সর্বাধিক পঠিত

spot_img

সর্বশেষ আপডেট...

Homeবিশ্ব সংবাদবাংলাদেশজিন্নাহর ঢাকা সফর: ১৯৪৮ সালে ভাষা আন্দোলন ঘিরে সেদিন যা ঘটেছিল

জিন্নাহর ঢাকা সফর: ১৯৪৮ সালে ভাষা আন্দোলন ঘিরে সেদিন যা ঘটেছিল

ঢাকার রেসকোর্স ময়দান ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে দেওয়া বক্তব্যে তিনি উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে মত দেন। শিক্ষার্থীরা প্রকাশ্যে প্রতিবাদ জানায়। এমনকি ভাষা আন্দোলনের নেতাদের সঙ্গে বৈঠকেও তর্কাতর্কির ঘটনা ঘটে।

নিউজবাংলা , ১৬ সেপ্টেম্বর, অনলাইন ডেক্স : ১৯৪৮ সালের মার্চ মাস। পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাত্র কয়েক মাস পেরিয়েছে। নতুন রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা প্রত্যাশার পাশাপাশি পূর্ব পাকিস্তানে দানা বাঁধছে অসন্তোষ। সেই অসন্তোষের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে রাষ্ট্রভাষার প্রশ্ন। সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ভাষা বাংলা, অথচ পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীর একটি অংশ উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।

এমন এক পরিস্থিতিতে ১৯৪৮ সালের ১৯ মার্চ ঢাকায় আসেন পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ। এটি ছিল পূর্ব পাকিস্তানে তাঁর প্রথম এবং শেষ সফর। প্রায় ১০ দিনের এই সফরে তিনি সরকারি অনুষ্ঠান, সামরিক কুচকাওয়াজ, জনসভা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আয়োজনে অংশ নেন। কিন্তু ভাষা নিয়ে তাঁর অবস্থান বাঙালির প্রত্যাশার সঙ্গে মেলেনি।

ঢাকার রেসকোর্স ময়দান ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে দেওয়া বক্তব্যে তিনি উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে মত দেন। শিক্ষার্থীরা প্রকাশ্যে প্রতিবাদ জানায়। এমনকি ভাষা আন্দোলনের নেতাদের সঙ্গে বৈঠকেও তর্কাতর্কির ঘটনা ঘটে।

ইতিহাসের সেই গুরুত্বপূর্ণ সফরে কী ঘটেছিল, কেন জিন্নাহর জনপ্রিয়তায় পরিবর্তন আসে এবং ভাষা আন্দোলনের ওপর এর কী প্রভাব পড়ে—সেসবই উঠে এসেছে বিভিন্ন স্মৃতিকথা, গবেষণাগ্রন্থ ও সমকালীন সংবাদপত্রের বিবরণে।

১৯৪৭ সালের আগস্টে ভারত ভাগের পর পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম হয়। নতুন রাষ্ট্রের দুটি ভৌগোলিক অংশ ছিল পশ্চিম পাকিস্তান ও পূর্ব পাকিস্তান। দুই অংশের মধ্যে দূরত্ব ছিল অনেক, আর ভাষা ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও ছিল বড় পার্থক্য।

পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যার সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ বাংলা ভাষায় কথা বলতেন। কিন্তু কেন্দ্রীয় শাসকগোষ্ঠীর মধ্যে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি জোরালো হতে থাকে। এর প্রতিবাদে পূর্ব পাকিস্তানে ছাত্রসমাজ, বুদ্ধিজীবী ও রাজনৈতিক কর্মীরা বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার দাবি তোলেন।

১৯৪৮ সালের শুরু থেকেই ঢাকা, যশোর, সিলেটসহ বিভিন্ন এলাকায় সভা, মিছিল, ধর্মঘট ও বিক্ষোভ চলছিল। কোথাও কোথাও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ এবং হামলার ঘটনাও ঘটে। পরিস্থিতি সামাল দিতে এবং নিজের রাজনৈতিক অবস্থান স্পষ্ট করতে জিন্নাহ ঢাকা সফরের সিদ্ধান্ত নেন।

