সর্বাধিক পঠিত

spot_img

সর্বশেষ আপডেট...

Homeবিশ্ব সংবাদরাশিয়া ও ইউক্রেনের জরুরি অ্যাপে হ্যাকিং, ছড়াল ভুয়া বার্তা

রাশিয়া ও ইউক্রেনের জরুরি অ্যাপে হ্যাকিং, ছড়াল ভুয়া বার্তা

রাশিয়ার ঘটনার কিছুদিন আগে ইউক্রেনের বিমান হামলার সতর্কতা অ্যাপেও হ্যাকিংয়ের ঘটনা ঘটে। এর ফলে ব্যবহারকারীরা বিভ্রান্তিকর সতর্কবার্তা পান।

নিউজ বাংলা, আন্তর্জাতিক ডেক্স : রাশিয়া ও ইউক্রেনের জরুরি সতর্কতা অ্যাপ সাইবার হামলার শিকার হয়েছে। দুই দেশের গুরুত্বপূর্ণ এই ডিজিটাল ব্যবস্থায় হস্তক্ষেপের ঘটনায় নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। হ্যাকাররা সতর্কতা অ্যাপ ব্যবহার করে বিভ্রান্তিকর ও ভুয়া তথ্য ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছে। এর মধ্যে ইউক্রেনের বিমান হামলার সতর্কতা অ্যাপে ভুয়া বার্তা পাঠানোর ঘটনা ঘটেছে। অন্যদিকে, রাশিয়ার জরুরি সতর্কতা অ্যাপেও বড় ধরনের সাইবার হামলার খবর জানিয়েছে দেশটির জরুরি পরিস্থিতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়।

তবে রাশিয়ার কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, অ্যাপে সমস্যা দেখা দিলেও দেশটির মূল জনসতর্কতা ব্যবস্থা সচল রয়েছে। সাইরেন, লাউডস্পিকার, মুঠোফোনে খুদে বার্তা এবং টেলিভিশন ও রেডিও সম্প্রচারের মাধ্যমে নাগরিকদের সতর্ক করা হচ্ছে। অন্যদিকে, ইউক্রেনের কর্তৃপক্ষ নাগরিকদের অ্যাপে দেখা যেকোনো অস্বাভাবিক বার্তা উপেক্ষা করে নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে তথ্য সংগ্রহের আহ্বান জানিয়েছে।

রাশিয়ার জরুরি পরিস্থিতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তাদের জরুরি সতর্কতা অ্যাপে বড় ধরনের সাইবার হামলা চালানো হয়েছে। এই হামলার মাধ্যমে হ্যাকাররা ব্যবহারকারীদের কাছে ভুয়া তথ্য পাঠাতে পারত। তবে হামলার সঙ্গে কারা জড়িত, সে বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি মন্ত্রণালয়।

কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, সাইবার হামলার কারণে অ্যাপটির স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে। তবে দেশটির বৃহত্তর জনসতর্কতা ব্যবস্থার ওপর এর কোনো প্রভাব পড়েনি।

মন্ত্রণালয় আরও জানিয়েছে, অ্যাপটি নাগরিকদের তথ্য জানানোর একটি অতিরিক্ত মাধ্যম। জরুরি পরিস্থিতিতে মানুষকে সতর্ক করার জন্য রাশিয়ার আরও কয়েকটি কার্যকর ব্যবস্থা রয়েছে। এসব ব্যবস্থার মধ্যে রয়েছে সাইরেন, লাউডস্পিকার, খুদে বার্তা এবং টেলিভিশন ও রেডিও সম্প্রচার।

টেলিগ্রামে দেওয়া এক বিবৃতিতে মন্ত্রণালয় জানায়, মোবাইল অ্যাপে হ্যাকিংয়ের ঘটনা জনসতর্কতা ব্যবস্থার কার্যকারিতাকে প্রভাবিত করেনি। অ্যাপটির স্বাভাবিক কার্যক্রম ফিরিয়ে আনতে বিশেষজ্ঞরা কাজ করছেন বলেও জানানো হয়েছে।

কর্তৃপক্ষের দাবি, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তবে অ্যাপের নিরাপত্তাব্যবস্থায় কীভাবে হ্যাকাররা প্রবেশ করেছে এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের হামলা ঠেকাতে কী পদক্ষেপ নেওয়া হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।

রাশিয়ার ঘটনার কিছুদিন আগে ইউক্রেনের বিমান হামলার সতর্কতা অ্যাপেও হ্যাকিংয়ের ঘটনা ঘটে। এর ফলে ব্যবহারকারীরা বিভ্রান্তিকর সতর্কবার্তা পান।

ইউক্রেনের সরকারের কৌশলগত যোগাযোগবিষয়ক কেন্দ্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে এই ঘটনার জন্য রাশিয়াকে দায়ী করেছে। পোস্টের সঙ্গে দেশটির বিমান হামলার সতর্কতা অ্যাপে প্রদর্শিত কয়েকটি বার্তার ছবিও প্রকাশ করা হয়।

