সর্বাধিক পঠিত

spot_img

সর্বশেষ আপডেট...

Homeজাতীয়সরকারি বেতন কাঠামো ২০২৬ : সর্বনিম্ন বেতন ৩৩ হাজার, সর্বোচ্চ কত

সরকারি বেতন কাঠামো ২০২৬ : সর্বনিম্ন বেতন ৩৩ হাজার, সর্বোচ্চ কত

নতুন বেতন আদেশ ১ জুলাই থেকে কার্যকর হলেও সরকারি কর্মচারীরা সঙ্গে সঙ্গে পুরো বর্ধিত মূল বেতন পাবেন না। ২০২৬-২৭ ও ২০২৭-২৮ অর্থবছরে তিন ধাপে নতুন বেতন কার্যকর করার পরিকল্পনা করা হয়েছে।

স্টাফ রিপোর্টার, নিউজবাংলা ডেক্স : সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন ও ভাতা কাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়েছে। নতুন জাতীয় বেতনকাঠামো অনুযায়ী সরকারি কর্মচারীদের জন্য আগের মতোই ২০টি গ্রেড রাখা হয়েছে। তবে প্রায় সব গ্রেডেই মূল বেতন বাড়ানো হয়েছে। এর ফলে ভাতাসহ একজন সরকারি কর্মচারীর সর্বনিম্ন মোট বেতন ৩৩ হাজার টাকার বেশি এবং বিশেষ গ্রেডে সর্বোচ্চ মোট বেতন ২ লাখ ৪৭ হাজার ৬০০ টাকা পর্যন্ত হতে পারে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ গত বৃহস্পতিবার ‘চাকরি (বেতন ও ভাতাদি) আদেশ, ২০২৬’ জারি করেছে। নতুন এই বেতন কাঠামো গত ১ জুলাই থেকে কার্যকর হিসেবে গণ্য হবে। তবে বেতন বৃদ্ধির পুরো সুবিধা সরকারি কর্মচারীরা একবারে পাবেন না। ধাপে ধাপে নতুন মূল বেতন কার্যকর করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

নতুন বেতন কাঠামোয় সরকারি চাকরিজীবীদের সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা করা হয়েছে। অর্থাৎ ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের মূল বেতন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ছে।

অন্যদিকে সর্বোচ্চ নির্ধারিত মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা করা হয়েছে। পাশাপাশি মন্ত্রিপরিষদ সচিব, মুখ্য সচিব ও জ্যেষ্ঠ সচিবদের জন্য বিশেষ গ্রেডের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও মুখ্য সচিবের মূল বেতন নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ৭২ হাজার টাকা। জ্যেষ্ঠ সচিবদের মূল বেতন হবে ১ লাখ ৬৪ হাজার টাকা।

নতুন কাঠামো অনুযায়ী জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ২০তম গ্রেডের একজন সরকারি কর্মচারীর সর্বনিম্ন মোট বেতন দাঁড়াবে ৩৩ হাজার ২৫০ টাকা। ঢাকায় একই গ্রেডের কর্মচারীর মোট বেতন হবে ৩৬ হাজার ২৫০ টাকা।

২০ হাজার টাকা মূল বেতনের সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের ভাতা যোগ হয়ে এই মোট বেতন নির্ধারিত হবে। এর মধ্যে বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, যাতায়াত, টিফিন ও মুঠোফোন ভাতা রয়েছে।

মূল বেতনের ওপর ৪৫ থেকে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে। ঢাকার ক্ষেত্রে বাড়িভাড়ার হার ৬০ শতাংশ। এর পাশাপাশি চিকিৎসা ভাতা ৩ হাজার টাকা, যাতায়াত ভাতা ৬০০ টাকা, টিফিন ভাতা ৫০০ টাকা এবং মুঠোফোন ভাতা ১৫০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।

নতুন কাঠামোয় বিশেষ গ্রেডের মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও মুখ্য সচিবদের মোট বেতন ২ লাখ ৪৭ হাজার ৬০০ টাকা পর্যন্ত নির্ধারিত হয়েছে।

তাদের মূল বেতন ১ লাখ ৭২ হাজার টাকার সঙ্গে বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, আপ্যায়ন, মুঠোফোন ও ধোলাই ভাতা যুক্ত হবে। এর বাইরে তাঁরা সার্বক্ষণিক গাড়িসুবিধাসহ অন্যান্য সরকারি সুযোগ-সুবিধাও পেয়ে থাকেন।

এ ছাড়া প্রথম গ্রেডের মূল বেতন এবং নবম গ্রেডের মোট বেতনও আগের তুলনায় বাড়ানো হয়েছে। নবম গ্রেডে ভাতাসহ মোট বেতন ৬০ হাজার টাকার কিছু বেশি হবে।

নতুন বেতন আদেশ ১ জুলাই থেকে কার্যকর হলেও সরকারি কর্মচারীরা সঙ্গে সঙ্গে পুরো বর্ধিত মূল বেতন পাবেন না। ২০২৬-২৭ ও ২০২৭-২৮ অর্থবছরে তিন ধাপে নতুন বেতন কার্যকর করার পরিকল্পনা করা হয়েছে।

নতুন বেতন কাঠামো একবারে পুরোপুরি কার্যকর হবে না। ধাপে ধাপে সরকারি চাকরিজীবীদের বর্ধিত বেতন দেওয়া হবে।

২০২৬ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত নবম ও তদূর্ধ্ব গ্রেডের কর্মকর্তারা বর্ধিত মূল বেতনের ৪০ শতাংশ পাবেন। একই সময়ে ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীরা বর্ধিত মূল বেতনের ৫০ শতাংশ পাবেন।