তৎকালীন ছাত্রনেতা তাজউদ্দীন আহমদ তাঁর ডায়েরিতে লিখেছেন, জিন্নাহ ঢাকায় আসছেন এই খবরকে ঘিরে বাঙালিদের মধ্যে একটি প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। অনেকে ভেবেছিলেন, তিনি হয়তো দলীয় অবস্থানের ঊর্ধ্বে উঠে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ভাষার দাবিকে গুরুত্ব দেবেন।

কিন্তু পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ সেই প্রত্যাশাকে ভিন্ন দিকে নিয়ে যায়।

গভর্নর জেনারেলের সফরকে কেন্দ্র করে তৎকালীন মুসলিম লীগ সরকার বড় ধরনের প্রস্তুতি নেয়। গঠন করা হয় একটি বিশেষ অভ্যর্থনা কমিটি। সেই কমিটির অধীনে অন্তত নয়টি উপকমিটি কাজ করে।

এসব কমিটির দায়িত্বের মধ্যে ছিল জনসমাগম আয়োজন, তোরণ নির্মাণ, আলোকসজ্জা, জনসভা পরিচালনা এবং অতিথিদের যাতায়াত ও খাবারের ব্যবস্থা করা।

লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ তাঁর ‘ঢাকায় জিন্না’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, জিন্নাহ ঢাকায় পৌঁছানোর আগেই শহরের বিভিন্ন স্থানে অর্ধশতাধিক তোরণ নির্মাণ করা হয়েছিল। প্রধান সড়ক ও গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে টানানো হয় জিন্নাহর বড় বড় ছবি এবং পাকিস্তানের পতাকা।

তোরণ ও সড়কগুলোতে আলোকসজ্জার ব্যবস্থাও করা হয়। তাজউদ্দীন আহমদ তাঁর ডায়েরিতে লিখেছিলেন, কায়েদে আজমের সম্মানে শহর সাজানো হয়েছিল এবং প্রায় সর্বত্র আলোকসজ্জা করা হয়েছিল।

জিন্নাহর নাগরিক সংবর্ধনার জন্য ঢাকার তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে বড় মঞ্চ তৈরি করা হয়। বর্তমানে জায়গাটি সোহরাওয়ার্দী উদ্যান নামে পরিচিত।

সমাবেশ সফল করতে আট শতাধিক স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগ করা হয়েছিল। পাশাপাশি অ্যাম্বুলেন্স ও অস্থায়ী চিকিৎসাকেন্দ্রের ব্যবস্থাও রাখা হয়।

ঢাকার বাইরে থেকে যারা জিন্নাহকে স্বাগত জানাতে আসবেন, তাদের জন্য বিশেষ ট্রেন ও স্টিমারের ব্যবস্থা করে প্রশাসন। আগত মানুষের খাবারের সুবিধার জন্য আলাদা দোকান বসানোর উদ্যোগও নেওয়া হয়।

১৯৪৮ সালের ১৯ মার্চ সন্ধ্যায় বিশেষ বিমানে করাচি থেকে ঢাকায় আসেন মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ। তাঁর সঙ্গে ছিলেন বোন ফাতেমা জিন্নাহ।

বিমানটি তেজগাঁওয়ের পুরোনো বিমানঘাঁটিতে অবতরণ করে। সেখানে তাঁকে স্বাগত জানান পূর্ব পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন, গভর্নর স্যার ফ্রেডরিক বর্ন, গণপরিষদের সদস্য ধীরেন্দ্রনাথ দত্তসহ আরও অনেকে।

পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পাঞ্জাব রেজিমেন্ট ও পাকিস্তান নারী ন্যাশনাল গার্ডের সদস্যরা তাঁকে গার্ড অব অনার প্রদান করেন।