ইউক্রেনের কর্তৃপক্ষ নাগরিকদের সতর্ক করে বলেছে, অ্যাপে কোনো অস্বাভাবিক বা সন্দেহজনক বার্তা দেখা গেলে তা অনুসরণ না করে উপেক্ষা করতে হবে। পাশাপাশি সরকারি ও নির্ভরযোগ্য যোগাযোগমাধ্যম থেকে পরিস্থিতির সর্বশেষ তথ্য জানতে হবে।

ইউক্রেনের বিমান বাহিনীও নাগরিকদের শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়েছে। তাদের সতর্কবার্তায় বলা হয়, বিমান হামলার সতর্কতা অ্যাপটি সম্ভবত শত্রুপক্ষের হস্তক্ষেপের শিকার হয়েছে। একই সঙ্গে জানানো হয়, ওই বার্তার সঙ্গে কোনো তেজস্ক্রিয়তার হুমকি নেই।

ইউক্রেনের সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা কর্তৃপক্ষ অ্যাপটিতে প্রযুক্তিগত ত্রুটির কথাও উল্লেখ করেছে। পরিস্থিতি সম্পর্কে সঠিক ধারণা পেতে নাগরিকদের অন্যান্য নির্ভরযোগ্য সূত্রের তথ্য অনুসরণ করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

ইউক্রেনের ডিজিটাল রূপান্তরবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে পরিচালিত এই অ্যাপটি দেশটির গুরুত্বপূর্ণ নাগরিক নিরাপত্তাব্যবস্থার অংশ। কোথাও বিমান হামলার সতর্কতা জারি হলে কিংবা সতর্কতা প্রত্যাহার করা হলে অ্যাপটি ব্যবহারকারীদের তাৎক্ষণিকভাবে জানিয়ে দেয়। ফলে যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে অ্যাপটির নির্ভরযোগ্যতা সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ইউক্রেনের সতর্কতা অ্যাপে ভুয়া বার্তা পাঠানোর ঘটনাটি এমন এক সময়ে ঘটেছে, যখন দেশটিতে একটি বিরল যুদ্ধবিরতি শেষ হয়েছে। রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে থাকা ইউক্রেনের সম্মুখসারির শহর ওলেশকিতে যুদ্ধবিরতি শেষ হওয়ার কয়েক মিনিট আগে ভুয়া সতর্কবার্তা পাঠানো হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্প এবং পোপ চতুর্দশ লিওর মধ্যস্থতায় হওয়া একটি চুক্তির মাধ্যমে ছয় দিনের এই যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। এর ফলে ওলেশকি থেকে শত শত মানুষকে সরিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।

২০২২ সালে রাশিয়ার সর্বাত্মক আগ্রাসন শুরুর পর এই যুদ্ধবিরতিকে সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী বিরতি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে যুদ্ধবিরতি শেষ হওয়ার পর ওলেশকিতে আবারও সংঘর্ষ শুরু হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

রাশিয়া ও ইউক্রেন উভয় পক্ষই যুদ্ধবিরতির সময়কে সামরিক শক্তি বাড়ানোর কাজে ব্যবহার করার জন্য একে অপরকে অভিযুক্ত করেছে। ফলে মানবিক উদ্যোগের মাধ্যমে তৈরি হওয়া সাময়িক স্বস্তি দীর্ঘস্থায়ী শান্তিতে রূপ নেবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।

তবে যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ কিছুটা আশার সঞ্চার করেছে। কিয়েভের কর্মকর্তারা মনে করছেন, এ ধরনের উদ্যোগ ভবিষ্যতে আরও পরিকল্পিত মানবিক কার্যক্রম পরিচালনার পথ তৈরি করতে পারে।

ইউক্রেনের কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, নিয়মিত মানবিক উদ্যোগ গ্রহণ করা গেলে তা বৃহত্তর সমাধানের দিকে অগ্রসর হতে সাহায্য করতে পারে। অন্যদিকে, রাশিয়ার পক্ষ থেকে ওলেশকি অভিযান সমন্বয়ের দায়িত্বে থাকা ইয়ানা লান্ত্রাতোভা জানিয়েছেন, উভয় দেশ নিয়মিত মানবিক কার্যক্রম পরিচালনায় সম্মত হয়েছে।

তবে ক্রেমলিনের অবস্থান কিছুটা ভিন্ন। রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের মুখপাত্রের বক্তব্য অনুযায়ী, মস্কো এ ধরনের মানবিক অভিযানকে সরাসরি শান্তি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে বিবেচনা করে না।

রাশিয়ার জরুরি সতর্কতা অ্যাপে পাঠানো ভুয়া বার্তাগুলোর মধ্যে একটি ছিল বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। ওই বার্তায় দাবি করা হয়, ইউক্রেনের আক্রমণকারী ড্রোনে স্থাপন করা পারমাণবিক ওয়ারহেড রাশিয়ার সব অঞ্চলে নিক্ষেপ করা হয়েছে।

