নিজস্ব প্রতিবেদক,ঢাকা, ৯ সেপ্টেম্বর : পলিথিন ও প্লাস্টিকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার পরিবেশের জন্য বড় ধরনের হুমকি তৈরি করছে। এ পরিস্থিতিতে পলিথিনের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আরও কঠোর হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সঙ্গে পলিথিন ও প্লাস্টিক ব্যবহারের বিরুদ্ধে বিদ্যমান আইন যথাযথভাবে প্রয়োগ এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সংস্থাগুলোকে নিজেদের দায়িত্ব কার্যকরভাবে পালনের নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।
বুধবার বাংলাদেশ সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণ বিষয়ক পর্যালোচনা সভায় এসব নির্দেশনা দেওয়া হয়। সভায় পরিবেশ দূষণ কমাতে সরকারের নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের অগ্রগতি পর্যালোচনা করা হয়। পাশাপাশি ভবিষ্যতে দূষণ নিয়ন্ত্রণে আরও কার্যকর কী ধরনের উদ্যোগ নেওয়া যায়, তা নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা হয়।
সভায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পলিথিনের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার বন্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে কার্যকর ভূমিকা রাখার ওপর গুরুত্ব দেন। পরিবেশের ক্ষতি করে এমন পলিথিন ও প্লাস্টিকের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে শুধু সচেতনতামূলক প্রচারণা যথেষ্ট নয় বলেও সভায় গুরুত্ব দেওয়া হয়।
পলিথিনের অবাধ ব্যবহার নগরজীবনে নানা সমস্যা তৈরি করছে। ব্যবহারের পর এসব পণ্য যত্রতত্র ফেলে দেওয়ায় ড্রেন ও নালা আটকে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়। একই সঙ্গে নদী, খাল, জলাশয় ও কৃষিজমিতেও পলিথিন জমে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করে।
এ কারণে বিদ্যমান আইন ও বিধিনিষেধ বাস্তবায়নে মাঠপর্যায়ে নজরদারি বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথা উঠে আসে সভায়। সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে সমন্বিতভাবে কাজ করার নির্দেশও দেওয়া হয়।
প্রধানমন্ত্রী সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সংস্থাগুলোকে পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণে নিজেদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালনের নির্দেশ দিয়েছেন। পরিবেশ রক্ষার জন্য একটি সংস্থার একক উদ্যোগের পরিবর্তে সব সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত কার্যক্রম প্রয়োজন বলে সভায় গুরুত্ব দেওয়া হয়।
বায়ু, পানি, মাটি ও শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে আরও কার্যকর করার বিষয়েও আলোচনা হয়। বিশেষ করে শহর ও জনবহুল এলাকায় বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব পদ্ধতি ব্যবহার করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণে সরকারের নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগ কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে, সভায় তার অগ্রগতিও পর্যালোচনা করা হয়। যেসব ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি হয়নি, সেসব ক্ষেত্রে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়েও আলোচনা হয়।
সভায় পরিবেশবান্ধব ব্লক ইটের ব্যবহার বাড়ানোর বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পায়। প্রচলিত ইট উৎপাদনে কৃষিজমির মাটি ব্যবহার এবং ইটভাটার ধোঁয়ার কারণে পরিবেশের ওপর যে চাপ তৈরি হয়, তা কমাতে বিকল্প নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা করা হয়।
পরিবেশবান্ধব ব্লক ইটের ব্যবহার বাড়ানো গেলে একদিকে কৃষিজমির ওপর চাপ কমানো সম্ভব হবে, অন্যদিকে নির্মাণ খাতে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির ব্যবহারও বাড়বে। তাই সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে এ ধরনের নির্মাণসামগ্রীর ব্যবহার সম্প্রসারণে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার বিষয়ে সভায় আলোচনা করা হয়।
বাংলাদেশের বড় শহরগুলোতে বায়ুদূষণ একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবেশগত সমস্যা। যানবাহনের ধোঁয়া, নির্মাণকাজের ধুলা, ইটভাটার ধোঁয়া এবং বিভিন্ন শিল্পকারখানার নিঃসরণ বায়ুর মানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
সভায় বায়ুদূষণের উৎসগুলো চিহ্নিত করে তা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ মাঠপর্যায়ে কতটা কার্যকর হচ্ছে, তা নিয়মিত পর্যবেক্ষণের বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।
শুধু রাজধানী নয়, দেশের অন্যান্য শহর ও শিল্পাঞ্চলেও দূষণ নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা জোরদার করার বিষয়টি গুরুত্ব পায়। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং নাগরিকদের জন্য স্বাস্থ্যকর পরিবেশ নিশ্চিত করতে এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নের ওপর জোর দেওয়া হয়।
পলিথিন ও প্লাস্টিকের বর্জ্য শুধু শহরের রাস্তাঘাটে সমস্যা তৈরি করে না, এটি নদী, খাল ও জলাশয়ের ওপরও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলে। প্লাস্টিকজাত বর্জ্য পানিতে জমে জলজ পরিবেশের ক্ষতি করতে পারে। একইভাবে মাটিতে দীর্ঘদিন পড়ে থাকা প্লাস্টিক মাটির স্বাভাবিক গুণাগুণেও প্রভাব ফেলে।
এ কারণে পানি ও মাটি দূষণ নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত নজরদারি এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন প্রয়োজন বলে সভায় গুরুত্ব দেওয়া হয়। শিল্প ও অন্যান্য উৎস থেকে দূষিত বর্জ্য যাতে অপরিকল্পিতভাবে পরিবেশে না পড়ে, সে বিষয়েও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর দায়িত্ব পালনের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
পরিবেশ দূষণ কমানোর ক্ষেত্রে কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে প্লাস্টিক ও পলিথিনের বর্জ্য আলাদাভাবে সংগ্রহ, পুনর্ব্যবহার এবং নিরাপদভাবে ব্যবস্থাপনার সুযোগ বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে।
সভায় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের অগ্রগতি পর্যালোচনা করা হয়। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সংস্থাকে সমন্বিতভাবে কাজ করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
নগর এলাকায় বর্জ্য সংগ্রহ ও অপসারণ ব্যবস্থার পাশাপাশি বর্জ্য থেকে সম্পদ তৈরির সুযোগ নিয়েও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা আলোচনায় আসে। পরিবেশ রক্ষার পাশাপাশি নাগরিকদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে একটি কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়।
সভায় শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণের বিষয়টিও আলোচনায় আসে। যানবাহনের অপ্রয়োজনীয় হর্ন, নির্মাণকাজ এবং বিভিন্ন উৎস থেকে সৃষ্ট অতিরিক্ত শব্দ নগরবাসীর জন্য বিরক্তিকর পরিস্থিতি তৈরি করে।
শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে বিদ্যমান নিয়ম বাস্তবায়ন এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর নজরদারি বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা হয়। পরিবেশ দূষণের বিভিন্ন উৎস নিয়ন্ত্রণে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি জনসচেতনতা বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়।
প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এ পর্যালোচনা সভায় সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
সভায় সড়ক পরিবহন ও সেতু, রেলপথ এবং নৌপরিবহন মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ এবং পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন।
এ ছাড়া মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তার, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. আব্দুস সালাম এবং প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী (পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক) ড. সাইমুম পারভেজসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সভায় অংশ নেন।
প্রধানমন্ত্রীর সহকারী প্রেস সচিব গাজী শাহরিয়ার পামির সভার নির্দেশনা ও আলোচনার বিষয়গুলো সাংবাদিকদের জানান।
তথ্য সূত্র: বাসস