সমকালীন দৈনিক আজাদ পত্রিকার প্রতিবেদনে বলা হয়, সেদিন দুপুরের পর ঢাকায় মুষলধারে বৃষ্টি হয়েছিল। কিন্তু বৃষ্টি উপেক্ষা করেই বিমানবন্দর এলাকায় বিপুল মানুষ জড়ো হয়। জিন্নাহ বিমান থেকে নামার পর তাঁকে স্বাগত জানিয়ে স্লোগান দেওয়া হয়।

বিমানবন্দর থেকে জিন্নাহকে রমনা এলাকার একটি সরকারি বাসভবনে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে থাকতেন পূর্ব পাকিস্তানের তৎকালীন চিফ সেক্রেটারি আজিজ আহমদ।

রাস্তার দুই পাশে দাঁড়িয়ে থাকা অসংখ্য মানুষ তাঁকে শুভেচ্ছা জানান। তবে ভাষা আন্দোলন দমনে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে ক্ষোভ থাকায় জনতার মধ্যে প্রত্যাশিত উচ্ছ্বাস দেখা যায়নি বলে তাজউদ্দীন আহমদ তাঁর ডায়েরিতে উল্লেখ করেন।

অর্থাৎ, জিন্নাহর আগমন ঘিরে সরকারি পর্যায়ে যতটা উৎসবের আয়োজন করা হয়েছিল, সাধারণ মানুষের মনোভাব ততটা একরৈখিক ছিল না।

ঢাকায় আসার পরদিন ২০ মার্চ সকালে কুর্মিটোলা প্যারেড গ্রাউন্ডে একটি কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠানে অংশ নেন জিন্নাহ। সেখানে তিনি ইংরেজিতে বক্তব্য দেন।

পূর্ববঙ্গকে পাকিস্তানের অন্যতম শক্তিশালী অংশ হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বাংলার মুসলমানদের সামরিক ঐতিহ্যের কথা বলেন। তাঁর বক্তব্যে ছিল পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তায় পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের অংশগ্রহণের আহ্বান।

জিন্নাহ বলেন, বাংলার মুসলমানদের অতীত বীরত্ব ইতিহাসে সুপরিচিত। এখন সেই সামরিক উদ্দীপনাকে পুনরুজ্জীবিত করে দেশের শক্তি প্রদর্শনের সুযোগ এসেছে।

তিনি পূর্ব পাকিস্তানের মানুষকে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীতে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানান। তাঁর মতে, দেশের প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তার দায়িত্ব পালনে বাঙালিদেরও এগিয়ে আসা প্রয়োজন।

ভাষণ শেষে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ ভূমিকার স্বীকৃতিস্বরূপ পাকিস্তান সেনাবাহিনীর মেজর এম আহমদকে ‘মিলিটারি ক্রস’ পদক পরিয়ে দেন জিন্নাহ।

সামরিক অনুষ্ঠানের দিন সন্ধ্যায় ছাত্রদের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন জিন্নাহ। বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয় রমনায় তাঁর থাকার সরকারি বাসভবনে।

লেখক ও গবেষক বদরুদ্দীন উমর তাঁর ‘পূর্ব বাঙলার ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি’ গ্রন্থে এই বৈঠকের বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হলের ছাত্রনেতারা আমন্ত্রণ পেয়ে সেখানে যান। তাঁদের মধ্যে জগন্নাথ হলের দুজন হিন্দু ছাত্রনেতাও ছিলেন।

ছাত্রদের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার পর জিন্নাহ জানতে চান, তিনি তাঁদের জন্য কী করতে পারেন। জবাবে ছাত্রনেতা মোহাম্মদ তোয়াহা বলেন, তিনি চাইলে একটি ছাত্র সমাবেশে বক্তৃতা দিতে পারেন।

বৈঠকটি প্রায় ১৫ থেকে ২০ মিনিট স্থায়ী হয়। সেখানে রাষ্ট্রভাষা নিয়ে সরাসরি আলোচনা হয়নি বলে বদরুদ্দীন উমর তাঁর গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন।

বৈঠকের শেষদিকে মোহাম্মদ তোয়াহা জিন্নাহর হাতে ইংরেজিতে লেখা একটি স্মারকলিপি দেন। সেখানে ভাষা সমস্যার বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছিল।

