স্টাফ রিপোর্টার, নিউজ বাংলা ডেস্ক : ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবিতে আবারও বিক্ষোভে নেমেছেন পোশাক শ্রমিকেরা। আজ সকাল থেকে গাজীপুর, আশুলিয়া ও রাজধানীর মিরপুরে বিভিন্ন সড়কে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করেন তাঁরা। এতে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সড়কে যান চলাচল ব্যাহত হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে বিভিন্ন এলাকায় পুলিশ ও বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) সদস্যদের মোতায়েন করা হয়।
গাজীপুরে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক অবরোধ করে শ্রমিকেরা বিক্ষোভ শুরু করলে ওই পথে কয়েক ঘণ্টা যান চলাচল বন্ধ থাকে। অন্যদিকে আশুলিয়ায় সড়ক অবরোধের পাশাপাশি একটি কাভার্ড ভ্যানে আগুন দেওয়ার খবর পাওয়া গেছে। রাজধানীর মিরপুরেও শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটে।
শ্রমিকদের বিক্ষোভের কারণে বিভিন্ন এলাকায় যানবাহন চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি হলেও বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কিছু সড়কে পরিস্থিতির উন্নতি হয়। তবে শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির দাবি এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতাকে কেন্দ্র করে কয়েকটি এলাকায় উত্তেজনা বিরাজ করে।
ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে গাজীপুরে সকাল থেকেই বিক্ষোভ শুরু করেন পোশাক কারখানার শ্রমিকেরা। তাঁরা ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে অবস্থান নিয়ে যান চলাচল বন্ধ করে দেন। এতে মহাসড়কের দুই পাশে যানবাহনের চলাচল ব্যাহত হয় এবং যাত্রীদের ভোগান্তিতে পড়তে হয়।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে মহাসড়কে পুলিশ ও বিজিবি সদস্যদের অবস্থান নিতে দেখা যায়। শ্রমিকেরা সড়কের এক পাশে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ চালিয়ে যান। অন্যদিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার চেষ্টা করেন।
বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কয়েকটি সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। এ সময় এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। শ্রমিকদের অবস্থানের কারণে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে কয়েক ঘণ্টা যানবাহন চলাচল বন্ধ ছিল।
পরে বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপস্থিতিতে কিছু যানবাহন চলাচল শুরু করে। এ সময় বিএনপির সমর্থক ছাত্রদল, যুবদল ও শ্রমিক দলের নেতা-কর্মীদের ট্রাক ও বাস পার করে দিতে দেখা যায় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
গাজীপুরের পল্লী বিদ্যুৎ এলাকায় আগের দিন রোববার একটি গাড়িতে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটে। বিক্ষোভের সময় ওই গাড়িটি ব্যবহার করে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে অবরোধ তৈরি করা হয়েছিল।
পরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা গাড়িটি সড়ক থেকে সরিয়ে নেন। এর ফলে মহাসড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক করার চেষ্টা চালানো হয়।
এদিকে গাজীপুরের বিভিন্ন স্থানে পোশাক শ্রমিকদের বিক্ষোভ চলাকালে পুলিশের গাড়ি ভাঙচুরের খবরও পাওয়া গেছে। তবে এসব ঘটনায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কিংবা কতজন আহত হয়েছেন, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
গাজীপুরের পাশাপাশি ঢাকার আশুলিয়াতেও ৩০ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরির দাবিতে সড়কে অবস্থান নেন পোশাক শ্রমিকেরা। সকাল থেকে তাঁরা বিভিন্ন স্থানে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন। এতে ওই এলাকার যানবাহন চলাচল ব্যাহত হয়।
বিক্ষোভের মধ্যে একটি কাভার্ড ভ্যানে আগুন দেওয়ার ঘটনাও ঘটে। এ ঘটনায় স্থানীয় সড়কে চলাচলকারী যানবাহন ও সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়।