বার্তাটিতে আরও বলা হয়, নাগরিকদের জন্য প্রাণহানির ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে তিন সপ্তাহের খাবার মজুত করে লুকিয়ে থাকার মতো নির্দেশনাও দেওয়া হয়।

এ ধরনের বার্তা মানুষের মধ্যে ব্যাপক আতঙ্ক তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে যুদ্ধ চলাকালে যখন নাগরিকেরা নিয়মিত বিমান হামলা, বিস্ফোরণ কিংবা সামরিক অভিযানের আশঙ্কায় থাকেন, তখন ভুয়া সতর্কবার্তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।

তবে রাশিয়ার কর্তৃপক্ষ এসব বার্তাকে সাইবার হামলার অংশ হিসেবে দেখছে। তাই অ্যাপে প্রদর্শিত কোনো সতর্কবার্তা যাচাই না করে বিশ্বাস না করার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

জরুরি পরিস্থিতিতে ভুল তথ্য ছড়িয়ে পড়লে মানুষ অপ্রয়োজনীয়ভাবে নিরাপদ স্থান ছেড়ে যেতে পারেন, আতঙ্কিত হয়ে ভুল সিদ্ধান্ত নিতে পারেন কিংবা প্রকৃত বিপদের সময় সঠিক নির্দেশনা অনুসরণে ব্যর্থ হতে পারেন। এ কারণে ডিজিটাল সতর্কতা ব্যবস্থার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যেকোনো দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

সাইবার হামলার পাশাপাশি রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনাও ঘটেছে। এসব হামলায় বিদ্যুৎ সরবরাহ, জ্বালানি উৎপাদন এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

রাশিয়ার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, রাতে দেশটির একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানে ড্রোন হামলা হয়েছে। ইউক্রেনের সংবাদমাধ্যম প্রতিষ্ঠানটিকে নিজনি নভগোরদ অঞ্চলের কস্তোভো তেল শোধনাগার হিসেবে শনাক্ত করেছে।

নিজনি নভগোরদ অঞ্চলের গভর্নর গ্লেব নিকিতিন রাতে ও সকালে বড় ধরনের ড্রোন হামলার কথা জানিয়েছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, হামলায় সংশ্লিষ্ট স্থাপনায় উল্লেখযোগ্য ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। পাশাপাশি বিদ্যুৎ বিভ্রাট এবং গরম পানির সরবরাহ কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

গভর্নর আরও জানিয়েছেন, ড্রোনের ধ্বংসাবশেষের আঘাতে একজন নারী আহত হয়েছেন।

ইউক্রেনের জ্বালানি অবকাঠামোয় রাশিয়ার হামলার জবাবে ইউক্রেনীয় বাহিনীও রাশিয়ার তেল ও গ্যাস স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর ফলে দুই দেশের জ্বালানি খাতের নিরাপত্তা আরও ঝুঁকির মুখে পড়েছে।

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি জানিয়েছেন, শনিবার রাতে রাশিয়া দেশটির চারটি অঞ্চলের জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা চালিয়েছে। এসব হামলার কারণে এক লাখের বেশি বাড়িঘর বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়েছে বলে তিনি দাবি করেন।

রয়টার্সের প্রতিবেদনেজেলেনস্কির বক্তব্য উদ্ধৃত করে হামলাগুলোর তীব্রতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে রোববারের মধ্যে বিদ্যুৎ সংযোগের কিছু অংশ পুনরায় চালু করা সম্ভব হয়েছে।

রাশিয়া ও ইউক্রেনের জরুরি সতর্কতা অ্যাপে হামলার ঘটনা দেখিয়েছে, আধুনিক যুদ্ধে সাইবার নিরাপত্তা কতটা গুরুত্বপূর্ণ। আগে যুদ্ধের প্রভাব প্রধানত যুদ্ধক্ষেত্র, সামরিক স্থাপনা ও অবকাঠামোয় সীমাবদ্ধ থাকলেও এখন ডিজিটাল ব্যবস্থাও সংঘাতের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।

জরুরি সতর্কতা অ্যাপের মাধ্যমে নাগরিকেরা দ্রুত বিপদের খবর জানতে পারেন। কিন্তু হ্যাকাররা যদি এই ব্যবস্থায় প্রবেশ করে ভুয়া তথ্য ছড়িয়ে দেন, তাহলে প্রকৃত সতর্কবার্তা নিয়েও মানুষের মধ্যে সন্দেহ তৈরি হতে পারে।

এ কারণে প্রযুক্তিগত নিরাপত্তার পাশাপাশি সরকারি তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা নিশ্চিত করাও জরুরি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত দ্রুত ভুয়া বার্তা শনাক্ত করা, অ্যাপের দুর্বলতা দূর করা এবং বিকল্প যোগাযোগব্যবস্থা সচল রাখা।

তথ্য সূত্র: বিবিসি বাংলা

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

জনপ্রিয় সংবাদ