জিন্নাহ স্মারকলিপিটি হাতে নিয়ে পাশের টেবিলে রেখে দেন। এ বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করেননি।

এরপর ছাত্রনেতারা বাইরে বেরিয়ে এলে জিন্নাহর মিলিটারি সেক্রেটারি তোয়াহা ও নজরুল ইসলামকে আবার ভেতরে যেতে বলেন। সেখানে জিন্নাহ জানান, সাক্ষাতের ব্যাপারে একটি ভুল হয়েছে। তিনি শুধু মুসলমান ছাত্রদের সঙ্গে দেখা করতে চেয়েছিলেন, হিন্দু ছাত্রদের সঙ্গে নয় বদরুদ্দীন উমরের বর্ণনায় এমন তথ্য পাওয়া যায়।

পরবর্তী সময়ে মুসলিম ছাত্রসংগঠনগুলোর নেতাদের সঙ্গেও বৈঠক করেন জিন্নাহ। তিনি তাদের বিরোধ মিটিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানান।

সফরের তৃতীয় দিন ২১ মার্চ বিকেলে রেসকোর্স ময়দানে জিন্নাহকে নাগরিক সংবর্ধনা দেওয়া হয়। অনুষ্ঠানে নাগরিক কমিটির সভাপতি নবাব হাবিবুল্লাহ মানপত্র পাঠ করেন।

এরপর জিন্নাহ প্রায় এক ঘণ্টা ইংরেজিতে বক্তব্য দেন। ভাষা আন্দোলনকে সমালোচনা করে তিনি পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বিষয়ে তাঁর অবস্থান স্পষ্ট করেন।

জিন্নাহর বক্তব্যের মূল কথা ছিল, প্রাদেশিক পর্যায়ে বাংলা ব্যবহারে বাধা দেওয়া হবে না। তবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উর্দুকেই তিনি সমর্থন করেন।

তিনি বলেন, পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা উর্দু হবে, অন্য কোনো ভাষা নয়। তাঁর মতে, একটি রাষ্ট্রের ঐক্য ও কার্যক্রম পরিচালনার জন্য একটি রাষ্ট্রভাষা প্রয়োজন।

এই বক্তব্যে উপস্থিত অনেকেই হতাশ হন। দর্শকসারি থেকে ‘না, না’ ধ্বনি ওঠে। কিছু সময়ের জন্য সমাবেশে হট্টগোল সৃষ্টি হলেও পরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়।

তাজউদ্দীন আহমদ তাঁর ডায়েরিতে লিখেছেন, জিন্নাহর বক্তব্য পূর্ব পাকিস্তানের মানুষকে আহত করেছিল। বাঙালিরা আশা করেছিলেন, তিনি রাজনৈতিক দলের অবস্থানের ঊর্ধ্বে উঠে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মতকে গুরুত্ব দেবেন।

কিন্তু তাঁর ভাষণ সেই প্রত্যাশা পূরণ করেনি।

২৪ মার্চ সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষ সমাবর্তন অনুষ্ঠানে যোগ দেন জিন্নাহ। সেখানে তিনি রাষ্ট্রভাষা প্রসঙ্গে আবারও একই অবস্থান তুলে ধরেন।

বদরুদ্দীন উমরের গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে, জিন্নাহ বলেন, প্রাদেশিক সরকারি কাজে পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ নিজেদের পছন্দমতো ভাষা ব্যবহার করতে পারবেন। তবে পাকিস্তানের বিভিন্ন প্রদেশের মধ্যে যোগাযোগের জন্য একটি ভাষা থাকবে এবং সেই ভাষা হবে উর্দু।

তিনি উর্দুকে পাকিস্তানের মুসলমানদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সঙ্গে সম্পর্কিত ভাষা হিসেবে উপস্থাপন করেন। একই সঙ্গে ভাষা আন্দোলনকে পাকিস্তানের ঐক্য নষ্ট করার ষড়যন্ত্রের সঙ্গে যুক্ত করেন।

