয় অঞ্চল বা দ্বীপরাষ্ট্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না; বরং জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর মানুষের জীবন, জীবিকা, বসতি ও ভবিষ্যৎকে সরাসরি প্রভাবিত করছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণ দ্রুত কমানো এবং ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরের কনফারেন্স রুম-৪-এ সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিজনিত অস্তিত্বের সংকট মোকাবিলায় আয়োজিত উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে বক্তব্য দেওয়ার সময় তিনি এ আহ্বান জানান। বৈঠকে বিভিন্ন দেশের সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধান এবং সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, সমুদ্রের উচ্চতা যত দ্রুত বাড়ছে, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় বিশ্বের পদক্ষেপও তার চেয়ে দ্রুত হতে হবে। তাঁর ভাষায়, সমুদ্রের উচ্চতার সঙ্গে বিশ্বের সংকল্প আরও দৃঢ় এবং পদক্ষেপ আরও দ্রুত হওয়া প্রয়োজন।

বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী তুলে ধরেন, বাংলাদেশের মতো জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশের পক্ষে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ভয়াবহ প্রভাব একা মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। এ জন্য প্রয়োজন আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, অর্থায়ন, প্রযুক্তি এবং সমন্বিত উদ্যোগ।

তিনি বলেন, বিশ্বে যে পরিমাণ কার্বন নিঃসরণ হচ্ছে, সমুদ্র তার প্রতিটি টনের প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে। ফলে শুধু অভিযোজনমূলক কার্যক্রম গ্রহণ করলেই এই সংকটের সমাধান হবে না। একই সঙ্গে বৈশ্বিক নিঃসরণ কমানোর কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।

সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির বিষয়টি বাংলাদেশের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বাংলাদেশ একটি সক্রিয় বদ্বীপ। দেশের বিস্তীর্ণ ভূখণ্ডের ওপর দিয়ে শত শত নদী প্রবাহিত হয়ে সাগরে গিয়ে মিশেছে। ফলে নদী, উপকূল ও সমুদ্রের পরিবর্তনের সঙ্গে দেশের মানুষের জীবন ও অর্থনীতি গভীরভাবে সম্পর্কিত।

প্রধানমন্ত্রী বিশ্বব্যাংকের একটি হিসাব তুলে ধরে বলেন, ২০৫০ সালের মধ্যে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ২৫ সেন্টিমিটার বাড়লে বাংলাদেশের প্রায় ৪ শতাংশ ভূমি পানিতে তলিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। এর ফলে প্রায় এক কোটি মানুষের ঘরবাড়ি, জীবিকা এবং মানবিক মর্যাদা হুমকির মুখে পড়তে পারে।

এ ধরনের পরিস্থিতি শুধু ভূমি হারানোর সংকট তৈরি করবে না। উপকূলীয় মানুষের বসতি, কৃষি, পানির উৎস, কর্মসংস্থান এবং সামাজিক নিরাপত্তার ওপরও এর বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে। তাই জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় আগাম প্রস্তুতি নেওয়াকে গুরুত্ব দিচ্ছে বাংলাদেশ।

সীমিত সম্পদের মধ্যেও জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় বাংলাদেশ বিভিন্ন উদ্যোগ নিচ্ছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। এর মধ্যে রয়েছে আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা শক্তিশালী করা, ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলায় প্রস্তুতি বাড়ানো এবং উপকূলীয় অঞ্চল সুরক্ষায় বিনিয়োগ।

আগামী পাঁচ বছরে জলবায়ু সহনশীলতা বাড়ানোর জন্য প্রায় ২০ হাজার কিলোমিটার নদী ও খাল খননের পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন তিনি। একই সঙ্গে পানি সংরক্ষণ ও মজুতের জন্য পদ্মা ব্যারাজ উদ্যোগ এগিয়ে নেওয়া এবং মাস্টার প্ল্যানের মাধ্যমে তিস্তা ব্যারাজ আধুনিকায়নের লক্ষ্য রয়েছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।

এ ছাড়া পরিবেশ রক্ষায় ২৫ কোটি গাছ লাগানোর লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে পানি ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় বাংলাদেশের সক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।

জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার পাশাপাশি বাংলাদেশ সবুজ প্রবৃদ্ধির পথেও এগিয়ে যাচ্ছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ২০৩০ সালের মধ্যে অন্তত ২০ শতাংশ বিদ্যুৎ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

এ ক্ষেত্রে সৌরবিদ্যুৎকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি সবুজ শিল্পের প্রসার এবং পরিবেশবান্ধব পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়নের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রী জানান, জাতীয় কার্বন বাজার গড়ে তোলার পাশাপাশি বন, জলাভূমি এবং ঝুঁকিপূর্ণ উপকূলীয় প্রতিবেশব্যবস্থা সংরক্ষণের উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব মোকাবিলায় এসব কার্যক্রম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

জাতিসংঘের উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি মোকাবিলায় চারটি জরুরি পদক্ষেপের ওপর গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর প্রস্তাবগুলো আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, অর্থায়ন, প্রযুক্তি এবং জলবায়ুজনিত বাস্তুচ্যুতি মোকাবিলাকে কেন্দ্র করে।

প্রথমত, বৈশ্বিক নিঃসরণ কমাতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণ দ্রুত, ব্যাপক এবং ন্যায়সংগতভাবে কমাতে হবে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধিকে ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে রাখার লক্ষ্য অর্জনে কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।

দ্বিতীয়ত, জলবায়ু অর্থায়ন নিশ্চিত করতে হবে।
জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর অভিযোজন কার্যক্রম পরিচালনার জন্য পূর্বানুমেয়, সহজলভ্য এবং কার্যকর অর্থায়ন নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি। কারণ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় অবকাঠামো, প্রযুক্তি ও প্রস্তুতিতে বড় ধরনের বিনিয়োগ প্রয়োজন।

তৃতীয়ত, প্রযুক্তি ও আগাম সতর্কতা ব্যবস্থায় প্রবেশাধিকার বাড়াতে হবে।
ঝুঁকিপূর্ণ উপকূলীয় দেশগুলোর জন্য জলবায়ু-স্মার্ট প্রযুক্তি, তথ্য-উপাত্ত এবং আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থায় প্রবেশাধিকার সম্প্রসারণের কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। এতে দুর্যোগের আগে প্রস্তুতি নেওয়া এবং ক্ষয়ক্ষতি কমানো সহজ হতে পারে।

চতুর্থত, জলবায়ুজনিত বাস্তুচ্যুতি মোকাবিলা করতে হবে।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাস্তুচ্যুত মানুষের জন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানোর আহ্বান জানান তিনি। পাশাপাশি ক্ষয়ক্ষতি ও লোকসান মোকাবিলার উদ্যোগ এবং বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠীর মর্যাদাপূর্ণ পুনর্বাসনের সুযোগ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, সমুদ্র দ্রুত উচ্চতর হচ্ছে। তাই জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় বিশ্বের উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও কার্যক্রমও দ্রুত এগিয়ে নিতে হবে। বর্তমান প্রজন্মের পাশাপাশি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।

তিনি আশা প্রকাশ করেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে আসবে এবং বিভিন্ন ঘোষণাপত্রে দেওয়া অঙ্গীকারগুলো বাস্তব পদক্ষেপে রূপান্তর করবে। কোনো দেশ যেন একা সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির সংকট মোকাবিলা করতে বাধ্য না হয়, সে বিষয়েও তিনি গুরুত্বারোপ করেন।

জাতিসংঘের বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে বাংলাদেশের জলবায়ু ঝুঁকি এবং বৈশ্বিক সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তা বিশেষভাবে উঠে এসেছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির মতো বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায় শুধু একটি দেশের উদ্যোগ যথেষ্ট নয় প্রয়োজন সমন্বিত আন্তর্জাতিক পদক্ষেপ।

বাংলাদেশের মতো বদ্বীপ ও উপকূলীয় দেশগুলোর জন্য বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব কমাতে একদিকে যেমন নিঃসরণ কমাতে হবে, অন্যদিকে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোকে অভিযোজন, প্রযুক্তি, অর্থায়ন এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় সহায়তা দিতে হবে।

জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের অধিবেশন উপলক্ষে আয়োজিত এই উচ্চপর্যায়ের বৈঠক সেই আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তাকেই সামনে এনেছে।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

জনপ্রিয় সংবাদ