এরপর ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত নবম ও তদূর্ধ্ব গ্রেডের কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে বর্ধিত বেতনের ৭০ শতাংশ কার্যকর হবে। আর ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীরা পাবেন বর্ধিত বেতনের ৭৫ শতাংশ।

চলতি অর্থবছরে দুই দফায় মূল বেতনের ৭০ শতাংশ দেওয়ার জন্য ৩৭ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের পাওনা বকেয়া অর্থ অক্টোবর মাসের বেতনের সঙ্গে পরিশোধ করার পরিকল্পনা রয়েছে।

নতুন কাঠামোয় সরকারি কর্মচারীদের বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি বা ইনক্রিমেন্টের তারিখও পরিবর্তন করা হয়েছে। প্রতি অর্থবছরের প্রথম দিনকে বার্ষিক বেতন বৃদ্ধির তারিখ হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে।

পদোন্নতি না পেলেও একই পদে দীর্ঘ সময় কাজ করা সরকারি কর্মচারীদের জন্যও নতুন ব্যবস্থায় সুযোগ রাখা হয়েছে।

কোনো কর্মচারী একই পদে আট বছর পূর্ণ করলে এবং তাঁর চাকরির রেকর্ড সন্তোষজনক হলে নবম বছরে পরবর্তী উচ্চতর গ্রেডে বেতন পাওয়ার সুযোগ থাকবে। এর ফলে দীর্ঘদিন একই পদে থাকা কর্মচারীদের বেতন কাঠামোয় কিছুটা সুবিধা তৈরি হবে।

নতুন বেতন আদেশে কর্মস্থল ও গ্রেড অনুযায়ী বাড়িভাড়ার হার নির্ধারণ করা হলেও এই পরিবর্তন সঙ্গে সঙ্গে কার্যকর হচ্ছে না। নতুন বাড়িভাড়া ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে কার্যকর হবে। তার আগে সরকারি কর্মচারীরা প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী বাড়িভাড়া পাবেন।

ঢাকা সিটি করপোরেশন এলাকায় ১৬ থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের জন্য বাড়িভাড়া মূল বেতনের ৬০ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। ১০ম থেকে ১৫তম গ্রেডে এই হার ৫০ শতাংশ। ৫ম থেকে ৯ম গ্রেডে ৪৫ শতাংশ এবং ১ম থেকে ৪র্থ গ্রেডে বাড়িভাড়া ৪০ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে।

নতুন বেতন কাঠামোয় অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পেনশনও বাড়ানো হয়েছে। মোট পাঁচটি স্তরে পেনশন বৃদ্ধির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

তুলনামূলকভাবে কম পেনশন পাওয়া ব্যক্তিদের জন্য বৃদ্ধির হার বেশি রাখা হয়েছে। যাঁদের নিট পেনশন ৯ হাজার টাকা বা তার কম, তাঁদের পেনশন ১০০ শতাংশ বাড়িয়ে ১৮ হাজার টাকা করার কথা বলা হয়েছে।

অন্যদিকে ৪০ হাজার ১ টাকা বা তার বেশি নিট পেনশন পাওয়া ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে ৫৫ শতাংশ বৃদ্ধি করা হয়েছে। এই শ্রেণির সর্বোচ্চ নিট পেনশন ৭০ হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে।

পেনশনভোগীদের বয়স অনুযায়ী চিকিৎসা ভাতাও ৩ হাজার থেকে ৬ হাজার টাকা পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে।

বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তানের জন্য সর্বোচ্চ দুই সন্তানের ক্ষেত্রে প্রতি মাসে ৩ হাজার টাকা করে ভাতার বিধান রাখা হয়েছে।

এ ছাড়া ২৩ বছর বয়স পর্যন্ত সন্তানপ্রতি ৫০০ টাকা শিক্ষাসহায়তা ভাতা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। বাংলা নববর্ষ ভাতা ১৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে, যা আগে ২০ শতাংশ ছিল।

পাহাড়ি, হাওর, চর ও দ্বীপাঞ্চলে কর্মরত সরকারি কর্মচারীদের জন্য বিশেষ ভাতার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে ঝুঁকিপূর্ণ দায়িত্ব পালনকারী বিভিন্ন শ্রেণির কর্মচারীদের জন্য ঝুঁকি ও বিশেষ ভাতা দেওয়ার বিধান রয়েছে।

নতুন বেতন কাঠামো অনুযায়ী সরকারি কর্মচারীদের বেতন অনলাইনে নির্ধারণ করতে হবে। এ জন্য আইবাস প্লাস প্লাসের ‘পে ফিক্সেশন’ অপশন ব্যবহার করা হবে।

জাতীয় পরিচয়পত্র এবং চাকরিসংক্রান্ত তথ্য ব্যবহার করে কর্মচারীদের নতুন বেতন নির্ধারণের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে।

নতুন বেতন কাঠামোয় সরকারি কর্মচারীদের আয় বাড়লেও এর অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে সরকারের রাজস্ব আয় কতটা বাড়বে এবং বর্ধিত বেতন-ভাতার অর্থ কীভাবে দীর্ঘমেয়াদে জোগান দেওয়া হবে, তা নিয়ে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে আলোচনা রয়েছে।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন মনে করেন, আগামী দেড় থেকে দুই বছরে রাজস্ব আয় প্রত্যাশা অনুযায়ী না বাড়লে এবং বাজেট ঘাটতি পূরণে সরকার বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ঋণ নিলে মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ তৈরি হতে পারে।

তাঁর মতে, এ ধরনের পরিস্থিতিতে অর্থের জোগান বাড়ার মাধ্যমে বাজারে মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি হওয়ার ঝুঁকি থাকতে পারে।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

জনপ্রিয় সংবাদ