জিন্নাহর বক্তব্যের সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ‘না, না’ বলে প্রতিবাদ করেন। তাঁরা উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার বক্তব্য মেনে নেননি।

ভাষাসৈনিক আবদুল মতিন ও এ কে এম আহসানসহ কয়েকজন ছাত্রনেতা প্রতিবাদকারীদের মধ্যে ছিলেন বলে বদরুদ্দীন উমর তাঁর গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন।

জিন্নাহর বক্তব্যের বিরুদ্ধে ছাত্রদের প্রতিবাদ ছিল ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। কারণ, এটি দেখিয়ে দেয় যে রাষ্ট্রভাষার প্রশ্নে পূর্ব পাকিস্তানের শিক্ষার্থীরা নিজেদের অবস্থান প্রকাশ্যে জানাতে প্রস্তুত ছিলেন।

২৪ মার্চ সন্ধ্যায় জিন্নাহ রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের একটি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠক করেন। সেখানে উপস্থিত ছিলেন তাজউদ্দীন আহমদ, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, শামসুল হক, কমরুদ্দীন আহমদ, আবুল কাসেম, লিলি খাঁ, মোহাম্মদ তোয়াহা ও অলি আহাদসহ অনেকে।

প্রতিনিধিদল বাংলাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার দাবি জানায়। কিন্তু জিন্নাহ সেই দাবি প্রত্যাখ্যান করেন।

বদরুদ্দীন উমরের বর্ণনা অনুযায়ী, ভাষা নিয়ে আলোচনা একপর্যায়ে তর্কাতর্কিতে রূপ নেয়। মোহাম্মদ তোয়াহা সরাসরি জানান, তাঁরা রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলা চান।

জিন্নাহ জবাবে বলেন, তিনি ছাত্রদের কাছ থেকে রাজনীতি শিখতে আসেননি।

জিন্নাহর মতে, পাকিস্তানে একাধিক রাষ্ট্রভাষা চালু হলে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বিপন্ন হতে পারে। তিনি মনে করতেন, একটি রাষ্ট্রের ঐক্য ধরে রাখতে একটি রাষ্ট্রভাষা প্রয়োজন।

এর বিপরীতে মোহাম্মদ তোয়াহা কানাডা ও সুইজারল্যান্ডের মতো দেশের উদাহরণ দেন। এসব দেশে একাধিক রাষ্ট্রভাষার প্রচলন রয়েছে বলে তিনি যুক্তি তুলে ধরেন।

বদরুদ্দীন উমরের গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে, তোয়াহা একাধিক রাষ্ট্রভাষার বিষয়টিকে ঐতিহাসিক বাস্তবতা হিসেবে তুলে ধরেন। জিন্নাহ সেই যুক্তির বিরোধিতা করেন।

একপর্যায়ে অলি আহাদ জিন্নাহকে উদ্দেশ করে বলেন, প্রয়োজনে তাঁকে গভর্নর জেনারেলের পদ থেকে অপসারণের জন্য ইংল্যান্ডের রানীর কাছে আবেদন করা যেতে পারে।

এই বক্তব্যে জিন্নাহ ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন বলে উমরের বর্ণনায় জানা যায়। এরপর ঘরের মধ্যে উচ্চস্বরে কথা কাটাকাটি ও উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।

ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে এই বৈঠক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে আছে, কারণ এটি দেখায় যে রাষ্ট্রভাষা নিয়ে বাঙালি নেতারা সরাসরি পাকিস্তানের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে মতবিরোধে জড়িয়েছিলেন।

২৪ মার্চ রাতে ফাতেমা জিন্নাহ পূর্ব পাকিস্তানের নারীদের উদ্দেশে ঢাকা বেতারে ভাষণ দেন। মহিউদ্দিন আহমদের ‘ঢাকায় জিন্না’ গ্রন্থে এই ভাষণের বিবরণ পাওয়া যায়।