তবে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে আশুলিয়ার সংশ্লিষ্ট সড়কে যান চলাচল আবার শুরু হয়েছে বলে জানা গেছে। শ্রমিকদের বিক্ষোভের পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা কাজ করেন।
আশুলিয়া দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চল। এখানে বিপুলসংখ্যক পোশাক কারখানা থাকায় শ্রমিকদের আন্দোলন শুরু হলে স্থানীয় সড়ক ও পরিবহনব্যবস্থায় দ্রুত প্রভাব পড়ে। বিশেষ করে কর্মঘণ্টায় সড়ক অবরোধ হলে শ্রমিক, যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের দুর্ভোগ বাড়ে।
রাজধানীর মিরপুরেও একই দাবিতে বিক্ষোভ করেন পোশাক শ্রমিকেরা। মিরপুর-১০ থেকে মিরপুর-১২ নম্বর পর্যন্ত প্রধান সড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক থাকলেও এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ব্যাপক উপস্থিতি দেখা যায়।
মিরপুরের বিভিন্ন স্থানে শ্রমিকদের অবস্থান ও বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে সতর্ক অবস্থানে ছিল পুলিশ। বিশেষ করে মিরপুর-১১ নম্বর এলাকায় কয়েক দফায় শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মিরপুর-১০ এলাকা থেকে একজনকে আটক করেছে পুলিশ। এ ছাড়া কাফরুল থানা পুলিশ আরও পাঁচজনকে আটক করেছে বলে খবর পাওয়া গেছে। তবে আটক ব্যক্তিদের পরিচয়, তাঁদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ কিংবা পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য জানা যায়নি।
মিরপুরের সড়কে পুলিশের পাশাপাশি ছাত্রদল, যুবদল ও শ্রমিক দলের নেতা-কর্মীদেরও অবস্থান নিতে দেখা গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
পোশাকশিল্প বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খাত। এই শিল্পে কর্মরত শ্রমিকেরা দেশের রপ্তানি আয় বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তবে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম, বাড়িভাড়া, যাতায়াত ব্যয় ও পরিবারের অন্যান্য খরচ মেটাতে তাঁদের আয়ের ওপর ব্যাপক চাপ তৈরি হতে পারে।
এ কারণে শ্রমিকদের একটি অংশ মাসিক ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবি জানিয়ে আসছেন। তাঁদের দাবি, বর্তমান জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মজুরি নির্ধারণ করা প্রয়োজন, যাতে শ্রমিকেরা নিজেদের ও পরিবারের মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে পারেন।
খাদ্যপণ্য, বাসাভাড়া, চিকিৎসা, সন্তানের পড়াশোনা এবং যাতায়াতের খরচ মেটানোর পর অনেক শ্রমিকের হাতে পর্যাপ্ত অর্থ অবশিষ্ট থাকে না বলে শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির দাবি সামনে এসেছে। তাঁদের মতে, জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আয়ও বাড়ানো প্রয়োজন।
তবে ন্যূনতম মজুরি কত হওয়া উচিত, তা নির্ধারণের ক্ষেত্রে শ্রমিকদের জীবনযাত্রার ব্যয়ের পাশাপাশি শিল্পের উৎপাদন ব্যয়, কারখানার সক্ষমতা, রপ্তানি বাজারের প্রতিযোগিতা এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিও বিবেচনায় নিতে হয়।
গাজীপুর, আশুলিয়া ও মিরপুরের মতো শিল্প ও জনবহুল এলাকায় সড়ক অবরোধ হলে তার প্রভাব শুধু পোশাক কারখানার শ্রমিকদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। সাধারণ যাত্রী, শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী, পরিবহনকর্মী এবং পণ্য পরিবহনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরাও সমস্যায় পড়েন।
ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক দেশের গুরুত্বপূর্ণ সড়কপথগুলোর একটি। এই মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ থাকলে দূরপাল্লার বাস, পণ্যবাহী ট্রাক ও স্থানীয় যানবাহনের চলাচল ব্যাহত হয়। একইভাবে আশুলিয়া ও মিরপুরের গুরুত্বপূর্ণ সড়কে যানজট তৈরি হলে কর্মস্থলে যাতায়াতেও সমস্যা দেখা দেয়।
সড়ক অবরোধের পাশাপাশি যানবাহনে আগুন দেওয়া বা ভাঙচুরের মতো ঘটনা ঘটলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। এতে জানমালের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ে এবং স্বাভাবিক পরিবহনব্যবস্থা ফিরিয়ে আনতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে অতিরিক্ত তৎপর হতে হয়।