ফাতেমা জিন্নাহ পূর্ব পাকিস্তানে তাঁকে আন্তরিকভাবে গ্রহণ করার জন্য সবাইকে ধন্যবাদ জানান। এরপর পাকিস্তান রাষ্ট্রের অগ্রগতিতে নারীদের ভূমিকার কথা তুলে ধরেন।

তিনি ইসলামের ইতিহাসে নারীদের অবদানের কথা উল্লেখ করে বলেন, দেশ ও জাতির কল্যাণে নারীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।

পাকিস্তানকে সামনে এগিয়ে নিতে নারীদের ত্যাগ, সাহস ও দায়িত্বশীলতার প্রয়োজন রয়েছে বলেও তিনি বক্তব্য দেন।

ফাতেমা জিন্নাহর ভাষণেও রাষ্ট্রীয় ঐক্যের প্রসঙ্গ উঠে আসে। তিনি বলেন, নানা বিতর্ক ও বিরোধের মাধ্যমে শত্রুরা ঐক্য নষ্ট করার চেষ্টা করছে।

তিনি নারীদের ঐক্য সুদৃঢ় করার কাজে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানান। পূর্ব পাকিস্তানে মুসলিম নারী ন্যাশনাল গার্ড প্রতিষ্ঠার প্রশংসাও করেন।

তাঁর বক্তব্যে পাকিস্তানের নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থা, নারীর ভূমিকা ও জাতীয় ঐক্যের বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়।

১৯৪৮ সালের মার্চে জিন্নাহর ঢাকা সফর ছিল পাকিস্তানের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ঘটনা। তিনি পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ পেয়েছিলেন। কিন্তু রাষ্ট্রভাষা নিয়ে তাঁর অবস্থান বাঙালির প্রত্যাশার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে ওঠে।

ভাষা আন্দোলনের নেতারা চেয়েছিলেন বাংলা ভাষাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দেওয়া হোক। জিন্নাহ উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে অবস্থান নেন।

এর ফলে পূর্ব পাকিস্তানের ছাত্রসমাজ ও রাজনৈতিক কর্মীদের মধ্যে হতাশা বাড়ে। বিভিন্ন স্মৃতিকথা ও গবেষণাগ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে, জিন্নাহর জনপ্রিয়তায়ও এর প্রভাব পড়ে।

তবে ভাষা আন্দোলন থেমে যায়নি। বরং রাষ্ট্রভাষার দাবিতে আন্দোলন আরও বিস্তৃত হতে থাকে। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারিতে তা ঐতিহাসিক রূপ নেয়।

জিন্নাহর ১৯৪৮ সালের ঢাকা সফরকে শুধু একজন রাষ্ট্রনায়কের সফর হিসেবে দেখলে এর পূর্ণ তাৎপর্য বোঝা যাবে না। এই সফর ছিল নতুন পাকিস্তান রাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব ও পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালি জনগণের মধ্যে ভাষা, অধিকার ও রাজনৈতিক প্রত্যাশার সংঘাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

একদিকে ছিল পাকিস্তানের ঐক্য ও রাষ্ট্রীয় কাঠামো নিয়ে জিন্নাহর ধারণা। অন্যদিকে ছিল বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষার দাবি, যা পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের সাংস্কৃতিক পরিচয় ও রাজনৈতিক অধিকারের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত ছিল।

রেসকোর্স ময়দান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন এবং রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের সঙ্গে বৈঠকের ঘটনাগুলো পরবর্তী ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস বুঝতে সাহায্য করে।

জিন্নাহর ঢাকা সফরের ৭৮ বছর পরও সেই সময়ের প্রশ্নগুলো ইতিহাসের পাতায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে আছে। বাংলা ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম কীভাবে ধাপে ধাপে গড়ে উঠেছিল, সেই ধারাবাহিকতায় ১৯৪৮ সালের মার্চের ঘটনাগুলো বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।

সেই সফর দেখিয়ে দিয়েছিল, রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে জনগণের ভাষা, সংস্কৃতি ও মতামতকে উপেক্ষা করলে রাজনৈতিক বিরোধ আরও গভীর হতে পারে।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

জনপ্রিয় সংবাদ